মানবসম্পদ
পড়াশোনা বিষয়ে সাধারণ ধারণা এবং শিক্ষার মান
মো. সাইফুজ্জামান রানা
মো. সাইফুজ্জামান রানা
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ১৯:৩৫
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দুরাবস্থা কাটছে না। শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ছে কিন্তু মান সম্পন্ন শিক্ষা নিয়ে বেশ কিছু বছর নানা আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। এর মধ্যে সরকারি এবং বেসরকারি নানা উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে কিন্তু দিন শেষে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি যে তিমিরে ছিলো সেখানেই থেকে যাচ্ছে। সত্যি বলতে কী দিন দিন আরও অবনতি হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন আমাদের শিক্ষার মান বাড়ছে না? শিশুরা প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসছে। শ্রেণি কার্যক্রমও পরিচালিত হয়। প্রতি বছর শিশুদের নতুন বই দেওয়া হয়, শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণও পরিচালিত হয়ে থাকে। তারপরও কেন আমাদের শিশুরা শিখছে না, সেটা বোঝা খুব জরুরি। সুনির্দিষ্ট এবং ধারাবহিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া শিক্ষা যে নেতিবাচক চক্রে আটকে গেছে তা থেকে মুক্তি মেলা ভার। ২০২৩ সালের বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশে ১০ বছর বয়সী ৪৩ শতাংশ শিক্ষার্থীদের পঠন দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে; যা ২০২৪ সালে ৪০ শতাংশ হবে বলে অনুমান করা হয়েছিলো। সর্বশেষ ২০২২ সালের জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে তৃতীয় শ্রেণির ৪৯ শতাংশ বাংলায় এবং ৬১ শতাংশ গণিতে কাঙ্খিত ফল লাভ করতে পারেনি। পঞ্চম শ্রেণিতে এই হার যথাত্রমে বাংলা ও গণিতে ৫০ ও ৭০ শতাংশ। এসব তথ্য এটা প্রমাণ করে যে, প্রাথমিক স্তরের শিশুদের যেতোটুকু শেখার কথা তার থেকে অনেকটা পিছিয়ে থাকছে।
শিক্ষার মানের ক্রমাবনতি আলাপের আগে অন্য একটি বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া যাক। আমরা মানে বাংলাদেশ মূলত আটকে আছে এই ধারণার মধ্যে যে, যেহেতু আমরা পড়তে পারি সুতরাং পড়াতেও পারি। সরকারি কিংবা বেসরকরি সকল ক্ষেত্রেই এই ধারণা প্রভাব লক্ষণীয়। পড়ানো বা শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যে বিশেষ যোগ্যতার প্রয়োজন হয়; সেটি ছাড়াই শিক্ষা কার্যক্রম চলছে এদেশে। কেউ ভাবলো এখন তার পড়াশোনা শেষ হয়েছে তার একটি চাকরি দরকার। তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হলেন। বা একটি স্কুল দিয়ে বসলেন। কর্তৃপক্ষ যাকে পাচ্ছেন তাকেই নিয়োগ দিয়ে দিচ্ছেন শিক্ষক হিসেবে। তার শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা ও মানুসিকতা আছে কিনা দেখার দরকার প্রয়োজন মনে করছেন না।
এটা সরকারি কিংবা বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান একই রকম আচরণ করছে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে। কেননা কর্তৃপক্ষও বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। ফলে সরকারি কিংবা বেসরকরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেতে শিক্ষা বিজ্ঞানের কোনো ডিগ্রীর প্রয়োজন হয়নি। আগেই উল্লেখ করেছি যে, এ সমাজের বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন যে পড়তে পারলেই পড়ানো যায়। কিন্তু শিক্ষকতা পেশা যে একটি বিষেশায়িত পেশা সেটি আর হয়ে ওঠেনি বরং সব থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ পেশায় রূপান্তর ঘটেছে এটির। সাথে সাথে এর সম্মানও নিম্নগামী হয়েছে সমাজে এবং পরিবারে। শুধু শিক্ষার মান নিম্নগামী হয়নি, নিম্নগামী হয়েছে শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদাও। এখন অনেকই শিক্ষকের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য বেতন কাঠামোর কথা বলছেন। শিক্ষকের বেতনকাঠামো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন এতে দ্বিমত করছিনা। কিন্তু একবার ভেবে দেখা দরকার যে শিক্ষার মান পড়ে যাওয়া ও শিক্ষেকের সম্মান নিম্নগামির পিছনের কারণ শুধুই কি অর্থনৈতি নাকি অন্যকিছু রয়েছে?
শুধু বেতন কাঠানো এর জন্য দায়ী নয়; দায়ী মূলত পড়াশেনা সম্পর্কে আমাদের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের সব স্তরের মানুষের শিক্ষা বিষয়ে যে ধারণা ‘পড়তে পারি সুতরাং পড়াতেও পারি’ এই ধারণাটা অনেকটা দায়ী। এই ধারণার বলে এ দেশে শিক্ষা বিজ্ঞানের প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা না থাকা লোকদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে নিয়োগ প্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে এটা আর পাঁচটা সাধারণ চাকরির মতো একটি বিষয়। কোনো প্রকার শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার দক্ষতা ছাড়া যখন যে ক্লাস পরিচালনা করেন সেটা শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় হয় না। ফলে শিশুর শিখনে ঘাটটি থেকে যাচ্ছে। আর শিক্ষক হিসেবে যিনি যুক্ত হয়েছেন তিনি তার কাজের আনন্দ খুজে পান না। দিনে দিনে এ পেশার প্রতি দায়বদ্ধা তৈরি হয় না। সাধারণ একটি চাকরির মতো রুটিন দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধ জীবেন প্রবেশ করেন এ পেশায় আসা বেশিরভাগ শিক্ষক।
অন্যদিক দিয়ে দেখলে দেখা যাচ্ছে, যিনি সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছেন তিনিও ওই একই ধারণা পোষণ করেন যে পড়তে পারলে পড়ানোও যায়। ফলে যে কোনো ডিগ্রীধারী ব্যক্তিতে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে তার ভাববার দরকার হচ্ছে না। আবার এই নিয়োগকর্তাকে যিনি পরিচালনা করছেন যিনি তাঁর ধারণাও একই রকম। ফলে শিক্ষকতা পেশায় শিক্ষা বিজ্ঞানে দক্ষ লোকের আগম সংকুচিত হচ্ছে দিনকে দিন। আবার শিক্ষা প্রশাসন যারা পরিচালনা করেন তারাও কিন্তু শিক্ষা এবং শিক্ষকতা বিষয়ে একই রকম ধরাণা পোষণ করেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, একটা দেশের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাটা একটা ভুল ধারণার ওপর দাড়িয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এখন স্বাভাবিকভাবেই যার শিক্ষা ও শিক্ষকতা পেশা বিষয়ে ধারণা নেই এবং এ বিষয়ে পেশাগত প্রশিক্ষণ সেই তাদের দিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন হবে কী করে?
সুতরাং শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য সর্বাগ্রে আমাদের বেশিরভাগ মানুষের শিক্ষা সম্পর্কে যে ধারণা ‘পড়তে পারি সুতরাং পড়াতেও পারি’ এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। পড়ানো একটি বিশেষ যোগ্যতা। এটা শিক্ষা বিজ্ঞানে পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। কেউ কেউ হয়তো প্রশ্ন তুলবেন যে, দেশে সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের জন্যতো প্রশিক্ষণ কার্যক্রম রয়েছে। তাহলেও কেন কাঙ্খিত ফলা লাভ হচ্ছে না? হ্যাঁ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম রয়েছে কিন্তু সেই প্রশিক্ষণগুলো নিয়েও নানা ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। যেমন যিনি প্রশিক্ষক নন তিনি যদি প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন তাহলে সেই প্রশিক্ষণ থেকে অংশগ্রহণকরী আসলে কী দক্ষতা অর্জন করবেন? প্রশ্ন হচ্ছে যিনি প্রশিক্ষক নন তিনি কেন প্রশিক্ষণ সেশন পরিচালনার সাথে যক্তি হন? কে তাকে নমিনেট করেন?
এখানেও সেই একই প্রশ্ন, আমরা যেহেতু পড়াতে পারি সুতরাং পড়ানো বিষয়ে প্রশিক্ষণও পরিচালনা করতে পারি। এই ধারণা থেকেই তারা নমিনেটেড হন প্রশিক্ষক হিসেবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, শিক্ষা বিষয়ে সাধারণ ধারণার পরিবর্তন জরুরি। এ ধারণার পরিবর্তন তাহলে শিক্ষা প্রশাসন থেকে শুরু করে সকল স্তরে শিক্ষা বিজ্ঞানে দক্ষ লোকের কাজের সুযোগ নিশ্চিত হবে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় পেশাগত দক্ষ এবং দায়িত্ববান মানুষ যুক্ত হবেন। ফলে শিক্ষকতা পেশায় আসতে আগ্রহী এবং যোগ্যরা এ পেশায় আসবেন। এর ফলে শ্রেণি কার্যক্রমগুলো শিশু কেন্দ্রীক হবে। এতে শিশুর শিখন পরিবেশ আনন্দময় ও অংশগ্রহণমূলক হবে। ফলস্বরূপ তাদের শিখন সহজ ও আনন্দময় হবে। শিখন নিশ্চিত হলে, শিক্ষার মান বাড়বে এতে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়।
মো. সাইফুজ্জামান রানা: শিক্ষা বিষয়ক উন্নয়ন কর্মী
[email protected]
- বিষয় :
- শিক্ষক
