কৃষিতে সার নির্ভরতা, প্রতিবন্ধকতা ও নীতিগত সমাধান
সুরাইয়া পারভীন
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ২১:২৩
দেশে কৃষির ইতিহাস মূলত টিকে থাকার সংগ্রাম থেকে উৎপাদনশীলতা ও আধুনিকতার দিকে উত্তরণের এক দীর্ঘ পথচলা, যেখানে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের খাদ্যসংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সীমিত প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার মধ্য দিয়েও ধীরে ধীরে উন্নত কৃষিতে রুপান্তরিত হচ্ছে। এই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের উদ্ভাবিত কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ যেমন: গুণগতমানসম্পন্ন বীজ, সেচ ব্যবস্থা, রাসায়নিক সারের ব্যবহার এবং সরকারের কৃষি বান্ধব নীতি কৌশল, যা বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে সবুজ বিপ্লব নামে যা কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও ভারত বা মেক্সিকোর মতো দেশে সবুজ বিপ্লবের সূচনা আগে ঘটে, বাংলাদেশে এর পূর্ণ প্রভাব দেখা যায় ১৯৮০-এর দশক থেকে যখন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো কর্তৃক উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ধানের জাত ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সরকারি বেসরকারি সংস্থাসমূহ কৃষি প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
কিন্তু এই সাফল্যের অন্তরালে কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা আমাদের রয়েছে যেমন সার আমদানিতে উচ্চ নির্ভরতা যা বৈশ্বিক বাজারের অস্থিতিশীলতা, জ্বালানি সংকট, পরিবহন ঝুঁকি এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কারণে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত মোট সারের পরিমাণ বছরে প্রায় ৬.৫ থেকে ৭ মিলিয়ন টন, যার মধ্যে ইউরিয়া আংশিকভাবে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি আমদানি নির্ভর ইউরিয়া যা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং চীন থেকে আমদানি করা হয়।
ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট, ট্রিপল সুপার ফসফেট এবং মিউরিয়েট অব পটাশ প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর এবং এই আমদানির উৎস ভৌগোলিকভাবে সীমিত হওয়ায় সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটলে সরাসরি কৃষি উৎপাদনে প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে। মরোক্কো ফসফেট সারের কাঁচামালের অন্যতম প্রধান উৎস । পটাশ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কানাডা ও রাশিয়া। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ইউরিয়া ছাড়াও ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট সরবরাহে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এছাড়া আমাদের দেশের কৃষি উৎপাদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ধান নির্ভরতা, যেখানে মোট সারের প্রায় ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশ ব্যবহৃত হয় ধান উৎপাদনে বিশেষ করে সেচনির্ভর বোরো মৌসুমে। যার ফলে সার সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের ঋণাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে টেকসই কৃষির রুপান্তরে আগামী পাঁচ বছরে একটি বাস্তবসম্মত নীতিগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন যাতে সার আমদানির ওপর নির্ভরতা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনা যায় এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায়। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি সমন্বিত এবং বহুস্তরীয় নীতি কাঠামো প্রয়োজন যেখানে উৎপাদন বৃদ্ধি, চাহিদা হ্রাস, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন, কৃষি বৈচিত্র্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কৌশল একযোগে কাজ করবে।
প্রথমত, দেশীয় ইউরিয়া উৎপাদন বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ এটি একমাত্র সার যা বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন করা সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে গ্যাস সংকট, পুরনো অবকাঠামো প্রযুক্তিগত এবং ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্যমান কারখানাগুলো তাদের পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে আমদানি নির্ভরতা বেড়েই চলেছে। এক্ষেত্রে সরকারকে সার কারখানার জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার এবং প্রয়োজনে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে সার উৎপাদন অব্যাহত রাখা দরকার যদিও তা ব্যয় সাপেক্ষ। পাশাপাশি পুরনো কারখানাগুলোর আধুনিকীকরণ এবং নতুন প্রযুক্তির সংযোজনের মাধ্যমে সার কারখানার দক্ষতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। এতে করে আগামী পাঁচ বছরে দেশীয় ইউরিয়া উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব হবে এবং সাথে সাথে সারের আমদানি নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
দ্বিতীয়ত, ফসফেট সার উৎপাদনের জন্য কাঁচামালের অপ্রতুলতা থাকলে কাঁচামাল আমদানি করে দেশে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে। বিশেষ করে মরোক্কো বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট ও ট্রিপল সুপার ফসফেট উৎপাদন কারখানা স্থাপন করা হলে আমদানির একটি বড় অংশ প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হবে, এর জন্য সরকারকে কর ছাড়, বিনিয়োগ প্রণোদনা, অবকাঠামোগত সহায়তা এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সার শিল্পের জন্য নির্দিষ্ট ক্লাস্টার গড়ে তোলা যেতে পারে যাতে উৎপাদন ব্যয় কমে এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও সার আমদানির কুটনৈতিক পরিকল্পনায় পরিবর্তন এবং পরিমার্জন প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, জৈব ও বিকল্প সারের ব্যবহার যদিও দীর্ঘমেয়াদি কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে যা সয়েল এগ্রো ইকলজি বিবেচনায় নিয়ে জলবায়ু সহিষ্ণু টেকসই কৃষি গড়ে তোলা সম্ভব। কারণ বর্তমানে বাংলাদেশে রাসায়নিক সারের তুলনায় জৈব সারের ব্যবহার খুবই সীমিত। অথচ দেশের গ্রামীণ অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ গোবর, কৃষি অবশিষ্টাংশ এবং শহুরে জৈব বর্জ্য রয়েছে, যা সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করলে কম্পোস্ট বা বায়োগ্যাস স্লারিতে রূপান্তর করা সম্ভব। এজন্য গ্রামভিত্তিক কম্পোস্ট প্ল্যান্ট স্থাপন, বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা এবং জৈব সারের জন্য ভর্তুকি প্রদান করা হলে রাসায়নিক সারের মোট চাহিদা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো যেতে পারে। এছাড়াও মাটিতে চাহিদা অনুযায়ী জৈব সার প্রয়োগ করে ফসলের শারীরবিৃত্তীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে নিরাপদ ও পুষ্টিমান সম্পন্ন ফসল উৎপাদন করা সম্ভব।
চতুর্থত, সারের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বর্তমানে কৃষক পর্যায়ে চাহিদার অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহার এবং মাটি পরীক্ষা না করে ফসফেট, পটাশ ও সালফার সারের প্রয়োগ একটি প্রধান সমস্যা যা মাটির উর্বরতা হ্রাস করে মাটির উৎপাদন ক্ষমতা কমায়। এই সমস্যা সমাধানে বিএআরসি কর্তৃক প্রণীত সার সুপারিশমালা হাতবই ২০২৪ অনুসরণ এবং বিএআরসি কর্তৃক তৈরিকৃত খামারি মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে সার প্রয়োগের মাধ্যমে সারের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে। খামারি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে জমিতে দাঁড়িয়ে ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় সারের পরিমাণ নির্ণয় করা যায়। এছাড়া বর্তমান সরকার কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল ও নিয়ন্ত্রিতভাবে বিতরণ করার ব্যবস্থা করেছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সার বিতরণ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত হয়েছে কারণ প্রতিটি লেনদেন ডিজিটালভাবে রেকর্ড করা যায় এবং কোন কৃষক কত সার গ্রহণ করেছেন তা সহজেই অবগত হওয়া যায়। এতে করে ভর্তুকির অপব্যবহার, কালোবাজারি এবং অতিরিক্ত মজুতের মতো সমস্যা অনেকাংশে কমানোর সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের অগ্রাধিকার দিয়ে ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করার লক্ষ্যও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতে করে সারের অপচয় হ্রাস পাবে এবং ফসল উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।
পঞ্চমত, ফসল বৈচিত্র্য বা বহুমুখীকরণ একটি কৌশলগত সমাধান হিসেবে কাজ করতে পারে, কারণ ধাননির্ভর কৃষি ব্যবস্থায় সারের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকে, তাই শস্য বহুমুখীকরণ উপায় অবলম্বন করে বিভিন্ন ফসলের যেমন: ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ এবং অন্যান্য কম সারনির্ভর ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে শস্য নিবিড়তা বহুলাংশে বাড়ানো যায়। এজন্য কৃষকদের জন্য মূল্য সহায়তা, উন্নত বীজ সরবরাহ, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। এতে করে ধানের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং সামগ্রিক সার চাহিদা হ্রাস পাবে।
ষষ্ঠত, সারের লজিস্টিক ও মজুত ব্যবস্থাপনা উন্নত করা অপরিহার্য কারণ সময়মতো আমদানি না হওয়ার কারণে প্রায়ই বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়। তাই ৩ থেকে ৬ মাসের কৌশলগত সার মজুত গড়ে তোলা, বন্দর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিবহন অবকাঠামো উন্নত করা জরুরি। এতে করে সরবরাহ শৃঙ্খলা আরও স্থিতিশীল ও টেকসই করা সম্ভব হবে।
সপ্তমত, সারের ভর্তুকি কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন কারণ বর্তমান ভর্তুকি অনেক ক্ষেত্রে সারের অপচয় বাড়ায় এবং সুষম ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করে। তাই লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির মাধ্যমে সারের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। এই পুরো নীতি কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য একটি রোডম্যাপ প্রয়োজন, যেখানে প্রথম বছরে নীতিগত সংস্কার, গ্যাস বরাদ্দ এবং বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন করা; দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে অবকাঠামো নির্মাণ, জৈব সার কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করা; চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানি হ্রাস এবং নীতির পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। তবে এই পরিকল্পনার কিছু অনিশ্চয়তা ও সীমাবদ্ধতাও রয়েছে, যেমন গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, বিনিয়োগ ঘাটতি এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নীতি বাস্তবায়ন, যা মোকাবিলার জন্য শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের জন্য সার আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য কিছুটা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও হলেও অর্জনযোগ্য। যেখানে সারের উৎপাদন বৃদ্ধি, বিকল্প উৎস সন্ধান, সারের যথাযোগ্য ব্যবহার এবং কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তন একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে পারলে আগামী পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব। এতে শুধু বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে না বরং জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ টেকসই কৃষি গড়ে তোলা সম্ভব। একই সাথে বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব থেকে দেশের কৃষি খাতকে অনেকটাই সুরক্ষিত রাখা যাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ড. সুরাইয়া পারভীন: পরিচালক, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও মনিটরিং ইউনিট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, ফার্মগেট, ঢাকা
[email protected]
