তাহসিফের মৃত্যু
হত্যা মামলা করলেন বাবা
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি (ফাইল ফটো)
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৪০ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:৩৭
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করেছেন তার বাবা এনায়েতুল করিম। তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের লাশ উদ্ধারের দুই দিন পর শুক্রবার রাতে মামলাটি করা হয়।
আজ শনিবার সকালে সমকালকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মো. রেজাউল করিম। তিনি বলেন, ‘হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে গুম করার অভিযোগে মামলাটি হয়েছে। এতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।’
এদিকে এ মামলায় তাহসিফের ব্যবসায়িক অংশীদার ও বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই শাহরিয়ার রেজা দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পরে তাকে নৌ-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআই এর একটি সূত্র সমকালকে এ তথ্য নিশ্চিত করে।
শুক্রবার তাহসিফের বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম দাবি করেছেন, তাঁর ছেলে সাঁতার জানতেন এবং পাইলট প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে বিশেষ সাঁতার কোর্স সম্পন্ন করে সনদও পেয়েছিলেন। তাই দীপের দেওয়া ‘ধাওয়ার মুখে নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার’ বক্তব্য তিনি বিশ্বাস করছেন না।
সমকালকে তিনি বলেন, তাহসিফকে ধাওয়া করার কোনো কারণ নেই। তাঁর ভাষায়, ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, একজন ডিফেন্স অফিসার পুলিশের ভয়ে দৌড় দেবে– এটা হাস্যকার না!
এনায়েতুল করিম বলেন, ‘মামলার ব্যাপারে আমরা এখনও ভাবিনি। আমরা পারিবারিকভাবে আলোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত নেব। তবে মামলার কেন প্রয়োজন হবে? সরকার নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে দায়িত্ববোধের পরিচয় দেবে এবং অত্যন্ত আন্তরিক হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে মামলা মানেই তো ঝামেলা, কোর্টে দৌড়াদৌড়ি। কে চায় এই ঝামেলার মধ্যে পড়তে? যেখানে আমাদের চমৎকার সরকার রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে আমি ইতোমধ্যে লক্ষ্য করেছি, তারা অত্যন্ত দায়িত্ববান এবং সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।’
তাহসিফের ছোট্ট ব্যবসাটি দীপ দেখাশোনা করতেন বলে জানান কে এম এনায়েতুল করিম। তিনি বলেন, অন্য চাকরি করায় ছেলের ব্যবসা দেখাশোনার দায়িত্ব পড়েছিল দীপের ওপর। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন কোম্পানিতে নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহের কাজটি দেখতেন। এ কারণে দীপের সঙ্গে তাহসিফের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল।
রাজধানীর উত্তরখানের তুরাগ নদের রাজবাড়ী ঘাট থেকে বুধবার বিকেলে তাহসিফের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। নদের প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকায় অন্তত ১৪ ঘণ্টা ধরে ভাসছিল তাহসিফ সাউরির মরদেহ। তাহসিফের বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তুরাগের যে স্থানে ঘটনার সূত্রপাত, সেটি শনাক্ত করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তার কাছাকাছি জায়গা টঙ্গী সেনাকল্যাণ সংস্থার পাশে হোন্ডা রোড থেকে আজ সকালে একটি মোটরসাইকেল পাওয়া যায়। সেই হোন্ডা রোড এবং হাজী মাজার বস্তি সংলগ্ন ইজতেমার মাঠ পরিদর্শন করেন তাঁরা।
তাহসিফের মৃত্যুর আগে এই স্থানটিতেই এসেছিলেন তাহসিফ ও দ্বীপ। জিজ্ঞাসাবাদে দ্বীপ পুলিশকে বলেছেন, ‘সেদিন তারা ঘটনাস্থলে কথা বলছিলেন। এ সময় কিছু লোক তাদের ধাওয়া করে। তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন। আর তিনি পালিয়ে আসেন।’ তবে তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। ময়নাতদন্তসহ বেশ কিছু প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের হবে বলছে পুলিশ। পুলিশ জানায়, কেন, কী কারণে এত রাতে তুরাগ নদের পারে একটি অপরাধপ্রবণ এলাকায় তাহসিফ ও দীপ গেলেন, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
দীপের ভাষ্যমতে, মঙ্গলবার মধ্যরাতে তাহসিফসহ তিনি টঙ্গী পশ্চিম থানার তুরাগ নদ-সংলগ্ন হাজী মাজার বস্তি এলাকায় যান। এর অদূরে নদ শনাক্তকরণের ২৯ নম্বর পিলার। মধ্যরাতে দুজন ইউনিফর্মধারী লোক তাদের ধাওয়া করেন। তিনি বলেন, নিজেকে আড়াল করতে তিনি (দীপ) পিলারের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। এক পর্যায়ে সেখান থেকে পালিয়ে মোহাম্মদপুরের বাসায় আসেন তিনি (দীপ)।
পুলিশ জানায়, দীপের তথ্য অনুযায়ী হাজী মাজার বস্তি এলাকায় অভিযান চালিয়ে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। সেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় সেখানে পড়ে ছিল। পুলিশ বলছে, যে মোটরসাইকেল নিয়ে তাহসিফ বাসা থেকে বের হয়েছেন, সেটিই উদ্ধার করা হয়েছে। নম্বরহীন থাকায় মোটরসাইকেলটির মালিকানা যাচাই করা হচ্ছে।
তাহসিফের ঘটনার ছায়া তদন্ত করছে পিবিআই। মূল তদন্তের দায়িত্বে রয়েছে নৌ পুলিশ। পিবিআই ছায়া তদন্তের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য নৌ পুলিশকে দিচ্ছে।
নৌ পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি রেজাউল করিম সমকালকে বলেন, ‘মৃত্যুর কারণের বিষয়ে আমরা এখনও নিশ্চিত হতে পারিনি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। অন্যান্য সংস্থাও তদন্তে আমাদের সহায়তা করছে। আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হচ্ছে।’
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুর রহমান সমকালকে বলেন, ‘হাজী মাজার বস্তি এলাকা ও বস্তি-সংলগ্ন ইজতেমার মাঠে মাদক বেচাকেনা চলে। তাই সেখানে পুলিশের নিয়মিত টহল থাকে। মঙ্গলবার রাতেও টহল ছিল। তবে টহলে থাকা পুলিশ সদস্যরা কাউকে ধাওয়া দিয়েছে এ ধরনের কোনো তথ্য আমাকে জানানো হয়নি।’
নৌ পুলিশের এক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গতকাল বিকেলে সমকালকে বলেন, তাহসিফের পরিবারকে মামলার জন্য বলা হয়েছে। কিন্তু থানায় এখনও মামলা করেনি তাঁর পরিবার। যদি তারা কোনো মামলা না করে, তবে পুলিশকেই হয়তো মামলা করতে হবে।
- বিষয় :
- মামলা