ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভূরাজনীতি

চীন যখন এশিয়ায় প্রভাব বাড়াচ্ছে, ট্রাম্প তখন ইরানে আটকে আছেন

চীন যখন এশিয়ায় প্রভাব বাড়াচ্ছে, ট্রাম্প তখন ইরানে আটকে আছেন
×

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: এএফপি

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ২০:৪১ | আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৪১

দক্ষিণ চীন সাগরের ছোট একটি প্রবালপ্রাচীর ‘সেকেন্ড থমাস শোল’। কয়েক দশকের বিরোধপূর্ণ এই স্থানটি নিয়ে চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যে আবার উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। গত মাসে সেখানে দুই দেশের কোস্টগার্ড ও সামরিক সদস্যরা সংঘর্ষে জড়িয়েছিলেন।

এ ঘটনার পর ফিলিপাইনের পক্ষ নিয়ে তাদের অন্যতম মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। কিন্তু তাতে চীনের তৎপরতা স্তিমিত হবে বলে কেউ আশা করতে পারছে না। বরং ইরান যুদ্ধে ব্যস্ত থাকা ট্রাম্প প্রশাসন চীনকে ঠেকানোর জন্য কতটুকু পদক্ষেপ নেবে- তা নিয়ে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সংশয় বাড়ছে।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ বেশ কিছু জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিপরীতে গত জুলাইয়ের শুরুর দিকে প্রশান্ত মহাসাগরে পারমাণবিক সক্ষমতার একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে চীন। বেইজিং যখন এভাবে শক্তি প্রদর্শন করছে, তখন জাপান ও ইন্দোনেশিয়ায় দুটি কনস্যুলেট বন্ধের আলাপ উঠেছে মার্কিন কংগ্রেসে।

প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির শীর্ষস্থানীয় ডেমোক্রেট নেতা ও নিউইয়র্কের প্রতিনিধি গ্রেগরি ডব্লিউ মিকস এক বিবৃতিতে বলেছেন, এশিয়া অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ বড় ব্যর্থতায় পরিণত হয়েছে। এটি চীনের কাছে উপহারের মতো। যা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা এশিয়া অঞ্চলে পিছু হটবেন না। ১০ আগস্ট ফিলিপাইনের ম্যানিলায় মার্কিন ডিফেন্স ফর পলিসির আন্ডার সেক্রেটারি এলব্রিজ কোলবি বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন বরাবর প্রতিরোধমূলক অবস্থান বজায় রাখা।’ এর অর্থ হলো তাইওয়ান, ফিলিপাইন ও জাপানের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলগুলোতে চীনের আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে প্রস্তুত।

একইসঙ্গে কোলবি মনে করে দিয়েছেন, মিত্রদেশগুলোকে প্রতিরক্ষা খাতে আরও বেশি অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে নিজেদের বাহিনীর সমন্বয়ের চেষ্টা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প গড়ে তোলার মতো নিষ্ফল চেষ্টা করা উচিত নয়।

কিন্তু এশীয় মিত্রদের মাঝে ওয়াশিংটনকে নিয়ে অস্বস্তি তৈরি করেছে ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধ। তাদের আশঙ্কা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রও এক ধরনের বড় প্রতিদ্বন্দ্বি বা বিপরীত মেরুর শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

ক্ষমতায় থাকতে বারাক ওবামা প্রশাসন প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাণিজ্য চুক্তির প্রচার চালিয়েছিল। কিন্তু পরের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান নেতারা এ থেকে পিছু হটেন। ফলে বেশ কয়েক বছর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নিয়ে মার্কিন সরকারের তেমন কোনো স্পষ্ট অর্থনৈতিক রূপরেখা ছিল না।

জো বাইডেন প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলে কাজ করা মিরা র‌্যাপ-হুপার বলছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো পরাশক্তির সংঘাতের মাঝে পড়তে চায় না। একইসঙ্গে দেশগুলো আশা করে, অঞ্চলটিতে যেন চীনের একক আধিপত্য না থাকে। তারা একটি ভারসাম্য চায়।

বর্তমানে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভিজিটিং ফেলো মিরা বলেন, ‘এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে দেশগুলোর মাঝে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে। তারা ভাবছে, ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটছে। এটি তাদের ওপর স্পষ্ট ও গভীর প্রভাব ফেলেছে।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সময় চীনকে অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে উল্লেখ করতেন। কিন্তু শুল্ক যুদ্ধে বেইজিং সফলভাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার পর ট্রাম্প নিজের অবস্থান থেকে সরে গেছেন। বর্তমানে তিনি চীনের সঙ্গে সমন্বয়ের পথ বেছে নিয়েছেন। গত মে মাসে বেইজিং সফরের সময় শি জিনপিংয়ের প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। আগামী মাসে শি’কে ওয়াশিংটন সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

ট্রাম্প এখন বেইজিংয়ের সঙ্গে মিলে জি-২ (গ্রুপ অব টু) নামে একটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তোলারও পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা যতই বাড়ছে, এশিয়ার কিছু দেশ ততটাই নিজেদের উপেক্ষিত বলে মনে করছে। ফলে তারা চীনের সঙ্গে শত্রুতা না বাড়িয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পথ বেছে নিচ্ছে।

ফিলিপাইনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক রিচার্ড হেডারিয়ান বলেন, ‘আমরা এক কঠিন পরিস্থিতিতে আটকে আছি। কারণ আমরা উভয়পক্ষের সঙ্গে সর্বোচ্চ স্তরের সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই।’ কঠিন পরিস্থিতির ব্যাখ্যায় রিচার্ড হেডারিয়ান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সামরিক মিত্র। চীনের হুমকি মোকাবিলায় তাদেরকে প্রয়োজন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থেকে সামরিক সহযোগিতা ছাড়া অন্য কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।’ 

জো বাইডেন প্রশাসনের আমলে মার্কিন সরকার এশিয়ায় কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তারা জাপান ও ফিলিপাইনকে একটি যৌথ নিরাপত্তা জোটে অন্তর্ভুক্ত করে। এছাড়া, ফিলিপাইনকে রাজি করিয়ে তাইওয়ানের নিকটবর্তী দ্বীপগুলোর ৯টি ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি বাড়ানো হয়।

গত জুনে ফিলিপাইন একটি বহুজাতিক সামরিক মহড়ায় অংশ নেওয়ার জন্য জাপানকে আমন্ত্রণ জানায়। এর মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো জাপানি সেনারা ফিলিপাইনের মাটিতে সামরিক কার্যক্রমে অংশ নেয়। ম্যানিলার এই পদক্ষেপকে বাইডেন প্রশাসনের গড়ে তোলা জোটের ধারাবাহিকতা বলা যায়। একইসঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একক নির্ভরতা কমারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আরও পড়ুন

×