কূটনীতি
জাতিসংঘে ড. খলিলুর রহমান, নতুন উচ্চতায় বাংলাদেশ
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
রাজু আলীম
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ১৯:৪৫
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক অর্জন। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধি এই পদে নির্বাচিত হওয়া দেশের প্রতি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা এবং কূটনৈতিক সক্রিয়তার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রায় চার দশক পর আবারও বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ায় এটিকে দেশের বৈশ্বিক অবস্থান ও কৌশলগত সক্ষমতার নতুন স্বীকৃতি হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচন সাধারণত আঞ্চলিক সমঝোতার ভিত্তিতে হলেও এবার তা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে গড়ায়। সাইপ্রাস ২০১৬ সাল থেকেই দীর্ঘমেয়াদি প্রচারণা চালিয়ে আসছিল। বিপরীতে বাংলাদেশ পূর্ণমাত্রার প্রচার শুরু করে মাত্র কয়েক মাস আগে। কিন্তু বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলো দ্রুত ও সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করে। দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ, আঞ্চলিক ফোরাম, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং ‘রেসিপ্রোকাল সাপোর্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট’-এর মতো কৌশল ব্যবহার করে বাংলাদেশ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন আদায় করে নেয়। এটি দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নেটওয়ার্ক ও গ্রহণযোগ্যতা আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে।
বাংলাদেশ এর আগে মাত্র একবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়েছিল। ১৯৮৬ সালে ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি হয়েছিলেন হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। চার দশক পর আবারও সেই মর্যাদাপূর্ণ পদে বাংলাদেশের প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া দেশের কূটনৈতিক ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই জটিল, বিভক্ত এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট, জলবায়ু বিপর্যয়, অভিবাসন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন বাস্তবতা—সব মিলিয়ে জাতিসংঘ আজ এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। এই বাস্তবতায় সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া শুধু সম্মানের বিষয় নয়; এটি একই সঙ্গে কঠিন দায়িত্ব ও রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার পরীক্ষাও।
ড. খলিলুর রহমানের ব্যক্তিগত ও পেশাগত যাত্রাপথ এই দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত মন্ত্রী নন; বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন পেশাদার কূটনীতিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে বিসিএসে শীর্ষস্থান অর্জনের পর তাঁর কর্মজীবনের শুরু। পরে যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্লেচার স্কুল ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা তাঁকে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সমৃদ্ধ করে। ১৯৭৯ সালে পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেওয়ার পর ধীরে ধীরে তিনি জাতিসংঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন।
জাতিসংঘে তাঁর দীর্ঘ ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা তাঁকে অন্য অনেক কূটনীতিকের চেয়ে আলাদা করেছে। নিউইয়র্ক ও জেনেভায় বিভিন্ন সংস্থায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি উন্নয়ন অর্থনীতি, বাণিজ্যনীতি, প্রযুক্তি, জলবায়ু এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থসংশ্লিষ্ট আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে UNCTAD-এ তাঁর কাজ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় দক্ষিণের দেশগুলোর কণ্ঠস্বর জোরালো করতে তিনি যেভাবে কাজ করেছেন, তা তাঁকে বহুপাক্ষিক কূটনীতির বাস্তব অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি ও বিশ্লেষণধর্মী প্রকাশনার প্রধান লেখক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন, যা তাঁর সক্ষমতার পরিচয় বহন করে।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এসেছে—বাংলাদেশ এখন শুধু শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অবদান রাখা একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র নয়; বরং বৈশ্বিক নীতি ও বহুপাক্ষিক আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাও অর্জন করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ যে অবস্থান নিয়েছে, তা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। একইভাবে রোহিঙ্গা সংকটের মতো মানবিক ইস্যুতেও বাংলাদেশ বিশ্বের সহানুভূতি অর্জন করেছে। ড. খলিলুর রহমান এই অভিজ্ঞতাগুলোকে বৈশ্বিক আলোচনায় নতুনভাবে তুলে ধরতে পারবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচনের পর তাঁর বক্তব্যও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, তিনি সব সদস্য রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হবেন এবং ব্যক্তিগত মতামতকে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে দেবেন না। বর্তমান বিশ্বে যখন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন তাঁর এই বার্তা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যে ছয়টি অগ্রাধিকার সামনে এনেছেন—শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা, মানবাধিকার ও অভিবাসন, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স এবং জাতিসংঘ সংস্কার—তা বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বিশেষ করে ‘নবায়নযোগ্য বহুপাক্ষিকতা’ এবং ‘ইউএন ৮০ সংস্কার’ প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার আট দশক পূর্তির প্রাক্কালে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠছে। নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো, ভেটো রাজনীতি, উন্নয়ন অর্থায়নের বৈষম্য এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রতিনিধিত্ব—এসব বিষয়ে সংস্কারের দাবি জোরালো হচ্ছে। ড. খলিলুর রহমানের মতো উন্নয়নশীল দেশের অভিজ্ঞ কূটনীতিক এই আলোচনায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
বাংলাদেশের জন্য এই বিজয়ের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। বর্তমান সরকার এটিকে নিজেদের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। সরকারপক্ষের দাবি, অল্প সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জন বাংলাদেশের নেতৃত্বের কার্যকর কূটনৈতিক সক্ষমতার প্রমাণ। যদিও আন্তর্জাতিক নির্বাচনগুলো সাধারণত বহুস্তরীয় কূটনৈতিক সমঝোতার ফল, তবু এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এমন একটি পদে জয় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ড. খলিলুর রহমানের ভূমিকা নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের প্রশ্ন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তিনি সরাসরি কোনো রাষ্ট্রীয় অবস্থান তুলে ধরতে পারবেন না, কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে মানবিক ও উন্নয়নসংক্রান্ত আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
একই সঙ্গে সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদটি মর্যাদাপূর্ণ হলেও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত। বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষমতাকাঠামো প্রায়ই সাধারণ পরিষদের উদ্যোগকে দুর্বল করে দেয়। ফলে তাঁকে অত্যন্ত সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাশিয়া-পশ্চিমা বিশ্বের সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলা সহজ হবে না।
তবু তাঁর অভিজ্ঞতা এবং বহুপাক্ষিক পরিসরে দীর্ঘ কাজের ইতিহাস তাঁকে এই দায়িত্ব পালনে এগিয়ে রাখে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আলোচনার দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ড. খলিলুর রহমানের দীর্ঘ কর্মজীবন তাঁকে সেই নেটওয়ার্ক ও গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে। তিনি এমন এক সময় দায়িত্ব নিচ্ছেন, যখন বিশ্বব্যবস্থা নতুন ভারসাম্যের সন্ধানে। উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন আরও জোরালোভাবে নিজেদের কণ্ঠ তুলে ধরতে চাইছে। জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি প্রবেশাধিকার, বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামো এবং অভিবাসন প্রশ্নে দক্ষিণের দেশগুলোর দাবি আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বসা প্রতীকী দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ছোট বা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোরও নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এটি তাই শুধু একটি নির্বাচনী জয় নয়; বরং বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থায় দেশের উপস্থিতির নতুন ঘোষণা।
সবশেষে বলা যায়, ড. খলিলুর রহমানের এই যাত্রা ব্যক্তি ও রাষ্ট্র—উভয়ের অর্জনের সমন্বয়। তাঁর ব্যক্তিগত মেধা, দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক অবস্থানের মিলিত প্রতিফলন এই নির্বাচন। এখন তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিভক্ত বিশ্বে সংলাপ, আস্থা ও সহযোগিতার পরিসর তৈরি করা। কারণ আজকের বিশ্বে কূটনীতির সবচেয়ে বড় সংকট শক্তির নয়, বিশ্বাসের। সেই বিশ্বাস পুনর্গঠনের কাজেই হয়তো আগামী এক বছরে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা দিতে হবে বাংলাদেশের এই অভিজ্ঞ কূটনীতিককে।
রাজু আলীম: কবি ও সাংবাদিক
- বিষয় :
- জাতিসংঘ
