ভূরাজনৈতিক মেরুকরণে বাংলাদেশ কোন দিকে এগুবে
ফাইল ছবি
রাজু আলীম
প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬ | ২১:৫০
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল একবার বলেছিলেন, ‘গণতন্ত্র সবচেয়ে খারাপ শাসনব্যবস্থা— তবে তা অন্য সব শাসনব্যবস্থা বাদ দিলে।’ এই কথার গভীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য লুকিয়ে আছে। গণতন্ত্রের শক্তি তার ঐকমত্যে নয়, বরং মতভেদকে ধারণ করার ক্ষমতায়। বিতর্ক তাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক উপাদান। কিন্তু যখন বিতর্ক রাষ্ট্র পরিচালনার সহায়ক না হয়ে রাষ্ট্রের মূল অগ্রাধিকারকেই আড়াল করতে শুরু করে, তখন সেই বিতর্কের চরিত্র নতুনভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঠিক সেই প্রশ্নটিই সামনে চলে এসেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিতর্কের কোনো অভাব ছিল না, আজও নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের বিতর্কগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, আমরা যেন এক ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক সময়ে প্রবেশ করেছি। একসময় নির্বাচন, ভোটাধিকার, ক্ষমতার পালাবদল কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নই ছিল রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র। এখন সেই জায়গা দখল করেছে সংবিধানের ভবিষ্যৎ, রাষ্ট্রের আদর্শ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ধর্মীয় ব্যাখ্যা, সংস্কৃতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় পরিচয়ের মতো বিষয়। ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন কেবল সরকার গঠন বা সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং রাষ্ট্র কোন বয়ানের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, সেই প্রশ্নও সমান গুরুত্ব নিয়ে সামনে এসেছে।
এই পরিবর্তনের একটি প্রতীকী চিত্র দেখা যায় সংসদীয় আলোচনায়। একটি দেশের বাজেট অধিবেশন সাধারণত অর্থনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মঞ্চ। সেখানে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, রাজস্ব আহরণ কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অর্থনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা, সংস্কৃতি শিক্ষা, নারী-পুরুষের অধিকার কিংবা বিভিন্ন প্রতীকী সামাজিক প্রশ্নও সমানভাবে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। এসব বিষয়ে আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার যখন রাষ্ট্রের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ, তখন রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের কেন্দ্র কোথায় থাকা উচিত?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, একটি দেশের রাজনীতি বোঝার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সেই দেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু পর্যবেক্ষণ করা। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সেই কেন্দ্রবিন্দু যেন একাধিক স্তরে বিভক্ত। একদিকে অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে ইতিহাসের নতুন ব্যাখ্যা; একদিকে পররাষ্ট্রনীতির নতুন কৌশল, অন্যদিকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন। ফলে রাজনীতি ক্রমেই নীতিনির্ভর প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বয়াননির্ভর প্রতিযোগিতায় পরিণত হচ্ছে।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেই বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট। সরকার অতীতের আর্থিক বিশৃঙ্খলা, ঋণের চাপ এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। সমালোচকরা প্রশাসনিক সংস্কারের ধীরগতি, দুর্নীতি দমন এবং বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের বিচার অন্য জায়গায়। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমেছে কি না, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কি না, শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ছে কি না, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরছে কি না—এসব প্রশ্নই শেষ পর্যন্ত সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক বক্তৃতা যত দীর্ঘই হোক, বাজারের বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
অর্থনীতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে সুশাসনের প্রশ্ন। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি, ঘুষ এবং প্রশাসনিক অনিয়ম নিয়ে নানা তথ্য ও পরিসংখ্যান নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। সরকার বলছে, অতীতের অব্যবস্থাপনা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। বিরোধীরা বলছে, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এখনও বাস্তব রূপ পায়নি। সত্য যাই হোক, একটি বিষয় পরিষ্কার—অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কেবল নীতিপত্রে সম্ভব নয়; তার জন্য প্রয়োজন কার্যকর প্রশাসন, স্বচ্ছতা এবং জনআস্থা। যদি রাজনৈতিক শক্তির বড় অংশ প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিতর্কে ব্যস্ত থাকে, তাহলে সংস্কারের গতি স্বাভাবিকভাবেই মন্থর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিচার বিভাগের প্রশ্নও একইভাবে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। আইন কর্মকর্তাদের পদত্যাগ কিংবা বিচার বিভাগ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিতর্কে এক পক্ষ স্বাধীনতার প্রশ্ন তুলছে, অন্য পক্ষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অভিযোগ করছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রতিটি বিচারিক ঘটনাকে যদি দলীয় অবস্থানের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রতিষ্ঠানগত বিশ্বাসযোগ্যতা। আদালতের ওপর মানুষের আস্থা রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাবের বাইরে পুরো রাষ্ট্রই ক্ষতির মুখে পড়ে।
রাজনৈতিক মেরুকরণের নতুন রূপও লক্ষণীয়। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সাধারণ ধারণা ছিল, রাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা হলেও কমবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নতুন ইস্যুতে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। সংবিধান সংস্কার, বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় মূল্যবোধ কিংবা রাজনৈতিক সংস্কারের মতো প্রশ্নে একসময়কার রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যেও মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। এটিকে গণতান্ত্রিক বহুমতের লক্ষণ বলা যেতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন আর একমাত্র ক্ষমতাকেন্দ্রিক নয়; বরং আদর্শিক অবস্থানও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
পররাষ্ট্রনীতিও এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় ভারত প্রশ্নটি আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা মানেই কি ভারত থেকে দূরে সরে যাওয়া? আবার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা মানেই কি চীনের সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করা? বাস্তবতা অবশ্য এত সরল নয়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার কারণে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই সবচেয়ে কার্যকর পথ। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্যে প্রায়ই এই ভারসাম্য হারিয়ে যায়। পররাষ্ট্রনীতি তখন জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার উপাদানে পরিণত হয়।
এই বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতীয়তাবাদ এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। প্রতিবেশী দেশ, সীমান্ত, আঞ্চলিক প্রভাব কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের সংখ্যা বেড়েছে। গণতান্ত্রিক সমাজে এসব বিষয়ে মতভেদ থাকবে, সেটিই স্বাভাবিক। তবে কূটনীতির সফলতা শেষ পর্যন্ত পরিমাপ হয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে। রাজনৈতিক আবেগ যদি বাস্তব নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করে, তাহলে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
ধর্ম ও সংস্কৃতিও এখন রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় মূল্যবোধের অবস্থান, সংস্কৃতি শিক্ষা, নারী-পুরুষের অধিকার কিংবা সামাজিক রীতিনীতি নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই রাজনৈতিক চরিত্র ধারণ করছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় সহাবস্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই রাষ্ট্রের বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ একদিকে ধর্মীয় মূল্যবোধ, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য—দুটিই বাংলাদেশের বাস্তবতা। একটিকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যটিকে অস্বীকার করলে সামাজিক মেরুকরণ আরও বাড়তে পারে।
আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; বরং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের পুনর্বিন্যাস। এমন একটি রাজনীতি প্রয়োজন, যেখানে অর্থনীতি সংসদের প্রধান আলোচ্য হবে; ইতিহাস গবেষণার বিষয় হবে, রাজনৈতিক অস্ত্র নয়; ধর্ম সমাজের নৈতিক শক্তি হবে, বিভাজনের উপকরণ নয়; বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রাজনৈতিক দাবি নয়, সাংবিধানিক বাস্তবতা হবে; আর পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে, আবেগের ভিত্তিতে নয়।
জন এফ. কেনেডি বলেছিলেন “সত্যের সবচেয়ে বড় শত্রু অনেক সময় মিথ্যা নয়; বরং সেই বিশ্বাস, যা বারবার উচ্চারিত হতে হতে মানুষের কাছে সত্য বলে মনে হয়।”
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই কথার তাৎপর্য নতুন করে অনুভব করা যায়। কারণ রাজনীতিতে মতপার্থক্য সব সময়ই ছিল, কিন্তু এখন সেই মতপার্থক্য ক্রমেই বয়ানের প্রতিযোগিতায় রূপ নিচ্ছে। কে বেশি দেশপ্রেমিক, কে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত উত্তরাধিকারী, কে গণতন্ত্রের রক্ষক কিংবা কে জাতীয় স্বার্থের প্রকৃত প্রতিনিধি—এসব প্রশ্নই যেন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। অথচ সাধারণ মানুষের কাছে রাজনীতির মূল্যায়নের মানদণ্ড একেবারেই ভিন্ন। তাদের কাছে রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ধারিত হয় বাজারের দামে, কর্মসংস্থানের সুযোগে, আইনের শাসনে এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থায়। সেখানেই আজ বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—বিতর্কের উত্তাপ কি বাস্তব সমস্যার সমাধানকে আড়াল করে দিচ্ছে?
গণতন্ত্রে বিতর্ক থাকবে, মতপার্থক্য থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও থাকবে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গঠন এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির দিকে না যায়, তাহলে বিতর্ক কেবল রাজনৈতিক উত্তাপই সৃষ্টি করবে, রাষ্ট্রের জন্য কার্যকর সমাধান নয়। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই আর কে ক্ষমতায় আছে, সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো—রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু কি নাগরিকের জীবন, নাকি কেবল রাজনৈতিক বয়ান? আগামী দিনের বাংলাদেশের পথ নির্ধারণ করবে এই প্রশ্নের উত্তরই।
রাজু আলীম: কবি ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব
- বিষয় :
- ভূরাজনীতি
- দেশের স্বাধীনতা
