ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচন

বাসযোগ্য, দূষণমুক্ত নগরী উপহার দেব: ইশরাক হোসেন

বাসযোগ্য, দূষণমুক্ত নগরী উপহার দেব: ইশরাক হোসেন
×

কামরুল হাসান

প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:৫৬ | আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০২০ | ১৪:৩৬

নগরবাসীর ভোটে নির্বাচিত হলে নাগরিক সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি তাদের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপসকে উচ্চশিক্ষিত, মার্জিত আখ্যা দিয়ে তিনি নির্বাচনে কোনো প্রভাব বিস্তার করবেন না বলে আশা প্রকাশ করেন ইশরাক। জনগণের ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে রাজনৈতিক কিংবা সাংবিধানিক নিয়ম অনুসরণ করবেন বলেও প্রত্যাশা করেন ইশরাক। এ নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হলে বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের মতো আধুনিক নগর গড়ে তোলার জন্য সব রকমের উদ্যোগ নেবেন। ঢাকা শহরের বর্তমান সংকট নিরসনে বুদ্ধিজীবী, বিশেষজ্ঞ আর অভিজ্ঞদের মতামত নিয়ে সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় কাজ করবেন তিনি। নির্বাচনে তার স্লোগান 'গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করা, জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া'।

৩০ জানুয়ারি সিটি নির্বাচন সামনে রেখে গতকাল বৃহস্পতিবার সমকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন আরও বলেন, অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এবং তার বাবা সাদেক হোসেন খোকা দীর্ঘদিন ধরে সিটি করপোরেশন এলাকায় উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। তার সংস্পর্শে থেকে সিটি করপোরেশনের সমস্যা এবং সমাধান করার কৌশল রপ্ত করতে পেরেছেন তিনি। বাবার দেখানো পথ ধরে স্বপ্নের ঢাকা শহর গড়ে তুলতে তিনিও কাজ করবেন। নাগরিক সমস্যা যানজট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, মশার উপদ্রব, বায়ুদূষণ ইত্যাদি বিষয়ে দ্রুত সমাধান করবেন।

২০১৮ সালের নির্বাচনে ইশরাক হোসেন তার বাবা সাদেক হোসেন খোকার আসন ঢাকা-৬-এর জন্য বিএনপির মনোনয়ন চান। কিন্তু জোট রাজনীতির কারণে তাকে মনোনয়নবঞ্চিত হতে হয়। খুব সাবলীলভাবে বিএনপির হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে সবার নজরে আসেন ইশরাক। বিএনপির কূটনৈতিক উইংয়ের প্রভাবশালী এ সদস্য নির্বাচনে মনোনয়ন না পেলেও জোটের প্রার্থীর জন্য মাঠে কাজ করেন। নির্বাচনের আগে ও পরে মামলা-হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের জন্য আইনি সহায়তা সেল গঠন করেন। এতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের আস্থা ও ভালোবাসার জায়গায় স্থান করে নেন ইশরাক। দল ও নেতাকর্মীদের জন্য তার ভালোবাসার পুরস্কার হিসেবে এবার তাকে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মনোনয়ন দেওয়া হয়।

নিজেকে পুরান ঢাকার সন্তান হিসেবে গর্ববোধ করে ইশরাক বলেন, এ এলাকার মানুষের ভাষা তিনি বুঝতে পারেন। যেমন বুঝতে পারতেন তার বাবা সাদেক হোসেন খোকা। তিনি যেমন সাধারণ মানুষের নেতা ছিলেন, তেমনি ইশরাকও সাধারণ জনগণের প্রতিনিধি হতে চান। সিটি করপোরেশন এলাকার জনগণের জন্য অবারিত দরজা খুলে তাদের সমস্যার সমাধান করার জন্যই তিনি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তা ছাড়া দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনী যুদ্ধকে বেছে নিয়েছেন তিনি।

সরকারের অনেক বাধা তাকে অতিক্রম করতে হবে উল্লেখ করে প্রকৌশলী ইশরাক বলেন, তার মনোবল অনেক দৃঢ়। তার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে তিনি এ যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। কখনও অন্যায়ের কাছে হার মানবেন না। এ জন্য তিনি তার বাবার সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী, সমর্থক ও নগরবাসীকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চান। তার বাবার রেখে যাওয়া স্মৃতির কারণে জনগণ এখনও তাকে স্মরণ করেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ঢাকায় সড়ক করেছেন; রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন, মশক নিধনে কাজ করেছেন। তার সময়ে মশার কামড়ে ভয়াবহ ডেঙ্গুর কোনো প্রকোপ ছিল না। দুর্নীতিমুক্ত সিটি করপোরেশন তিনি নগরবাসীকে উপহার দিয়েছিলেন। মেয়র পদ থেকে তিনি চলে যাওয়ার পর ওই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা থাকলে আজকের ঢাকা তিলোত্তমা হতো। অন্যান্য বিশ্বের মতো ঢাকাকেও পৃথিবী চিনত। কিন্তু এখন চেনে দূষণের ঢাকা হিসেবে।

শিক্ষাজীবন সম্পর্কে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন বলেন, স্কলাস্টিকা স্কুল থেকে ও-লেভেল এবং এ-লেভেল শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারে (যুক্তরাজ্য) চলে যাই। সেখানে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আন্ডারগ্র্যাজুয়েশন ও মাস্টার্স শেষ করে বাংলাদেশে ফিরে আসি। ছোটবেলা থেকেই আমি একটি রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বড় হয়েছি। এটা আমার উপলব্ধি যে দেশপ্রেম ছাড়া সুষ্ঠু রাজনীতি অসম্ভব। আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। সেটিই আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমার বয়স যখন চার বছর, তখনই দেখেছি আমার বাবা মন্ত্রী। এরপর বড় হয়ে আমার বাবার নির্বাচনী সব প্রচারে অংশ নিয়েছি। আসলে তখন থেকেই রাজনীতি বুঝতে শিখেছি।

তার কোনো উচ্চাভিলাষ নেই দাবি করে প্রকৌশলী ইশরাক বলেন, জনগণের কথা তুলে ধরতে চান, তাদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হতে চান। আর প্রিয় রাজধানী ঢাকার মানুষকে উপহার দিতে চান উন্নত বিশ্বের মতো একটি বাসযোগ্য ও দূষণমুক্ত নগরী।

মেয়র হিসেবে বিএনপি কেন তাকে বেছে নিল- জানতে চাইলে তিনি বলেন, তরুণদের নেতৃত্বে আনার জন্য, তাদের মধ্যে দেশসেবার মন্ত্র জাগিয়ে তুলতে, প্রতিনিধিত্ব করতে, উদ্বুদ্ধ করতে তাকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে পছন্দ করেছেন। এ শহর নিয়ে কাজ করার আগ্রহ এবং তার বাবা মেয়র হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে যে কাজ করেছেন, তা প্রত্যক্ষভাবে দেখেছেন বলে সিটি করপোরেশনে তিনি ভালো কিছু করতে পারবেন- এটা মনে করে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

মেয়র পদে বিজয়ের সম্ভাবনা কেমন- জানতে চাইলে ইশরাক বলেন, একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এবং গণনা সুষ্ঠু হলে, পাশাপাশি ইভিএমে কোনো কারচুপি বা কারসাজি করা না হলে জয়ের বিষয়ে তিনি শতভাগ নিশ্চিত। কারণ, দেশের জনগণের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ এ সরকারকে পছন্দ করে না। এমনকি আওয়ামী লীগের অনেক পুরোনো নেতারাও এখন এ সরকারকে পছন্দ করছেন না। মাঠ জরিপেও তার প্রাথমিক বিজয় হয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন।

জয়লাভের ক্ষেত্রে তার সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী হতে পারে- এ প্রশ্নের জবাবে ইশরাক বলেন, ইভিএমই তার প্রথম চ্যালেঞ্জ। ইভিএমে কারচুপিটা হবে সূক্ষ্ণ এবং নীরবে-নিভৃতে। কারণ এখানে যে সফটওয়্যার রয়েছে, সেটি যদি সেভাবে প্রোগ্রাম করা হয়, তাহলে দিনশেষে জয়ী হবেন তারা (আওয়ামী লীগ প্রার্থী)। বিশ্বের মাত্র চারটি দেশে ইভিএম ব্যবহূত হয়। সেখানে 'পেপার ট্রে' আছে, যাতে ভোট পুনর্গণনার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের ইভিএমে সেটি নেই। আবার আওয়ামী লীগ সরকার এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে কী ধরনের নির্বাচন হয়, তা গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশবাসী দেখেছে। একই সঙ্গে হয়রানি করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করা হতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে না পারলে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে না।

ভোটাররা কেন তাকে ভোট দেবে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তিনি ঢাকার সন্তান। তার জন্ম পুরান ঢাকার গোপীবাগে। এখানেই তার বেড়ে ওঠা এবং এখানকার মানুষের সঙ্গেই তার আত্মার সম্পর্ক। এ বিষয়টি ভোটাররা বিবেচনা করবেন। তিনি এ শহরে বেড়ে ওঠার পাশাপাশি শহরের মূল সমস্যাগুলো বুঝতে শিখেছেন, বাবার কারণে তা সমাধান করতেও শিখেছেন। এ ছাড়া বাবা এ এলাকার সংসদ সদস্য এবং মেয়র হিসেবে এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন। সেই জনপ্রিয়তার ভোটব্যাংকও তার রয়েছে। সবচেয়ে বড় কারণটি হচ্ছে- বিএনপির সমর্থনে সারাদেশে যে গণজোয়ার রয়েছে, তার ফলও তিনি পাবেন। এখানে যে কাউকে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রার্থী করলে তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন। সে হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে যখন ভোট চাইব, তখন ভোটাররাও তেমন সাড়া দেবেন।

জয়ী হলে প্রথম ১০০ দিনের পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, সামনে মশার মৌসুম আসছে। তাই মশা নিধনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। ওয়ার্ডভিত্তিক স্থানীয় কাউন্সিলরদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর দ্রুত সমাধান করবেন। এর মধ্যে ড্রেনেজ, রাস্তাঘাট ও পরিচ্ছন্নতা রয়েছে। এ ছাড়া নগর পরিকল্পনাবিদদের মতামত নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেবেন তিনি।

ঢাকা নিয়ে তার স্বপ্ন সম্পর্কে জানতে চাইলে ইশরাক বলেন, এটা কেন উন্নত শহর হবে না? ঢাকা শহর দেখতে পর্যটক আসবে না? তিনি এই ঢাকাকে একটি উন্নত শহরে পরিণত করতে চান। শহর ব্যবস্থাপনার ওপরে তার পড়াশোনা রয়েছে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে সমস্যার সমাধান করা হবে। বসবাসের অযোগ্য হিসেবে খ্যাতি পাওয়া এই ঢাকা এভাবেই বদলে যাবে।


আরও পড়ুন

×