ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

লক্ষ্যমাত্রার জিডিপি প্রবৃদ্ধি কি অর্জন করা সম্ভব?

লক্ষ্যমাত্রার জিডিপি প্রবৃদ্ধি কি অর্জন করা সম্ভব?
×

ফাইল ছবি

সেজ্যোতি বিশ্বাস

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ২১:২৫

সম্প্রতি সরকার চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস করেছে। ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ শিরোনামের এই বাজেট দেশের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার, রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন কৌশলের একটি প্রতিফলন। দেশের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনার জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। 

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবারের বাজেটে সামষ্টিক অর্থনীতির সুশাসন ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তবে একটি বাজেট কেবল কিছু সংখ্যার যোগ-বিয়োগ বা বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতি-কৌশলের চালচিত্র।

এবারের বাজেটের প্রধান দুটি সামষ্টিক লক্ষ্য হলো– উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে (জিডিপি) ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করা। আপাতদৃষ্টিতে এই লক্ষ্যগুলো ইতিবাচক ও জনবান্ধব মনে হলেও যখন এর সঙ্গে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারের ‘ব্যাংক লোন’ বা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া যুক্ত হয়, তখন সামষ্টিক অর্থনীতির সমীকরণটি একটি জটিল রূপ নেয়। 

সামষ্টিক অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং কঠোরভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সাধারণত বিপরীতমুখী আচরণ করে। বিগত ২০২৪ সালে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ১১.৬৬ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪.১০ শতাংশের মতো রেকর্ড স্তরে উঠেছিল, যা সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম সংকটে ফেলেছিল। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন। কিন্তু মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে বাজারে টাকার প্রবাহ বা মুদ্রা সরবরাহ কমাতে হয়, যাকে অর্থনীতিতে সংকোচনমূলক নীতি বলা হয়। ২০২৪ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই নীতি অনুসরণ করে নীতি সুদহার ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে ১০.০ শতাংশে উন্নীত করেছে, যা বর্তমানে অপরিবর্তিত।

এর ফলে সামগ্রিক ব্যাংকঋণের খরচ বা সুদের হার অনেক বেড়ে গেছে, যা ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহের প্রবৃদ্ধি সংকোচন করেছে। উচ্চ সুদের হারের এই অবধারিত নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের উৎপাদন ও নতুন বিনিয়োগের ওপর। যখন বিনিয়োগের খরচ বাড়ে, তখন বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্প বা শিল্প সম্প্রসারণে পিছিয়ে যান। অন্যদিকে সরকার একই বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৬.৫ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য প্রয়োজন ব্যাপক কর্মসংস্থান, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগের জোয়ার।সুতরাং একদিকে সংকোচনমূলক নীতি ও উচ্চসুদের হারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে ঠান্ডা করার চেষ্টা, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির চাকা দ্রুত ঘোরানোর তাগিদ এই দুটি লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির চাপে প্রবৃদ্ধির গতি কম হওয়াই স্বাভাবিক, যা প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনকে বড় ধরনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাবে।

এই সমীকরণে সবচেয়ে বড় জটিলতা সৃষ্টি করে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে সরকারের ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা। বাজেট অনুযায়ী মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৩ হাজার টাকা, যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণের জন্য ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নিট এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশের নিচে স্থবির হয়ে আছে, যা সরকারের নিজস্ব আয় বৃদ্ধির এক বড় অক্ষমতা। ফলে বিশাল বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর বড় মাত্রায় নির্ভর করতে হচ্ছে। বিগত ২০২৪ সালে এই অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রায় ১০ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা বর্তমান আর্থিক খাতের জন্য এক বিশাল বোঝা। যদিও নতুন বাজেটে সরকার আগের তুলনায় ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ছয় হাজার কোটি টাকা হ্রাস করার প্রস্তাব করেছে, তবুও বাজেট ঘাটতির কারণে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর সরকারের সামগ্রিক ঋণের চাপ থেকেই যাচ্ছে।

সরকার যখন বাজেট ঘাটতি মেটাতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে বড় অঙ্কের লোন নেয়, তখন বাজারে বেসরকারি খাতের ঋণ সংকোচনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ব্যাংকগুলোর কাছে থাকা সীমিত তহবিলের একটি বড় অংশ যখন ঝুঁকিমুক্ত ও নিশ্চিত মুনাফার উৎস হিসেবে সরকার নিয়ে নেয়, তখন বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা ভয়াবহভাবে কমে যায়। অথচ দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের মূল ইঞ্জিন হলো এই বেসরকারি খাত। ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও কুঋণের কারণে খেলাপি ঋণের হার যেখানে ৩৫.৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে। বর্তমানে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ছয় লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি। ২০২৫ সালে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত, বিশেষায়িত এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তি ভয়াবহভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ব্যাংক খাতের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন অনুপাত (সিআরএআর) ২০২৪ সালের ইতিবাচক ৩.০৮ শতাংশ থেকে ধসে পড়ে ২০২৫ সালে ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

ফলে তারল্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে, সেখানে সরকার যদি ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া অব্যাহত রাখে, তবে বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় মূলধন পাবে না। বেসরকারি খাত ঋণ না পেলে শিল্পায়ন হবে না, উৎপাদন থমকে দাঁড়াবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না, যার সরাসরি আঘাত আসবে সরকারের কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের ওপর।

ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের আরেকটি নেতিবাচক দিক হলো, এর নিজস্ব মূল্যস্ফীতিকারক প্রভাব। সরকার যদি বাজেট ঘাটতি মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে লোন নেয়, তবে তা সরাসরি অর্থনীতিতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মুদ্রার সরবরাহ বাড়িয়ে দেয় এবং মূল্যস্ফীতিকে আরও উস্কে দেয়। আবার সরকার যদি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে লোন নেয়, তাও পরোক্ষভাবে উৎপাদনশীল খাতের ঋণ সরবরাহ কমিয়ে পণ্যের জোগান বা সরবরাহ ব্যবস্থায়  ঘাটতি তৈরি করে। সরবরাহ কমে গেলে বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়ে। ফলে দেখা যাচ্ছে, সরকার একদিকে মূল্যস্ফীতিকে কমিয়ে  আনার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে বাজেট বাস্তবায়নে ব্যাংক থেকে লোন নেওয়ার বাধ্যবাধকতার কারণে নিজেই মূল্যস্ফীতি বাড়ার উপাদান তৈরি করছে। এটি একটি ভয়াবহ নীতিগত বৈপরীত্য। ব্যাংক ঋণের ওপর উচ্চ নির্ভরতা বজায় রেখে একই সঙ্গে কঠোরভাবে মূল্যস্ফীতি কমানো এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধি বাড়ানো অলৌকিক কল্পনামাত্র। এটা থেকে বের হতে হলে কাগজ-কলমের হিসাবের চেয়ে বাস্তবমুখী ও কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।

প্রথমত, সরকারকে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। আর এটি সম্ভব কেবল অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বা কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি করে। করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং করদাতাবান্ধব রাজস্ব কাঠামোর যে কথা বাজেটে বলা হয়েছে, তার শতভাগ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, অনুৎপাদনশীল খাতে সরকারি ব্যয় ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে, যাতে বাজেট ঘাটতির আকার ছোট রাখা যায়। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে খেলাপি ঋণ কঠোর হস্তে কমিয়ে আনতে হবে, যাতে ব্যাংকে তারল্য বৃদ্ধি পায় এবং বেসরকারি খাত সহজে ও কম সুদে ঋণ পায়।

সামষ্টিক অর্থনীতির মধ্যে যদি একটি সুসমন্বিত ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা না যায়, তবে মূল্যস্ফীতি হ্রাসের লক্ষ্য যেমন অধরা থাকবে, তেমনি থমকে যাবে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধির চাকাও। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক অর্থনীতি বিনির্মাণের যে জাতীয় আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে এই নীতিগত টানাপোড়েন কাটিয়ে ওঠার বাস্তবসম্মত পদক্ষেপই হবে বর্তমান সরকারের আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 

সেজ্যোতি বিশ্বাস: গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×