ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রচারে মাঠ গরম

কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রচারে মাঠ গরম
×

সাব্বির নেওয়াজ, হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২০ | ১৪:৩১ | আপডেট: ২৫ জানুয়ারি ২০২০ | ১৪:৪৪

ঢাকার দুই সিটিতে ভোটের লড়াইয়ে কাউন্সিলর প্রার্থীরা পরস্পরের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। চলছে জমজমাট নির্বাচনী প্রচার। দিন-রাতের বালাই নেই। বাসা-বাড়ি, দোকানপাট, মার্কেট, কাঁচাবাজার-  সব চষে বেড়াচ্ছেন প্রার্থীরা। প্রতিটি ওয়ার্ডের অলিগলি প্রার্থীদের পোস্টারে ঠাসা। নির্বাচনী ব্যানারে সয়লাব সব এলাকা। পাড়া-মহল্লায় স্থাপিত ছোট নির্বাচনী প্রচার অফিসগুলোতে নেতাকর্মী-সমর্থকের ভিড়। চলছে খাওয়া-দাওয়া আর চা পানের হিড়িক। সারাদিনই মাইকে বাজছে ভোট চেয়ে গান। সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ওয়ার্ডগুলোতে কাউন্সিলর প্রার্থীদের সর্বাত্মক প্রচারে ঘাম ঝরাতে দেখা গেছে। নির্বাচনে বিজয়ী হতে তারা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন প্রতিনিয়ত। বিতরণ করছেন লিফলেট, দিচ্ছেন উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি। প্রতিদিন বিকেলে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে নির্বাচনী এলাকায় মিছিল বের করছেন তারা। প্রার্থীরা জানান, গত ১১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পর থেকেই তারা প্রচারে নেমে পড়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় নিজ ওয়ার্ডে নিজের প্রধান প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও করেন তারা।

এবার ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর মিলিয়ে ১৬৯ পদের জন্য লড়ছেন ৭৪৫ জন, যাদের মধ্যে দু'দলের বিদ্রোহী ছাড়াও অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা রয়েছেন।

উত্তর সিটি :শনিবার সকাল ১১টার দিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কলোনি বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী সফিউল্লাহ সফির নির্বাচনী কার্যালয়ে নেতাকর্মী-সমর্থকের ভিড়। কাপের পর কাপ চা আসছে। চায়ের কাপে ঝড় তুলেছেন তারা। মাইকে গান বাজছে সুরে সুরে- 'সফি ভাইয়ের দুই নয়ন, তেজগাঁওয়ের উন্নয়ন'। প্রার্থী সফিউল্লাহ সফিকে দেখা গেল মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ফ্যাক্টরি এলাকার বস্তিতে ভোট চাইতে। এলাকার বস্তিবাসীর জীবনমান উন্নয়নে তিনি পাশে থাকবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিলেন। পরে তিনি যান স্থানীয় বটতলা বাজার এলাকায়। বিকেলে পথসভা করেন কুনিপাড়া এলাকায়। গণসংযোগ করেন কুনিপাড়া এলাকার ভোটারদের সঙ্গে। সফি জানান, যেখানেই যাচ্ছেন, এলাকাবাসীর বিপুল সাড়া পাচ্ছেন। উত্তর সিটি মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া জহিরুল ইসলাম মানিক তার প্রতীক রেডিওর সমর্থনে গণসংযোগ করেন অ্যাভিনিউ ফাইভ এলাকায়। দুপুরে যান ১০ নম্বর সি ব্লক মহল্লায়। আসরের নামাজের পরে তিনি ভোট চাইতে যান ১০ নম্বর সেকশনের এ ব্লকে। উঠান বৈঠক করেন ১০ নম্বর ওয়াপদা ভবন ও ১১ নম্বর প্যারিস রোড এলাকায়। রাত সাড়ে ৯টায় উঠান বৈঠক করেন মুসলিম ক্যাম্প এলাকায়। সমকালকে এ প্রার্থী বলেন, প্রত্যেক ভোটারের কাছে পৌঁছানোর জন্য তিনি আপ্রাণ পরিশ্রম করছেন।

অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশান-১ নম্বরের নিকেতন আবাসিক এলাকা ও মহাখালী ওয়্যারলেস গেট এলাকায় দিনভর জনসংযোগ করেন ঠেলাগাড়ি প্রতীকের প্রার্থী মো. নাছির উদ্দিন। তিনি ২০ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর। প্রথমে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন না পেলেও পরে তিনি মনোনয়ন নিতে সক্ষম হয়েছেন। ২০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাহিদুর রহমানকে প্রথমে সমর্থন দিয়েছিল ক্ষমতাসীন দল। পরে বর্তমান কাউন্সিলর মো. নাছিরের ওপরই ভরসা রাখে দল। জাহিদুর রহমানও নির্বাচনের মাঠ ছাড়েননি। ভোটের লড়াইয়ে আছেন বিএনপি সমর্থিত মিজানুর রহমান বাচ্চু।এলাকাবাসী জানান, এখানে ত্রিমুখী লড়াই হবে।

শ্যামলী স্কোয়ার এলাকায় শনিবার প্রচার চালান উত্তরের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী ঠেলাগাড়ি প্রতীকের সৈয়দ হাসান নূর ইসলাম (রাষ্ট্রন) এবং ২৯, ৩০ ও ৩২ ওয়ার্ডের (সংরক্ষিত আসান-১১) নারী কাউন্সিলর প্রার্থী জিপগাড়ি প্রতীকের শাহিন আক্তার সাথী।

মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে প্রচার চালিয়ে সলিমুল্লাহ রোডে যাচ্ছিলেন ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আলেয়া সারোয়ার ডেইজি। তিনি প্রতিটি ভবনের পঞ্চম ও ষষ্ঠতলা পর্যন্ত উঠে ভোট চাইছিলেন। পরে তিনি রাজিয়া সুলতানা রোড হয়ে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের বিপরীতে শাজাহান রোডে যান। সমকালকে ডেইজি বলেন, আমি একটি বাড়িও মিস দিচ্ছি না। কারণ আমার টাকা ও পেশিশক্তি নেই। জনগণই আমার ভরসা।

উত্তর সিটির ৬ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি দলেরই বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এখানে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন রূপনগর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন রবিন। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন ঢাকা মহানগর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী। বিএনপির সমর্থন পেয়েছেন মাহাফুজ হোসেন খান সুমন, সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন দলটির আরেক নেতা আমজাদ হোসেন মোল্লাহ।

ঢাকা উত্তরের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর সালেক মোল্লাকে সমর্থন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। দলের সমর্থন না পেয়ে সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন তানভীর আহমেদ হায়দার। বিএনপির লিয়াকত আলীসহ কাউন্সিলর পদে আটজন এখানে লড়াইয়ে থাকায় নির্বাচন জমজমাট হবে বলে আশা এলাকাবাসীর।

ঢাকা উত্তরের ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডে হরিরামপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর হোসেন যুবরাজ আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন। হরিরামপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহেল শেখ, তুরাগ থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. জাহিদুল হাসান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে দলের সমর্থন পেয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছেন বেরাইদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব আনছার মিন্টু। সেখানে বিএনপি সমর্থিত মো. তুহিনুর ইসলামকে নিয়ে তিন প্রার্থী।

সরেজমিন দেখা গেছে- ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মো. শাখাওয়াত হোসেন শওকত। তার মার্কা রেডিও। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভোটারের বাড়ি বাড়ি গিয়ে লিফলেট বিতরণ ও প্রচার চালাচ্ছেন তিনি। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন একটি মডেল ওয়ার্ড গড়ার।

এদিকে নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যাডমিন্টন মার্কা নিয়ে ডিএনসিসির ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী শরিফউদ্দিন জুয়েল এবং এয়ারকন্ডিশন মার্কা নিয়ে গণসংযোগ করছেন ডিএনসিসির ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী সাজেদুল হক খান রনি। নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়নে নিজেকে ঢেলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তারা।

এই দু'জন ছাড়াও বিএনপি থেকে যারা কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছেন, তাদের অধিকাংশই চাপে আছেন। কারও কারও বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। কেউ জামিনে আছেন, কেউ পলাতক।

দক্ষিণ সিটি: ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী ও তাদের সমর্থক ও কর্মী বাহিনী দলবেঁধে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। কুশল বিনিময়ের পর ভোট চাইছেন প্রার্থীর প্রতীকে। চলছে মাইকিং। অনেক এলাকায় প্রতীক নিয়ে খণ্ড খণ্ড মিছিল হচ্ছে। দল সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা নিজেদের পাশাপাশি দলীয় মেয়র প্রার্থীর জন্য ভোট চাইছেন।

সকাল ১১টায় ডিএসসিসির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন গোপীবাগের রামকৃষ্ণ মিশন রোডে দেখা যায়- তিন নারী বাসায় বাসায় গিয়ে ভোটারদের নম্বর সরবরাহ করছেন। এ সময় তারা নিজেদের প্রার্থীর জন্য ভোট ও দোয়া চাইছেন। এলাকার উন্নয়নে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এ সড়কসহ আশপাশের সব অলিগলি মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর পোস্টারে ঢেকে গেছে। দু'দল সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদেরও পোস্টার ঝুলছে, অন্যদল ও স্বতন্ত্র কাউন্সিলর প্রার্থীদের পোস্টারও। হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা সত্বেও পলিথিন মোড়ানো পোস্টার সর্বত্র।

গোপীবাগ পেরিয়ে মানিকনগর পুকুরপাড় ও ওয়াসা রোড ঘুরে দেখা যায় ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীরা ভোটারদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করছেন। বয়স্ক লোকদের পায়ে সালাম করে ভোট চাইছেন। অন্যদের বুকে জড়িয়ে ধরছেন। সড়ক নির্মাণ, মাদক-সন্ত্রাস দূর করা, খেলার মাঠ তৈরিসহ নানা রকম নাগরিক সুবিধার কথা তুলে ধরছেন ভোটারদের কাছে।

প্রচারে নারীদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ. কদমতলী ও ডেমরা ঘুরে দেখা যায় নানা বয়সী নারী-পুরুষ, তরুণ তরুণী এমনকি কিশোররাও নিজেদের প্রার্থীর পক্ষে ভোটের প্রচারে অংশ নিচ্ছে।

গতকাল দুপুর আড়াইটার পর থেকে পুরান ঢাকার বাবুবাজার এলাকা থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস। ডিএসসিসি ৩২ ও ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত দুই কাউন্সিলর প্রার্থী এম এ মান্নান ও আবদুর রহমান মিয়াজীও অংশ নেন। নেতাকর্মীদের চাপে সে সময় সড়কে যানজট হয়। গতকাল রাজধানীর জিন্দাবাহার লেনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেনকে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালাতে দেখা যায়। এ সময়ও যানজট দেখা যায়।

চাঁনখারপুল মোড়ে কথা হয় চা বিক্রেতা নুরুল্লার সঙ্গে। তিনি থাকেন কামরাঙ্গীরচর এলাকায়। নুরুল্লা বলেন, সারাদিন পুরান ঢাকার অলিগলি ঘুরে চা ও সিগারেট বেচেন। ভোট উপলক্ষে বিক্রি ভালোই হচ্ছে। লোকজন বিভিন্ন প্রার্থীর বিষয়ে খোঁজখবর রাখছেন। রাতে এলাকায় ফিরলেও ভোটের গরম টের পাওয়া যায় বলে জানান তিনি। অনেক রাত পর্যন্ত প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে ভোট চাইছেন।

আরও পড়ুন

×