পিসিওএস থেকে পিএমওএস: নারীর প্রজনন ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের নীরব চ্যালেঞ্জ
অধ্যাপক রাশিদা বেগম
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৭:২৩ | আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৭:২৬
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (Polycystic Ovary Syndrome-PCOS) নারীদের একটি বহুমাত্রিক হরমোনজনিত ও বিপাকীয় সমস্যা। ২০২৬ সালের ১২ মে রোগটির নতুন নাম হিসেবে পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিনড্রোম (Polyendocrine Metabolic Ovarian Syndrome-PMOS) গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলায় একে বলা যেতে পারে বহুঅন্তঃস্রাবী, বিপাকীয় ও ডিম্বাশয়জনিত সিনড্রোম। নতুন নামটি বোঝায় যে এটি শুধু ডিম্বাশয়ের "সিস্ট”-এর রোগ নয়; বরং ডিম্বাশয়, বিভিন্ন হরমোন, ইনসুলিনের কার্যকারিতা, শরীরের ওজন, হৃদ্রোগের ঝুঁকি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। প্রকৃতপক্ষে পিএমওএসে ডিম্বাশয়ে সত্যিকারের সিস্ট থাকা আবশ্যক নয়। আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে দেখা ছোট ছোট ফলিকলকে অনেক সময় ভুলভাবে "সিস্ট” বলা হয়। আবার ডিম্বাশয়ে পলিসিস্টিক গঠন না থাকলেও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে পিএমওএস নির্ণয় করা যেতে পারে।
রোগের বিস্তার
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, প্রজননক্ষম বয়সী নারীদের প্রায় ১০-১৩ শতাংশ পিএমওএসে আক্রান্ত। অর্থাৎ প্রতি আট থেকে দশজন নারীর মধ্যে প্রায় একজনের এই সমস্যা থাকতে পারে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্ত নারীদের প্রায় ৭০ শতাংশই জানেন না যে তাঁদের এই রোগ রয়েছে। এটি অনিয়মিত ডিম্বস্ফোটনজনিত বন্ধ্যত্বের সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলোর একটি।
বয়ঃসন্ধিকালে এর লক্ষণ শুরু হতে পারে, তবে অনেক নারী অনিয়মিত মাসিক, অতিরিক্ত লোম, ওজন বৃদ্ধি অথবা সন্তান ধারণে সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসার পর রোগটি শনাক্ত হয়।
পিএমওএস কীভাবে হয়?
পিএমওএসের একক কোনো কারণ নেই। বংশগত প্রবণতা, ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়া, অতিরিক্ত পুরুষ হরমোন, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, অতিরিক্ত ওজন এবং পরিবেশগত বিভিন্ন প্রভাব পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রোগটির সৃষ্টি ও প্রকাশে ভূমিকা রাখে।
শরীরে ইনসুলিন ঠিকভাবে কাজ করতে না পারলে তাকে বলা হয় ইনসুলিন প্রতিরোধীতা। তখন রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অগ্ন্যাশয় অতিরিক্ত ইনসুলিন তৈরি করে। এই বাড়তি ইনসুলিন-
• ডিম্বাশয় থেকে কোষকে বেশি পুরুষ হরমোন উৎপাদনে উদ্দীপিত করে;
• যকৃতে যৌন হরমোন-বহনকারী প্রোটিনের উৎপাদন কমায়;
• রক্তে সক্রিয় টেস্টোস্টেরনের পরিমাণ বাড়ায়;
• ফলিকলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ডিম্বস্ফোটন ব্যাহত করে;
• পেটের চারদিকে চর্বি জমা এবং ওজন বৃদ্ধির প্রবণতা বাড়ায়।
এভাবে ইনসুলিন প্রতিরোধীতা, অতিরিক্ত পুরুষ হরমোন এবং ওজন বৃদ্ধি একটি ক্ষতিকর চক্র তৈরি করে।
প্রধান উপসর্গ
একেকজন নারীর উপসর্গ একেক রকম হতে পারে এবং বয়সের সঙ্গে এগুলো পরিবর্তিতও হতে পারে।
মাসিক ও প্রজননসংক্রান্ত উপসর্গ
• মাসিক অনিয়মিত হওয়া;
• মাসিকের মধ্যবর্তী ব্যবধান ৩৫ দিনের বেশি হওয়া;
• বছরে আটটির কম মাসিক হওয়া;
• কয়েক মাস মাসিক বন্ধ থাকা;
• কখনো অতিরিক্ত বা দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষরণ;
• নিয়মিত ডিম্বস্ফোটন না হওয়া;
• গর্ভধারণে বিলম্ব বা বন্ধ্যত্ব।
অতিরিক্ত পুরুষ হরমোনের লক্ষণ
• মুখ, বুক, পেট বা পিঠে অবাঞ্ছিত মোটা লোম
• ব্রণ এবং তৈলাক্ত ত্বক
• মাথার চুল পাতলা হয়ে যাওয়া বা পুরুষের মতো চুল পড়া
• কিছু ক্ষেত্রে ঘাড় বা বগলের ত্বক মোটা ও কালচে হয়ে যাওয়া।
বিপাকীয় ও মানসিক উপসর্গ
• সহজে ওজন বৃদ্ধি, বিশেষত পেটের চারদিকে
• ওজন কমাতে অসুবিধা
• অতিরিক্ত ক্ষুধা বা মিষ্টিজাতীয় খাবারের আকাঙ্ক্ষা
• অবসাদ, উদ্বেগ, নেতিবাচক দেহভাবনা বা খাদ্যাভ্যাসের ব্যাধি
• নাক ডাকা, দিনের বেলা ঘুম ঘুম ভাব বা নিদ্রাকালীন শ্বাসরোধের লক্ষণ।
রোগ নির্ণয়
প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে অন্য সম্ভাব্য রোগ বাদ দেওয়ার পর নিচের তিনটির মধ্যে অন্তত দুটি থাকলে সাধারণত পিএমওএস নির্ণয় করা হয়:
১. অনিয়মিত বা অনুপস্থিত ডিম্বস্ফোটন;
২. শারীরিক লক্ষণ বা রক্ত পরীক্ষায় পুরুষ হরমোনের আধিক্য;
৩. আলট্রাসনোগ্রাফিতে পলিসিস্টিক ডিম্বাশয়ের গঠন অথবা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অ্যান্টি-মুলারিয়ান হরমোনের মাত্রা বেশি থাকা।
অনিয়মিত মাসিক ও অতিরিক্ত পুরুষ হরমোনের উপস্থিতি নিশ্চিত হলে রোগ নির্ণয়ের জন্য সব সময় আলট্রাসনোগ্রাফির প্রয়োজন হয় না। কিশোরীদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তনের সঙ্গে লক্ষণগুলো মিলে যেতে পারে; তাই তাঁদের রোগ নির্ণয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
স্থূলতার ভূমিকা
স্থূলতা পিএমওএসের একমাত্র কারণ নয়। স্বাভাবিক ওজনের নারীরও পিএমওএস হতে পারে। তবে অতিরিক্ত ওজন, বিশেষত পেটের চারদিকে জমা চর্বি, ইনসুলিন প্রতিরোধিতা ও প্রদাহ বাড়িয়ে রোগটির উপসর্গকে তীব্র করতে পারে।
স্থূলতার ফলে–
• মাসিক ও ডিম্বস্ফোটন আরও অনিয়মিত হতে পারে;
• পুরুষ হরমোনের মাত্রা ও অবাঞ্ছিত লোম বাড়তে পারে;
• গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমতে পারে;
• গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে;
• বন্ধ্যত্বের ওষুধের প্রতি সাড়া কমে যেতে পারে;
• ডিম্বস্ফোটন উদ্দীপক চিকিৎসায় জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
মাত্র ৫-১০ শতাংশ ওজন কমলেও অনেক নারীর মাসিক, ডিম্বস্ফোটন, ইনসুলিনের কার্যকারিতা ও গর্ভধারণের সম্ভাবনার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হতে পারে। তবে ওজন না কমলেও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের স্বতন্ত্র উপকারিতা রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি
পিএমওএস শুধু প্রজনন বয়সের রোগ নয়; এটি জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলো হলো–
• ইনসুলিন প্রতিরোধিতা ও প্রাক্-ডায়াবেটিস
• ডায়াবেটিস
• উচ্চ রক্তচাপ
• রক্তে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের অস্বাভাবিকতা
• বিপাকীয় সমষ্টিগত ব্যাধি
• হৃদরোগ ও রক্তনালির রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি
• যকৃতে চর্বি জমা ও বিপাকীয় প্রদাহ
• নিদ্রাকালীন শ্বাসরোধ
• জরায়ুর অন্তঃস্তরের অতিবৃদ্ধি
• জরায়ুর অন্তঃস্তরের ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি
• উদ্বেগ, বিষণ্নতা, খাদ্যাভ্যাসের ব্যাধি ও হীনম্মন্যতায় ভোগা
• গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া এবং সময়ের আগে সন্তান জন্মের ঝুঁকি বৃদ্ধি।
তবে মনে রাখতে হবে, ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়া মানেই প্রত্যেক নারীর এসব রোগ হবেই–এমন নয়। সময়মতো শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অধিকাংশ ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়।
চিকিৎসা
পিএমওএসের চিকিৎসা রোগীর বয়স, উপসর্গ, ওজন, বিপাকীয় অবস্থা এবং বর্তমানে সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা আছে কিনা–এসবের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। একই চিকিৎসা সবার জন্য উপযুক্ত নয়।
১. জীবনযাত্রার পরিবর্তন
জীবনযাত্রার উন্নয়ন পিএমওএস চিকিৎসার মূল ভিত্তি।
খাদ্যাভ্যাস:
• শাকসবজি, ফল, ডাল, বাদাম, মাছ ও পরিমিত পূর্ণশস্য গ্রহণ
• সাদা ভাত, পরিশোধিত ময়দা ও অতিরিক্ত চিনি সীমিত করা
• মিষ্টি পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত ভাজাপোড়া কমানো
• পর্যাপ্ত আমিষ ও আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ
• খাবারের পরিমাণ ও সময় নিয়মিত রাখা।
পিএমওএসের জন্য কোনো একটি বিশেষ খাদ্যতালিকা অন্য সব খাদ্যতালিকার চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হয়নি। দীর্ঘদিন অনুসরণ করা সম্ভব–এমন স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসই সবচেয়ে কার্যকর।
শারীরিক পরিশ্রম:
• সপ্তাহে অন্তত ১৫০-৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চা, অথবা
• ৭৫-১৫০ মিনিট জোরালো শরীরচর্চা
• সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম
• দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার সময় কমানো এবং দৈনিক হাঁটা বাড়ানো।
খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম ওজন কমানোর সহায়ক। ৫-৭% ওজন কমলেই নিয়মিত মাসিক হওয়া এবং ডিম্বস্ফোটন সম্ভব। এ ছাড়া ব্যায়াম ইনসুলিন প্রতিরোধিতা কমিয়ে অন্য উপসর্গগুলো কমাতে সহায়তা করে। তাই ওষুধের চেয়েও কার্যকরী হলো খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এবং ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রম।
অন্যান্য ব্যবস্থা:
• পর্যাপ্ত ঘুম
• ধূমপান পরিহার
• মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
• প্রয়োজন হলে পুষ্টিবিদ, মনোবিজ্ঞানী বা আচরণগত চিকিৎসকের সহায়তা।
২. মাসিক ও অতিরিক্ত পুরুষ হরমোনের চিকিৎসা
মুখে খাওয়ার গর্ভনিরোধক বড়ি: বর্তমানে সন্তান নিতে না চাইলে মাসিক নিয়মিত করা, ব্রণ ও অবাঞ্ছিত লোম কমাতে ব্যবহার করা যায়। রোগীর বয়স, ওজন, রক্তচাপ, ধূমপান, মাইগ্রেন ও রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসক বড়ি নির্বাচন করবেন।
প্রোজেস্টেরন জাতীয় ওষুধ: দীর্ঘদিন মাসিক না হলে নির্দিষ্ট সময় অন্তর দেওয়া যেতে পারে। এটি মাসিক ঘটাতে এবং জরায়ুর অন্তঃস্তরকে অতিরিক্ত পুরু হওয়া থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
মেটফরমিন: বিশেষত ইনসুলিন প্রতিরোধিতা, প্রাক্-ডায়াবেটিস এবং ডায়াবেটিস অথবা অতিরিক্ত ওজন থাকলে উপকারী হতে পারে। এটি জীবনযাত্রার পরিবর্তনের বিকল্প নয়। দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে কিছু রোগীর ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি হতে পারে।
পুরুষ হরমোনবিরোধী ওষুধ গর্ভনিরোধক বড়িতে অন্তত ছয় মাসেও পর্যাপ্ত ফল না পেলে নির্ভরযোগ্য গর্ভনিরোধের সঙ্গে নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়। গর্ভাবস্থায় এগুলো ভ্রূণের ক্ষতি করতে পারে।
অবাঞ্ছিত লোমের চিকিৎসা: লেজার, থ্রেডিং, ওয়াক্সিং বা অন্যান্য নিরাপদ প্রসাধনী পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়।
ওজন কমানোর ওষুধ: নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে সাধারণ স্থূলতা-চিকিৎসার নীতিমালা অনুসারে ব্যবহার করা যেতে পারে। এসব ওষুধ গ্রহণকালে কার্যকর গর্ভনিরোধ এবং চিকিৎসকের নিবিড় তত্ত্বাবধান প্রয়োজন।
বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা
পিএমওএসজনিত বন্ধ্যত্বের চিকিৎসার আগে শুধু ডিম্বস্ফোটন নয়, স্বামীর বীর্য পরীক্ষা, নারীর বয়স, ডিম্বাশয়ের সক্ষমতা এবং অন্য কোনো বন্ধ্যত্বের কারণ আছে কিনা সেগুলো মূল্যায়ন করা উচিত।
প্রথম ধাপ
• স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও প্রয়োজন হলে ওজন নিয়ন্ত্রণ
• গর্ভধারণ-পূর্ব ফলিক এসিড
• ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার
• ডায়াবেটিস, রক্তচাপ ও অন্যান্য রোগ নিয়ন্ত্রণ
• ডিম্বস্ফোটনের সময় অনুযায়ী নিয়মিত সহবাস।
প্রথম সারির ওষুধ
অন্য কোনো বন্ধ্যত্বের কারণ না থাকলে পিএমওএসজনিত ডিম্বস্ফোটনহীন বন্ধ্যত্বে লেট্রোজোল বর্তমানে ডিম্বস্ফোটন ঘটানোর প্রথম পছন্দের ওষুধ। এটি ক্লোমিফিনের তুলনায় ডিম্বস্ফোটন, গর্ভধারণ ও জীবিত সন্তান জন্মের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। ওষুধটি অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হবে।
বিকল্প বা পরবর্তী চিকিৎসা
• ক্লোমিফিন সাইট্রেট
• নির্বাচিত ক্ষেত্রে ক্লোমিফিনের সঙ্গে মেটফরমিন
• স্বল্পমাত্রা থেকে ধীরে ধীরে বাড়ানো গোনাডোট্রপিন ইনজেকশন
• কিছু নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কোপির মাধ্যমে ডিম্বাশয়ে ক্ষুদ্র ছিদ্রকরণ
• প্রয়োজনে ধাপে ধাপে আইইউআই এবং আইভিএফ।
সহায়ক প্রজননপ্রযুক্তি
প্রথম ও দ্বিতীয় সারির চিকিৎসা ব্যর্থ হলে অথবা নালির সমস্যা, গুরুতর পুরুষজনিত বন্ধ্যত্ব বা অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ থাকলে শরীরের বাইরে নিষেক বা আইভিএফ বিবেচনা করা যায়। পিএমওএসে ডিম্বাশয়ের অতিরিক্ত উদ্দীপনাজনিত জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকায় উপযুক্ত ওষুধের মাত্রা, বিশেষ ধরনের উদ্দীপন-পদ্ধতি এবং প্রয়োজনে সব ভ্রূণ হিমায়িত রাখার কৌশল ব্যবহার করা হয়। একবারে একটি ভ্রূণ স্থানান্তর বহুগর্ভধারণের ঝুঁকি কমায়।
ইনোসিটলের ব্যবহার কারও কারও জন্য উপকারী হলেও এটি বন্ধ্যত্বের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা নয়; গর্ভধারণ ও জীবিত সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে এর উপকারিতা ও নিরাপত্তার প্রমাণ এখনও অনিশ্চিত।
দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা প্রতিরোধ
পিএমওএসের চিকিৎসা শুধু মাসিক নিয়মিত করা বা গর্ভধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা নয়। দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজন–
• রোগ নির্ণয়ের সময় রক্তচাপ, ওজন ও কোমরের পরিধি মূল্যায়ন
• রোগ নির্ণয়ের সময় রক্তের শর্করা পরীক্ষা এবং ঝুঁকি অনুযায়ী প্রতি এক থেকে তিন বছর অন্তর পুনর্মূল্যায়ন
• রোগ নির্ণয়ের সময় রক্তের চর্বির মাত্রা পরীক্ষা এবং ফল ও ঝুঁকি অনুযায়ী পুনরায় পরীক্ষা
• অন্তত বছরে একবার রক্তচাপ পরীক্ষা
• নিয়মিত মাসিক নিশ্চিত করা অথবা চিকিৎসকের পরামর্শে নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রোজেস্টেরন গ্রহণ
• অস্বাভাবিক, দীর্ঘস্থায়ী বা অতিরিক্ত জরায়ু-রক্তক্ষরণ হলে দ্রুত পরীক্ষা;
• বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও খাদ্যাভ্যাসের ব্যাধির লক্ষণ খোঁজা
• নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে দম বন্ধ হওয়া বা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম পেলে নিদ্রাকালীন শ্বাসরোধের মূল্যায়ন
• গর্ভধারণের পরিকল্পনার আগে ওজন, রক্তচাপ, রক্তের শর্করা এবং ফলিক এসিড গ্রহণের বিষয়টি ঠিক করা
• নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা ও পর্যাপ্ত ঘুম বজায় রাখা।
উপসর্গ না থাকলে শুধু পিএমওএসের কারণে নিয়মিত জরায়ুর অন্তঃস্তরের ক্যান্সার পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই। তবে একটানা দীর্ঘদিন মাসিক বন্ধ থাকা, অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ, ডায়াবেটিস বা দীর্ঘস্থায়ী অতিরিক্ত ওজন থাকলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন জরুরি।
পিএমওএস কেবল ডিম্বাশয়ে ছোট ছোট ফলিকল, অনিয়মিত মাসিক বা বন্ধ্যত্বের সমস্যা নয়–এটি প্রজনন, হরমোন, বিপাক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা। তবে এটি নিয়ে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, উপসর্গভিত্তিক ওষুধ, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বন্ধ্যত্বের চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ নারী সুস্থ, স্বাভাবিক ও পরিপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারেন এবং সফলভাবে মাতৃত্ব অর্জন করতে পারেন।
মূল বার্তা হলো–পিএমওএস নিরাময়যোগ্য না হলেও অত্যন্ত কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। সঠিক জ্ঞান, নিয়মিত পরিচর্যা এবং ভুক্তভোগী ও চিকিৎসকের যৌথ সিদ্ধান্তই এর সফল ব্যবস্থাপনার চাবিকাঠি।
[ফার্টিলিটি স্পেশালিষ্ট | চীফ কন্সালট্যান্ট, ইনফার্টিলিটি কেয়ার এন্ড রিসার্চ সেন্টার]