করোনাকালের সংবাদমাধ্যম
মামুন আ. কাইউম
প্রকাশ: ১০ জুন ২০২০ | ০৬:০০ | আপডেট: ১০ জুন ২০২০ | ০৬:৪০
'দুর্যোগ' বাংলাদেশের নামের পাশে চিরাচরিত থাকা একটি শব্দ। সিডর, আইলা, মহাসেন, বুলবুল, নার্গিস, ফণী বা আম্পানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব দেয়া বাংলাদেশ বিশ্বে এখন একটি পরিচিত নাম। তবে বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছর এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়ায় সংবাদমাধ্যমও অভিজ্ঞতার কারণে জনসচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারছে। এমনকি জঙ্গী-হামলা, দাঙ্গা-হাঙ্গামার মত বিষয় কাভারেও বাংলাদেশের সংবাদকর্মীরা নিজেকে নিরাপদ রেখে সংবাদ সংগ্রহের কৌশল রপ্ত করতে পেরেছেন। কিন্তু করোনার মত স্বাস্থ্য বিপর্যয়ে বাংলাদেশ বা বহির্বিশ্বে অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে কিছু বিপত্তি ঘটছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে করোনাকালে গণমাধ্যমগুলোর প্রস্তুতি বা অপর্যাপ্ত সংবাদ প্রচারের সব দায় গণমাধ্যমের উপর চাপানোও যুক্তিযুক্ত নয়।
বলা হয়ে থাকে- দুর্যোগের সময় ক্রাইম বা বিনোদন বিটের রিপোর্টারকেও দুর্যোগে ক্রাইমের বাড়া-কমা বা এফডিসি, নাটকপাড়ায় এর প্রভাব নিয়ে রিপোর্ট করতে হয়। করোনার মত অদৃশ্য ভাইরাসে সব সময়ই সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় মাঠের সব খবর উঠে আসবে না এটাও স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচনার যথেষ্ট সুযোগ আছে। আবার এমন দুর্যোগে সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন চাপও জনগণের জানার অধিকারকে খর্ব করতে দায়ি হিসেবে কাজ করে। করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকে তথ্যমন্ত্রণালয় দেশের টিভি চ্যানেলগুলোর ছড়ানো গুজব পর্যবেক্ষণের জন্য একটি কমিটি করেছিল এবং ব্যাপক সমালোচনার পর তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল। বস্তুত, মূলধারার সংবাদমাধ্যম কখনো গুজব ছড়িয়েছে তা এখনো প্রমাণিত হয়নি। বরং সামাজিক মাধ্যমে অনেক গুজবই ভাইরাল হওয়া এবং সে প্রেক্ষিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও ঘটেছে।
করোনা সংক্রমণ শুরুর সময়ে দেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা আইইডিসিআরের সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা প্রশ্নের সুযোগ পেতেন এবং জনগণকে সে বিষয়ে ধারণা দিতেন। মাঝপথে হঠাৎ করেই সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তরের সুযোগ বন্ধ করায় সাংবাদিকরা পাঠক, দর্শক-শ্রোতার অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছেন না। আবার পরবর্তীতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার, নার্স বা কর্মকর্তাকে পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে সংবাদমাধ্যমে কথা না বলার নির্দেশনা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পরিচালনা নীতিমালা সংশোধন সংবাদমাধ্যমকে অনেক সংবাদ উপাদান থেকে দূরে রাখছে। কিন্তু তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা না গেলেই বরং গুজবের জন্ম নেয় এবং তা মোকাবেলায় চড়া মূল্যও দিতে হয়। প্রমাণ হিসেবে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা সংস্কার বা রামুর বৌদ্ধ মন্দিরে হামলার কথা বলা যেতে পারে। বিশেষ করে কিছু ডাক্তার, কর্মকর্তার পাশাপাশি ঘরে বসে যখন সাধারণ মানুষ সামাজিক মাধ্যমে পিপিই, মাস্ক, স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার অভাব বা টেস্ট কম হওয়া নিয়ে বিতর্ক তুলেছিল, তখনই কিছু আইনি-দিক নির্দেশনা জারি হয়েছে। যেভাবেই দেখিনা কেনো, জনমনে আতঙ্কের বহিঃপ্রকাশ থেকেই কিন্তু এখন টেস্টের পরিমান বেড়েছে, প্রধানমন্ত্রী মাস্কের মান খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষায় নতুন নতুন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম শক্তিশালী হওয়ায় বর্তমানে সেখানকার ইস্যুগুলোও প্রথাগত গণমাধ্যমে সংবাদ হচ্ছে।
দেশের সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞাপনের একটা বড় অংশ ইন্টারনেটমুখী হওয়ায়, গণমাধ্যমের আয় কমেছে। আবার কাগজে করোনা ছড়ায় এমন উপযুক্ত গবেষণার ফলাফল না পাওয়ার পরও অনেক পাঠক পত্রিকা কেনা বাদ দিয়েছেন এবং সার্কুলেশনে একটা ধাক্কা খেয়েছে সংবাদপত্রগুলো। পর্যাপ্ত আর্থিক ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার অভাবে বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন প্রকাশের দক্ষ জনবল থাকার পরও তা সম্ভব হচ্ছে না। পত্রিকার পৃষ্ঠা, সংবাদ বা টেলিভিশনের অনুষ্ঠানের দিকে তাকালেও এ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। দীর্ঘসময় লগডাউনে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে বন্ধ, সেখানে সাংবাদিকদের কর্মঘণ্টা কমানো বা বাসায় বসে অফিস করা এবং শিফট করে অর্ধেক জনবলের অফিসের মধ্য দিয়ে তথ্যসেবা চালু রেখেছে সংবাদমাধ্যমগুলো। এদিক থেকে অবশ্যই তারা প্রশংসার দাবিদার।
আমাদের দেশে করোনায় আক্রান্তদের পরিচয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। করোনা সংক্রমণ হলে প্রতিনিয়ত অনুকূল পরিবেশের পরিবর্তে প্রতিকূলতা, উপসর্গ নিয়ে মারা গেলে দাফনে বাধা, হাসপাতাল তৈরিতে বাধা, বাসা ভাড়ায় বাধা ইত্যাদিও দেখতে হচ্ছে। সত্যিকার অর্থে করোনা সংক্রমণ কোনো পাপের ফল বা শতভাগ মরণব্যাধিও নয়। তবে অসচেতন বা সচেতন থাকার পরও এটি সংক্রমিত হলে হেলা-ফেলা না করে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়াটা জরুরি।
কিন্তু সংক্রমণে মৃত্যুর পর নিজের পরিবারের লোকজনও জানাজা বা শেষকৃত্যানুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকার ঘটনাও ঘটছে। এমনকি সংক্রমণের পর নিকটাত্মীয়রা ছেড়ে চলে যাচ্ছে বা নির্জন স্থানে রেখে চলে আসছে এমন ঘটনা আমাদের এক নির্মম বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। অনেক রিপোর্টে বলা হচ্ছে- করোনায় মারা গেছে বা করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। কিন্তু পরে দেখা যাচ্ছে উনি করোনায় মারা যান নি। মাঝখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, পরিবার, গ্রামবাসীকে নাজেহাল হতে হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে রাজশাহীতে প্রথম করোনায় মৃত্যু বলে যার কথা বলা হয়েছিল, বাধার মুখে এক কবরস্থান থেকে বাধ্য হয়ে অন্যস্থানে নিতে হয়েছিল- পরে বলা হয়েছে উনি করোনা আক্রান্ত্ম ছিলেন না। এক্ষেত্রে একটি বিপদের কথা হচ্ছে- সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের বাইরে সাংবাদিকদেও তেমন করণীয় কিছুই থাকছে না। আবার সংবাদমাধ্যমগুলোর বেশিরভাগই সংখ্যাতাত্ত্বিক বিবেচনায় আক্রান্ত বা মৃতের মধ্যে প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ থাকছে। এর বড় কারণ সাংবাদিকরাও করোনার কারণে অনেকটা ঘরবন্দী হয়েছেন। কিছু সংবাদমাধ্যমে সামাজিক দূরত্ব না মানা, বিদেশ থেকে দেশে ফেরা বা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রামে ফেরাকে একপাক্ষিক হিসেবে দেখানোর প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। আসলে বিদেশ বা দেশ থেকে চাকরি বা কর্মবিচ্যুত একজন মানুষ কতটা বিপদেও আশঙ্কা বা অভিজ্ঞতায় গ্রামে বা দেশে ফেরেন যেখানে অর্থ, অসুস্থতা, থাকার সমস্যা কতকিছু যে কারণ হতে পারে তার ইয়ত্তা নেই।
ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। তথ্যসেবা দিতে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিককে মৃত্যুবরণও করতে হয়েছে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে অন্যান্য- সরকারি, ব্যাংক, গার্মেন্টস, কৃষি বিভিন্ন প্রনোদনার আওতায় আসলেও গণমাধ্যম কেনো সেই তালিকায় থাকলো না সেটিও আলোচনার বিষয়। ইউনেস্কোও এক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকদের উপর তথ্যপ্রযুক্তির ৩২ ধারার ব্যবহার বেড়েছে বলে দৃশ্যমান হচ্ছে, যেটির বিষয়ে সরকারকে নতুন করে ভাবনার সময় এসেছে।
করোনার এই সময় থেকে সংবাদমাধ্যমকেও কিছু শিক্ষণীয় বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ করে মাঠে ও কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা জোরদার, কর্মীদের স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চিত, মানবিক কারণে হলেও ছাঁটাই বন্ধের বিকল্প নেই। সংবাদমাধ্যমকে এ সময়ে অন্যান্য হাউজের সাথে প্রতিযোগিতার সাথে সাথে সহযোগী হয়ে উঠতে হবে। নেটওয়ার্ক গড়তে হবে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাথে। আবার সরকারকেও সংবাদমাধ্যমকে আস্থায় নিতে হবে। বিশেষ করে সংবাদমাধ্যম অপতথ্য ও গুজবে বিরুদ্ধে লড়াই এবং সঠিক তথ্য জানিয়ে মানুষকে সচেতন করা বন্ধ করলে করোনা পরিস্থিতি কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়। আমাদের পার্শ্ববতী দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, অস্ট্রেলিয়ায়ও সরকারের পক্ষ থেকে সংবাদকর্মী ও সংবাদক্ষেত্রকে এ সময়ে কিছু সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। আমাদের দেশেও তা একটি কাঠামোর মধ্য থেকে বিষয়গুলোর সুরাহা করা যেতে পারে। তবে তা হতে হবে দলমত নির্বিশেষে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের সাংবাদিককের জন্য। পাশাপাশি করোনায় আক্রান্ত সাংবাদিকদের নির্ধারিত হাসপাতালে চিকিৎসা এবং শহীদ সাংবাদিকের পরিবারের জন্য রাষ্ট্রের ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অনুদান বা পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থা নিশ্চিতের কোনো বিকল্প নেই। সবশেষ বিষয়টি হলো ঐক্যবদ্ধ হওয়া। বাংলাদেশের অনেক পেশাজীবী শুধুমাত্র একতার কারণে সরকার বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রযোজ্য সুবিধা নিশ্চিত করতে পেরেছে। করোনাকালেও হলেও যদি দেশের সকল সাংবাদিক এ বিষয়ে গুরুত্ব দেন- তাহলে গণমাধ্যমের অবদান আরো কিছু পেশাজীবীর মতোই আলোচনা হবে এবং প্রণোদনাসহ সকল প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত হবে।
লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক