১০০ টনের বেশি ভোটের প্লাস্টিক!
জয়নাল আবেদীন
প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২০ | ১৪:১৩
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনী প্রচারে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক ব্যবহূত
হয়েছে। কুয়াশা ও বৃষ্টি থেকে পোস্টারকে অক্ষত রাখতে প্লাস্টিকে মুড়িয়ে
লেমিনেশন করার এ 'আভিজাত্যে' অংশ নিয়েছেন বেশিরভাগ প্রার্থী। এক হিসাবে
দেখা গেছে, এবার ভোট উপলক্ষে ঢাকায় ব্যবহূত হয়েছে ১০০ টনের বেশি
পরিবেশবিধ্বংসী 'ওয়ান টাইম' প্লাস্টিক। হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই
ভোটের পোস্টারে লেমিনেশন এবং তা প্রদর্শন চলে পুরো সময়েই।
পরিবেশবিদদের মতে, ভোটের পোস্টারে ব্যবহূত প্লাস্টিক দীর্ঘদিন অপচনশীল
থাকে। এগুলো দ্বিতীয়বার ব্যবহারও করা যায় না। এ ধরনের 'ওয়ান টাইম'
প্লাস্টিক যখন বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের মাথাব্যথার কারণ, তখন উৎসবের সঙ্গে
ঢাকায় লেমিনেটেড পোস্টারে চলছে ভোটের প্রচার। ভোট শেষে এসব প্লাস্টিকের শেষ
ঠিকানা হবে রাজধানীর ড্রেন ও নালা-নর্দমা। এতে একদিকে জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে
পরিবেশের ভয়ংকর ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ভোট শেষে এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য অপসারণ নিয়েও দুশ্চিন্তায় সিটি করপোরেশন।
অথচ একেবারেই নির্বিকার সরকারি সংস্থা পরিবেশ অধিদপ্তর। হাইকোর্টের দেওয়া
নিষেধাজ্ঞা অমান্যের বিরুদ্ধে কোনো সংস্থাকেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা
যাচ্ছে না।
ঢাকার দুই সিটিতে ভোটগ্রহণ আগামীকাল শনিবার। মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে শেষ
হয়েছে প্রচার। তবে গোটা শহর ঢেকে আছে পোস্টারে। মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত
নারী কাউন্সিলর পদে ৭৫৭ জন লড়ছেন দুই সিটিতে। কোনো কোনো মেয়র প্রার্থী
পাঁচ লাখ পর্যন্ত পোস্টার ছাপিয়েছেন। কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে ১০ হাজার
থেকে ৩০ হাজার পর্যন্ত পোস্টার ছাপানোর তথ্য পাওয়া গেছে। সে হিসাবে এবার
ছাপা হয়েছে এক কোটির বেশি পোস্টার। এর অন্তত ৮০ শতাংশই লেমিনেটেড।
শহরজুড়ে টানানো লেমিনেটেড পোস্টার নিয়ে গবেষণা করেছে স্টামফোর্ড
বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)। এ গবেষণায়
নেতৃত্ব দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আহমেদ
কামরুজ্জামান মজুমদার। তিনি সমকালকে জানান, তারা ৩০ প্রার্থীর পোস্টার ধরে
গবেষণাটি করেছেন। এতে দেখা যায়, প্রতিটি পোস্টারে ব্যবহূত প্লাস্টিকের গড়
ওজন ১৩ দশমিক ৪৭ গ্রাম। কোনো কোনোটিতে সর্বোচ্চ ১৮ দশমিক ৫ গ্রাম প্লাস্টিক
ব্যবহার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ১০০ টনের বেশি প্লাস্টিক ব্যবহূত
হয়েছে ঢাকার দুই সিটির ভোটের পোস্টারে।
ড. কামরুজ্জামান আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, প্রার্থীরা সবুজ নগরী গড়ার
প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা নিজেরাই প্রচারের মাধ্যমে আত্মঘাতী কাজ করছেন।
ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার পরিত্যক্ত হয়ে ড্রেনে চলে যাচ্ছে।
বর্ষাকালে এর প্রভাব বোঝা যাবে।
লেমিনেটেড পোস্টার ছাপা ও প্রদর্শন বন্ধের নির্দেশ দিয়ে ২২ জানুয়ারি রুল
জারি করেন হাইকোর্ট। মানার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। গত কয়েকদিন সরেজমিন ঘুরে
দেখা গেছে, নির্বিঘ্নেই ছাপাখানায় চলেছে পোস্টার লেমিনেশন। প্রেসের মালিক
এবং কর্মচারীরা জানাচ্ছেন, পোস্টার লেমিনেশনের বিষয়ে তারা কোনো
প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েননি। আদালতের নিষেধাজ্ঞার খবর জানেন বেশিরভাগ মালিক।
তবে এ কাজের চাহিদায় নূ্যনতম কমতি নেই। দিনের চেয়ে রাতে লেমিনেশনের কাজ
হয়েছে বেশি। রাতেই সে পোস্টার ভ্যানভর্তি হয়ে চলে যায় গন্তব্যে। টানানো
হয়েছে রাজধানীর আনাচে-কানাচে।
১১৯, ফকিরাপুলে তানিয়া লেমিনেশন অ্যান্ড স্পট প্রেসের স্বত্বাধিকারী শফিকুল
ইসলাম সোহেল জানান, আড়াই টাকায় প্রতিটি পোস্টার লেমিনেশন করে থাকেন তারা।
আদালতের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, 'এখন তো
পোস্টার লেমিনেশন নিষিদ্ধ। তার পরও মানুষ অর্ডার দেয়, তাই করি। কেউ এখনও
বাধা দেয়নি।'
ফকিরাপুলে সবচেয়ে বড় লেমিনেশনের প্রেস ১৯৩/এ নম্বর হোল্ডিংয়ের 'সোনালী
অ্যান্ড প্রিন্টিং লেমিনেশন'। পাশাপাশি চারটি মেশিনে লেমিনেশন করা হয়।
বছরজুড়ে অন্যান্য কাজ হলেও ভোটের সময় পোস্টারের ব্যস্ততাই বেশি। এ
প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী জয়নাল আবদীন জানান, তিনি আদালতের নিষেধাজ্ঞার
বিষয়ে অবগত। কিন্তু বিষয়টি প্রশাসন থেকে সেভাবে আসেনি বলে কাজটি চালিয়ে
যাচ্ছেন।
ফকিরাপুলে পোস্টার লেমিনেশনের আরেকটি বড় প্রতিষ্ঠান ঝর্ণা প্রিন্টার্স।
১৯৩/ডি বক্স কালভার্ট সড়কে অবস্থিত এ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ইব্রাহীম
খলিল বলেন, তার প্রেসে রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা পোস্টার লেমিনেশনের কাজ চলে। দুই
টাকা ৮৯ পয়সা হারে তিনি শুধু লেমিনেশনের কাজ করেন। এখন পর্যন্ত কেউ এ কাজে
বাধা দেয়নি। স্থানীয় প্রশাসন থেকেও কোনো বিধিনিষেধ আসেনি। ১৫৫/৫ নয়াপল্টনে
মাস্টার প্রিন্টিংয়ের এক কর্মচারী জানান, তিন টাকা হারে লেমিনেশনের কাজ
করেন তারা। চাহিদা বেশি হওয়ায় দরও বেশি। তবে দিনের বেলায় অন্য কাজ সারেন।
রাতভর হয় পোস্টার লেমিনেশনের কাজ।
কার্যকর পদক্ষেপ নেই :পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বিবেচনায় লেমিনেটেড পোস্টার
ছাপা ও প্রদর্শন বন্ধের নির্দেশ দিয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। এতে নির্বাচন
কমিশন, নির্বাচন কমিশনের সচিব, স্থানীয় সরকার সচিব, শিল্প সচিব, স্বাস্থ্য
সচিব এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রতি
চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। তবে পোস্টারে লেমিনেশন ও
প্রদর্শন বন্ধের বিষয়ে কোনো সংস্থাকেই তৎপর হতে দেখা যায়নি। ঢাকা দক্ষিণ
সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. ইমদাদুল হককে একাধিকবার
ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী
কর্মকর্তা মো. আবদুল হাই মিটিংয়ে ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে ফোনের সংযোগ
বিচ্ছিন্ন করে দেন।
ঢাকা দক্ষিণের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. জাহিদ
হোসেন সমকালকে বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো
ব্যবস্থা গ্রহণ হয়েছে কিনা, তার জানা নেই। তবে ভোটের পরদিন থেকেই রাজধানীর
পোস্টারগুলো অপসারণে তারা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন।
প্লাস্টিকে মোড়ানো পোস্টারগুলো রাজধানীর পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে
ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে জাহিদ হোসেন বলেন, হাইকোর্টের
নির্দেশনার পর এ বিষয়ে সংশ্নিষ্ট প্রার্থীদের কাছে কৈফিয়ত চাওয়ার এখতিয়ার
শুধু রিটার্নিং কর্মকর্তার। নির্বাচনের সময় সিটি করপোরেশন এ বিষয়ে কিছুই
করতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, সংশ্নিষ্ট প্রার্থীদেরই উচিত পোস্টারগুলো অপসারণ করা;
কিন্তু আমাদের দেশের রেওয়াজ অনুযায়ী কাজটি সিটি করপোরেশনের ওপরই চলে আসে।
এবার বিপুল পরিমাণ পোস্টার সরাতে সত্যিই বেগ পেতে হবে।
- বিষয় :
- ভোটের প্লাস্টিক!
