ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

‘আমার ডুবুরি ছেলে পানিতে ডুবে মরবে কেমনে’

‘আমার ডুবুরি ছেলে পানিতে ডুবে মরবে কেমনে’
×

উঠানে ছেলের মরদেহ দেখে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়লেন মা লিলি আক্তার। ছবি: সমকাল

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ২১:২৬

‘মা, আমি আগামী রোববার বাড়ি আসতেছি।’ দুই দিন আগে ফোনে মাকে দেওয়া এই প্রতিশ্রুতিই ছিল সাদিক হোসেন শুভর শেষ কথা। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না। শীতলক্ষ্যা নদীতে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিথর দেহে ফিরলেন ফায়ার সার্ভিসের এই পদকজয়ী ডুবুরি।

যে ছেলে অসংখ্য মানুষকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন, সেই সাহসী উদ্ধার কর্মীকেই এবার ফিরতে হলো লাশ হয়ে। আর উঠানে ছেলের মরদেহ দেখে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়লেন মা লিলি আক্তার। বারবার শুধু একটাই প্রশ্ন তাঁর, ‘আমার প্রশিক্ষিত ডুবুরি ছেলে পানিতে ডুবে মরবে কেমনে?’

‘শুভ আমার গর্বের ছেলে। ওরে নিয়ে আমি সবার কাছে গর্ব করি। আমার গর্বের ধন শুভর সঙ্গে এমন হলো কেন? কেন আমার সোনার ছেলে আমারে ছাইড়া চইলা গেল? ট্রেনিংয়ের সময় ওর হাত বেঁধে পানিতে নামানো হইছে, তখন তো কিছুই হয় নাই’–বিলাপ করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন তিনি।

মা লিলি আক্তার জানান, দুই বছর আগে ছেলে সাদিকের বিয়ে দেন। স্ত্রী সাদিয়াকে নিয়ে সুখেই সংসার করছিল সে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ব্যাটার মতো ভালো ছেলে আর একটা নাই। দুই দিন আগেও ফোনে কইল, মা আমি রোববার বাড়ি আসতেছি। আমার ছেলে একজন প্রশিক্ষিত ডুবুরি। সে কীভাবে পানিতে ডুবে মারা যায়? আমি এই মৃত্যুর সঠিক তদন্ত চাই।’

সাদিক হোসেন শুভ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কুমড়াকান্দি এলাকার আশরাফ আলীর ছেলে। গত বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ ফায়ারঘাট এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে জেটির সামনে কচুরিপানা পরিষ্কারের সময় তিনি নিখোঁজ হন। প্রায় আট ঘণ্টার উদ্ধার অভিযান শেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে কেরসিনঘাট এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল।

ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার ঢাকায় ফায়ার সার্ভিসের প্রধান কার্যালয়ে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মরদেহ গোয়ালন্দে আনা হলে কুমড়াকান্দি ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ২৪ অক্টোবর বাহিনীতে যোগ দেন সাদিক। নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর ফায়ার স্টেশনে ডুবুরি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে অসংখ্য উদ্ধার অভিযানে সাহসিকতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দেন। সেই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে গত ১৯ মে তিনি প্রেসিডেন্ট ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স (সেবা) পদক লাভ করেন।

নিহতের ভাবি দিপা আক্তার বলেন, ‘সাদিক ৪০ থেকে ৫০ ফুট গভীর পানিতে সফলভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছে। কয়েকদিন আগেও পদ্মা সেতু এলাকায় গভীর পানির নিচ থেকে পাঁচ দিন আগে নিখোঁজ এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছে। সেই ভিডিও আমাকে পাঠিয়েছিল। এত দক্ষ একজন ডুবুরিকে কেন কচুরিপানা পরিষ্কারের কাজে নামানো হলো? আর এত অল্প পানিতে তাঁর মৃত্যু কীভাবে হলো, তা আমরা বুঝতে পারছি না। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।’

গোয়ালন্দ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও সাদিকের প্রতিবেশী মো. ফজলুল হক বলেন, ‘সাদিকের মতো ভদ্র, বিনয়ী ও সাহসী ছেলে এই এলাকায় খুব কমই আছে। তাঁর বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত। পরিবারের আয় বলতে বাড়ির সামনে ছোট্ট একটি মুদি দোকান। ভাই বেকার, এক বোনের বিয়ে হয়েছে। মূলত সাদিকের উপার্জনেই পুরো সংসার চলত। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারটি কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছে।’ তিনি সরকারের প্রতি সাদিকের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘যে ছেলে নিজের জীবন বাজি রেখে মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে, তাঁর পরিবারের দায়িত্বও রাষ্ট্রের নেওয়া উচিত।’

আরও পড়ুন

×