ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধশিল্পের সংযোগে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ

স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধশিল্পের সংযোগে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ
×

মো. আবুজাফর সাদেক

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ১৯:২০ | আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬ | ১৫:৪১

অতিসম্প্রতি ঢাকায় একটি সরকারি হাসপাতালে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সময় দুর্ভাগ্যবশত পেশাগত দায়িত্ব পালনরত ২২ জন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের উপস্থিতি, ভূমিকা ও সীমারেখা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চিকিৎসক এবং ওষুধশিল্পে কর্মরত বিক্রয় ও বিপণন পেশাজীবীদের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি প্রাসঙ্গিকভাবে সামনে আসে।

চিকিৎসক এবং ওষুধশিল্পে কর্মরত বিক্রয় ও বিপণন পেশাজীবীদের পারস্পরিক সম্পর্ক বহু দশক ধরে নানামুখী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তবুও বিশ্বব্যাপী মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ কর্তৃক চিকিৎসকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ একটি স্বীকৃত ও কার্যকর পন্থা হিসেবে বিবেচিত। উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় দেশেই বিভিন্ন চিকিৎসা ও সরকারি প্রতিষ্ঠান এই সম্পর্ককে স্বাভাবিক ও সুশৃঙ্খল রাখতে নীতিমালা ও বিধিবিধান প্রণয়ন করেছে, অর্থাৎ এটির প্রয়োজনীয়তা আছে।

চিকিৎসক ও ওষুধ কোম্পানির এই যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ফার্মাসিউটিক্যাল খাত মূলত জ্ঞানভিত্তিক। এই প্রেক্ষাপটে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভরা দুই পক্ষের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেন। তারা একদিকে যেমন নতুন ও বিদ্যমান ওষুধ সম্পর্কে চিকিৎসকদের অবহিত করেন, অন্যদিকে চিকিৎসকদের মতামত ও অভিজ্ঞতা কোম্পানির কাছে পৌঁছে দেন– যা পণ্যের মান উন্নয়নে সহায়ক হয়।

মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের মূল দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে নতুন পণ্যের তথ্য প্রদান, বিদ্যমান পণ্যের হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরা এবং সেগুলোর ব্যবহারিক উপযোগিতা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা। এই পারস্পরিক যোগাযোগ উভয় পক্ষের জন্যই উপকারী। সঠিক ও আপডেটেড তথ্যের মাধ্যমে চিকিৎসকরা রোগীদের আরও উন্নত সেবা দিতে পারেন এবং ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের সঠিক ব্র্যান্ডিং নিশ্চিত করতে পারে।

ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও এটি একটি ব্যবসায়িক খাত, যেখানে আয়ের বড় অংশই নির্ভর করে কার্যকর প্রচারের ওপর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-ডব্লিউএইচওর সংজ্ঞা অনুযায়ী, ফার্মাসিউটিক্যাল প্রমোশন হলো এমন সব তথ্য ও প্রভাবক কার্যক্রম, যার মাধ্যমে ওষুধের প্রেসক্রিপশন, সরবরাহ বা ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। এই প্রমোশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের মাধ্যমে চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই সম্পর্ককে ইতিবাচকভাবে দেখেন। উদাহরণস্বরূপ, এক গবেষণায় ৭৪ শতাংশ চিকিৎসক নতুন ওষুধ, চিকিৎসা পদ্ধতি ও স্বাস্থ্যসেবার অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের ভূমিকা মূল্যবান বলে মনে করেছেন। আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, ৫৬.৮ শতাংশ চিকিৎসক মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের নির্ভরযোগ্য তথ্যের উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন, যদিও একটি অংশ ভিন্নমত পোষণ করেন। এ ছাড়া ৬১.৭ শতাংশ চিকিৎসক স্বীকার করেছেন যে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের যোগাযোগ তাদের প্রেসক্রিপশনে ওষুধ নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিছুটা প্রভাব ফেলে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা থাকলেও খুব কম ক্ষেত্রেই মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ বন্ধ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু হাসপাতালে এমআরদের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যা সম্ভবত কিছু বিচ্ছিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রেক্ষিতে নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয় বিবেচনায় রাখা জরুরি যে অধিকাংশ মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ শিক্ষিত, প্রশিক্ষিত এবং পেশাগতভাবে দায়িত্বশীল।

বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের দ্রুত বিকাশে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কভিড-১৯ মহামারির সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ওষুধ সরবরাহ সচল রাখতে তাদের ভূমিকা প্রশংসনীয় ছিল।

হাসপাতালে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের প্রবেশ সীমিত করার সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান রেখেও বলা যায়, এ বিষয়ে বিকল্প ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান খোঁজা যেতে পারে। অনেক চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বার না থাকায় মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে যেমন– অফিস সময়ের আগে বা পরে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

সর্বোপরি, চিকিৎসক ও মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ এই গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রণ না করে বরং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে একটি নৈতিক ও কার্যকর গাইডলাইন প্রণয়ন করা অধিক যুক্তিযুক্ত হবে। এতে একদিকে সম্ভাব্য অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা ও ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের অগ্রযাত্রাও অব্যাহত থাকবে।

ড. মো. আবু জাফর সাদেক: ফার্মাসিস্ট, সাবেক পরামর্শক, বিশ্বব্যাংক

[email protected]

আরও পড়ুন

×