ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

কারখানা থেকে বিশ্বকাপ, হার না মানা এক ‘সুপার সাব’ উন্দাভ

কারখানা থেকে বিশ্বকাপ, হার না মানা এক ‘সুপার সাব’ উন্দাভ
×

জয়সূচক গোলের পর ডেনিজ উন্দাভকে (বাঁয়ে) জড়িয়ে ধরেন সতীর্থরা। শনিবার আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ম্যাচে। ছবি: এএফপি

বিবিসি

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ১৪:৩৩

কিছুদিন আগেও ডেনিজ উন্দাভকে নিয়ে সমালোচনা করেছেন কোচ ইউলিয়ান নাগেলসম্যান। কিন্তু সেই উন্দাভই এখন বিশ্বকাপে জার্মানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করছেন।

আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানের নাটকীয় জয়ে উন্দাভের জোড়া গোল আবারও তাঁর গুরুত্ব তুলে ধরেছে। টানা দুই আসরে ব্যর্থতার পর এই জয়ের মাধ্যমে জার্মানি নকআউট পর্বে উঠেছে।

গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে তিনটি গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট নিয়ে উন্দাভ পাঁচটি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে কোনো বদলি খেলোয়াড়ের জন্য এই পরিসংখ্যান যৌথভাবে সর্বোচ্চ। উন্দাভের আগে এমন কীর্তি আছে ক্যামেরুনের রোজার মিল্লারের (১৯৯০)।

ডেনিজ উন্দাভ। ছবি: এএফপি

তবে ২৯ বছর বয়সী এই জার্মান স্ট্রাইকারের বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়া একসময় অনিশ্চিত ছিল। মার্চে ঘানার বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোল করার পর নাগেলসমানের সঙ্গে প্রকাশ্য মতবিরোধ দেখা দেয়। তখন উন্দাভ বলেছিলেন, তিনি জার্মানির প্রথম একাদশে নিয়মিত জায়গা পাওয়ার জন্য লড়তে চান। নাগেলসম্যানের জবাব ছিল কিছুটা অবহেলার সুরে। বলেছিলেন, ‘এ ধরনের মন্তব্য করে সে (উন্দাভ) নিজের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করছে।’

কোচের এমন কথার জবাব উন্দাভ দিয়েছেন মাঠে। এখন বিশ্বকাপে দলের শুরুর একাদশে জায়গা পাওয়ার জোর দাবিদারও তিনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ১১ ম্যাচে তাঁর গোলসংখ্যা পৌঁছেছে নয়টিতে।

শনিবারের জয়ের পর নাগেলসমানকে জিজ্ঞেস করা হয়, ইকুয়েডরের বিপক্ষে গ্রুপের শেষ ম্যাচে উন্দাভ কি শুরুর একাদশে থাকতে পারেন? তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। তবে আগেও বলেছি, বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আমরা অনেক কথা বলতে পারি। কিন্তু আমি কেন তাঁর ছন্দ নষ্ট করতে যাব? সে দুবার বদলি হিসেবে নেমেছে এবং দুবারই গোল করেছে।’

বদলি হিসেবে মাঠে নামার সময় উন্দাভ (পেছনে)। ছবি: এএফপি

উন্দাভের জন্য বিশ্বকাপে নিজেকে প্রমাণ করার এই যাত্রা জীবনের নতুন অধ্যায় মাত্র। এ পর্যন্ত পৌঁছানোর যাত্রাটা শুরু হয়েছিল আরও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে।  

‘টিকে থাকার জন্যই ওই কাজ করতে হতো’
২০০২ বিশ্বকাপে নিজের প্রথম দুই ম্যাচেই গোল করার কীর্তি ছিল মিরোস্লাভ ক্লোসের। শনিবার উন্দাভও সেই রেকর্ড গড়েছেন। এটি নিঃসন্দেহে অভিজাতদের কাতারে নাম লেখানোর মতো অর্জন। 

কিন্তু একসময় বিশ্বকাপে খেলা তো দূরের কথা, স্বপ্ন দেখাটাও কঠিন ছিল উন্দাভের জন্য। ১৪ বছর বয়সে তিনি বাদ পড়েন জার্মান ক্লাব ভের্ডার ব্রেমেন থেকে। ১৭ বছর বয়সে চতুর্থ বিভাগের ফুটবলে খণ্ডকালীন খেলোয়াড় হিসেবে সপ্তাহে মাত্র ১২০ পাউন্ড আয় করতেন। একই সময়ে তিনি আট ঘণ্টা কাজ করতেন একটি কারখানায়।

বেলজিয়ামের একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উন্দাভ বলেছিলেন, ‘ভের্ডার ব্রেমেন যখন বাদ দেয় তখন কারণ হিসেবে আমাকে খুবই স্মল উল্লেখ করেছিল। বলেছিল, এই ক্লাবে তোমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সে কথা শুনে আমার হৃদয় ভেঙে গিয়েছিল।’

ম্যাচ শেষে উন্দাভকে জড়িয়ে ধরেন কোচ নাগেলসম্যান। ছবি: এএফপি

উন্দাভ বলেন, তিনি আশা ছাড়েননি। ১৭ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে জার্মানির চতুর্থ বিভাগের ক্লাব টিএসভি হাভেলজে যোগ দেন। সেখানে খেলা ও অনুশীলনের পাশাপাশি পূর্ণকালীন চাকরি করতেন। তাঁর কাজ ছিল মূলত কারখানার লেজার মেশিন চালোনো।

ভোর চারটার দিকে ঘুম থেকে উঠে কারখানায় এবং এরপর অনুশীলনে যেতেন উন্দাভ। বাড়ি ফিরতেন রাত আটটার দিকে। পরদিন আবার একই কাজ করতেন। উন্দাভ বলেন, ‘টিকে থাকার জন্যই ওই কাজ করতে হতো। কারণ শুধু ফুটবল থেকে যে অর্থ পেতাম, তা দিয়ে জীবন চালানো সম্ভব ছিল না।’

২০২০ সালে উন্দাভ বেলজিয়ামের দ্বিতীয় বিভাগের একটি ক্লাবে যোগ দেন। পরের বছর দলটিকে শীর্ষ বিভাগে তুলতে অবদান রাখেন। শীর্ষ পর্যায়ে ২৫ গোল করার পর সুযোগ পান ইংল্যান্ডের ক্লাব ব্রাইটন অ্যান্ড হোভ অ্যালবিঅনে। তবে ২০২২-২৩ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগের ২২ ম্যাচে মাত্র পাঁচ গোল করার পরও তাঁকে ডেকে নেয় জার্মানির ক্লাব স্টুটগার্ট। ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি করে।

বুন্দেসলিগায় ২০২৫-২৬ মৌসুমে উন্দাভ ১৯ গোল করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। সেই পারফরম্যান্সই তাঁকে বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে দিয়েছে।

আরও পড়ুন

×