রাষ্ট্রচিন্তা
সীমান্তে ও অভ্যন্তরে সার্বভৌমত্বের পরীক্ষা
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৯ | আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ১৩:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের একটা পরীক্ষা ঘটে সীমান্তে। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়াটাই ছিল যুক্তিসংগত; ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী এবং মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সহায়তা করেছে। কিন্তু সীমান্তে বিএসএফের হত্যাকাণ্ড থামছে না। শিগগিরই যে থামবে, এমন লক্ষণও নেই। ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে ভারত থেকে মানুষকে সীমান্ত দিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এবং জোর করে ঠেলে পাঠানোর অমানবিক তৎপরতাও সমানে চলছে। এ ব্যাপারে ভারতের হিন্দুত্ববাদী বর্তমান সরকারের উৎসাহ অত্যন্ত প্রবল। মিয়ানমার যেমনটা করছে, পারলে তেমনটাই করে। উদ্দেশ্য নিজ দেশের মানুষের শ্রেণি-সচেতনতা, গরিব মানুষের দুর্দশা বৃদ্ধি, শিক্ষিত মানুষের বেকারত্ব, কৃষক বিক্ষোভ প্রভৃতি সমস্যা ধামাচাপা দেওয়া।
যাদের সুবিধার জন্য ৪৭ সালে দেশভাগ করা হয়েছিল; রাষ্ট্রক্ষমতায় কিন্তু ধারাবাহিকভাবে তাদেরই অধিষ্ঠান; যদিও নাম, পোশাক, গলার আওয়াজ ভিন্ন। তাদেরই একাংশ এখন কেন্দ্রে বসে সমগ্র ভারত রাষ্ট্রকে শাসন করছে এবং নানাবিধ প্রচেষ্টা, ছলনা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দুষ্ট ব্যবহারের সাহায্যে সাম্প্রদায়িকতাকে প্রবেশাধিকার না-দেওয়ার ব্যাপারে এতদিন ধরে দৃঢ় পশ্চিমবঙ্গকেও তারা আপাতত দখল করে ফেলেছে।
বিজেপির শাসনামলে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান সম্প্রদায়ই কেবল নয়; মেহনতি মানুষদেরও বিপদ যে বাড়বে– তার লক্ষণ ইতোমধ্যে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। বহুতলা দালান তুলবার বাসনায় ‘বুলডোজার নীতি’ চালিয়ে বস্তি নির্মূল করা হচ্ছে। গরু কোরবানি কার্যত নিষিদ্ধ করায় যে খামারিরা গরু লালন-পালন করে জীবন ধারণ করত, তাদের মাথায় বজ্রাঘাত ঘটেছে। বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে দেওয়ার প্রাথমিক কাজটি কিন্তু স্বয়ং মমতা ব্যানার্জিই করেছিলেন। গেরুয়াধারীদের দৌরাত্ম্যে এখন তিনিই ভুক্তভোগী। বুর্জোয়াদের রাজনীতির চরিত্রটা অসংশোধনীয় রূপে ওই ধরনেরই।
নির্বাচন বাংলাদেশেও হয়েছে এবং বুর্জোয়ারাই জিতেছে। যারা সরকার গঠন করেছেন এবং যারা বিরোধী দলের আসনে আসীন হয়েছেন, তারা কিছুদিন আগেও একসঙ্গে ছিলেন; রীতিমতো জোট বেঁধে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা তখন ছিল বিএনপি-জামায়াত জোটের সঙ্গে আওয়ামী লীগের। আওয়ামী লীগ এখন নেই, তাই লড়াইটা বেধেছে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের। দুটোই বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক দল। একটির পরিচিতি উদারনীতিক হিসেবে, অপরটি ঘোষিত রূপেই কট্টর দক্ষিণপন্থি; পার্থক্য ওইটুকুই।
জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দানকারী ছাত্ররা যে একটি রাজনৈতিক দল গঠনে উদ্যোগী হবে, সেটা তাদের আচরণই বলে দিচ্ছিল। সেটি তারা গঠন করেছেও। ওই তরুণদের আওয়াজ ছিল নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কায়েম করবার; রাষ্ট্রব্যবস্থায় এমন সব সংস্কার নিয়ে আনবার, যেগুলো হবে রীতিমতো বৈপ্লবিক। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল তাদের বন্দোবস্তটা দাঁড়িয়েছে অতিপুরাতন জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধা এবং তাদের সংস্কারসূচি যে জামায়াতের অনুমোদনের বাইরে যাবে না– সেটাও স্বচ্ছ পানির মতোই পরিষ্কার।
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর তাৎক্ষণিক যে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল; সমাজ-পরিবর্তনে বিশ্বাসী বামপন্থিদের কর্তব্য ছিল সেটি পূরণ করে বুর্জোয়াদের বিকল্প শক্তি হিসেবে দৃশ্যমান হওয়া। তারা দেশবাসীকে আশা দিতে পারত– সত্যিকারের পরিবর্তন সদ্য সদ্য না ঘটলেও আগামীকাল ঘটবে। ওই কাজের জন্য আবশ্যক ছিল একটি বাম ধারার যুক্তফ্রন্ট গঠন। অনেক দেরিতে হলেও শেষ পর্যন্ত একটি যুক্তফ্রন্ট গঠনে তারা সম্মত হলেন ঠিকই, কিন্তু দেখা গেল সেটি বিপ্লবী আন্দোলনের যুক্তফ্রন্ট না হয়ে রূপ নিয়েছে নির্বাচনী জোটে। বামপন্থিরা তৎপর হলো বুর্জোয়াদের সঙ্গে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় নির্বাচন যে বুর্জোয়াদের ক্ষমতা ভাগাভাগির লড়াই ছাড়া অন্য কিছু নয়, এবং সেখানে যে বুর্জোয়া ভিন্ন অন্য কারও প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, সেই স্থূল বাস্তবতাকে বুঝবার মতো বিবেচনার অভাবের কারণে কিনা জানি না; দেখলাম বামপন্থি জোটের শরিকরা নিজ নিজ পরিচয়ে নির্বাচন-যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে জামানত হারানো তো সামান্য ব্যাপার; এমন করুণ সংখ্যক ভোট পেলেন, যেটার গুরুভারে তারা নিজেরাই এখন বিব্রত; হয়তো লজ্জিতও, নিজেদের কাছেই।

সমাজতন্ত্রীরা বুর্জোয়াদের চাইতেও অধিক তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী হবেন– এটাই প্রত্যাশিত। নির্বুদ্ধিতা আর যাদেরই সাজুক, সমাজতন্ত্রীদের সাজে না। যা-ই হোক, নির্বাচনের পরে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী একটি জোট যে তারা শেষমেশ গঠন করেছেন, সে জন্য তাদেরকে অভিনন্দন; এবং সামনে যেহেতু কোনো সংসদীয় নির্বাচন নেই, তাই তারা আন্দোলনেই থাকবেন, এমনটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সামাজিক বিপ্লব সম্ভব নয়– এটা তো ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত এবং এখন বিশ্বজুড়ে সত্য বলে প্রতিভাত। এমনকি অভ্যুত্থানও যে বিপ্লবী চরিত্র গ্রহণ করবে না; যদি না লক্ষ্যটা হয় সমাজবিপ্লবী– এটাও তো খুব মোটাদাগের একটি সত্য।
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেবল যে ভৌগোলিক সীমান্তে পরীক্ষিত হয়, তা তো নয়। প্রতিনিয়ত তার পরীক্ষা চলে রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনাতেও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যে অত্যন্ত অসম বাণিজ্য চুক্তিটি স্বাক্ষর করে রেখে গেছে; অন্য অনেক ক্ষতির সঙ্গে সেটি যে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপরেও হস্তক্ষেপ করবে– সেটা মোটেই অপরিষ্কার নয়। প্রতিবাদ হচ্ছে; বামপন্থিরা করছেন, দেশপ্রেমিক সংগঠনগুলোও করছে। কিন্তু এ ব্যাপারে জাতীয় সংসদে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। সরকারি দল নিশ্চুপ; বিরোধী দলও সাড়া-শব্দহীন। প্রতিবাদ তো নয়ই, এমনকি বৈদেশিক চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ সংসদে উপস্থাপনের যে সাংবিধানিক আবশ্যকতা রয়েছে– সেটি মান্য করার দাবিটুকুও সংসদীয় দুই মহলের কোনোটির পক্ষ থেকেই তোলা হয়নি। তাতে সেই প্রমাণিত সত্যটিরই নবতর পরিচয় পাওয়া যায় যে; দুই পক্ষের ভেতর আত্মীয়তা অতিঘনিষ্ঠ– ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের, এবং তাদের যে ঝগড়া, তাও ভ্রাতৃকলহের অধিক কিছু নয়।
বাণিজ্য চুক্তিতে বাণিজ্যের কথাই বলা হয়েছে। কিন্তু অসম বাণিজ্য যে কী বস্তু, সেটা তো আমরা উপমহাদেশের মানুষ ইংরেজ বণিকদের আগমনের পরেই টের পেয়েছিলাম। ইংরেজদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্য দিয়েই শুরু করে, এবং বাণিজ্যপথেই আস্ত ও মস্ত একটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। আমেরিকার পুরাতন পদ্ধতি শারীরিকভাবে আসবে না, কিন্তু বাণিজ্য চুক্তির যে সকল শর্ত বাংলাদেশকে মানতে বাধ্য করবে, তাতে দ্বিপক্ষীয় নগণ্য; সমস্তটাই একপক্ষীয়। দেশের অল্প ক্ষেত্রই থাকবে যেখানে এই অন্যায় চুক্তির ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না। বলাই বাহুল্য, সর্বাধিক ক্ষতিটা হবে মেহনতি মানুষদের। কিন্তু তাদের হয়ে কাজ করার যারা দাবিদার, সেই সমস্ত সংগঠনের পক্ষ থেকে তো কোনো আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি না। ট্রেড ইউনিয়নগুলো চুপচাপ। এনজিওগুলোর তো কথা বলার কথাই নয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ব্যবস্থাপনাও বিদেশি অপারেটরদের হাতে তুলে দেবার প্রস্তুতি চলছে। শুধু তাই নয়; কর্ণফুলী নদীর ধারে একটি বিদেশি কোম্পানিকে অনুমতিও দেওয়া হয়েছে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি টার্মিনাল নির্মাণের। বন্দর আমাদের, কিন্তু তার ব্যবস্থাপনা বিদেশিদের– স্বাধীন বাংলাদেশে এমন ব্যবস্থার কথাও শেষ পর্যন্ত আমাদের শুনতে হচ্ছে। কেবল শুনতে নয়, দেখতেও হবে, যদি না প্রতিরোধ সফল হয়। প্রতিবাদ বামপন্থি সংগঠনগুলো করছে, কিন্তু প্রকৃত প্রতিরোধের সুযোগটা রয়েছে বন্দরের শ্রমিক ও কর্মচারীদের এবং স্থানীয় মানুষদের হাতেই। তারা তৎপর রয়েছেন জানি, কিন্তু প্রতিরোধের কাজকে আরও শক্তিশালী করাটা যে অত্যাবশ্যক, সেটা অস্বীকার করবে কে?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী