ই-কমার্স প্রতারণা
পেমেন্ট গেটওয়েতে এখনও আটকা ১২৭ কোটি টাকা
.
ওবায়দুল্লাহ রনি
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৫ | ০০:০৫
অর্ডার নিয়ে পণ্য সরবরাহ না করা ২৫ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫৪৮ কোটি টাকা আটকে দেওয়া হয় ২০২১ সালে। পেমেন্ট গেটওয়ে থেকে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তরের আগেই গ্রাহকের এ অর্থ আটকে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে চার বছর ধরে ৪২১ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছে সরকার। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে আবেদন না পাওয়ায় ৭টি পেমেন্ট গেটওয়ের কাছে পড়ে আছে ১২৭ কোটি টাকা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো গত ডিসেম্বরভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী এ তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে প্রতারিত অর্থের সামান্যই আটকাতে পেরেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কেননা, ওই সময় নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় গ্রাহকের হাতে পণ্য পৌঁছানো হোক বা না হোক, পেমেন্ট গেটওয়ে দু’একদিনের মধ্যে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের হিসাবে অর্থ স্থানান্তর করত। এর বেশির ভাগ অর্থ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান তুলে নিয়ে যায়। পণ্যের অর্ডার ও টাকা নিয়ে পণ্য না দেওয়ার বিষয়টি প্রকট আকার ধারণ করলে নড়েচড়ে বসে সরকার।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের আলোকে ২০২১ সালের ৩০ জুন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ই-কমার্সের পরিশোধ নিষ্পত্তি বিষয়ে একটি নির্দেশনা জারি করে। সেখানে বলা হয়, ই-কমার্সের পণ্য হাতে পাওয়ার আগে টাকা ছাড় করতে পারবে না পরিশোধ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। নির্দিষ্ট সময়ে গ্রাহক পণ্য না পেলে পেমেন্ট গেটওয়ে গ্রাহককে টাকা ফেরত দেবে। ওই সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত সমস্যা নিষ্পত্তির জন্য একটি ‘কেন্দ্রীয় ডিজিটাল কমার্স সেল’ গঠন করা হয়। এই সেল অর্থ ছাড়সহ বিভিন্ন হিসাব করে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাতটি পেমেন্ট গেটওয়ে ২৫টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ৫৪৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা আটকাতে পারে। সারাদেশের ৫৫ হাজার ২১১ জন ব্যক্তির অর্ডারের বিপরীতে এ অর্থ পায় পেমেন্ট গেটওয়েগুলো। আটকানো অর্থের মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সেলের মাধ্যমে গত চার বছরে গ্রাহকরা ৪০৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা রিফান্ড পেয়েছেন। গেটওয়েগুলো চার্জ বাবদ ৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা কেটে নিয়েছে। আর পেমেন্ট গেটওয়ে প্রতিষ্ঠান ফোস্টার করপোরেশন থেকে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান কিউকম ডটকমের গ্রাহকরা ৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা চার্জ ফেরত পেয়েছে। অপর পেমেন্ট গেটওয়ে আমারপে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ডিলের গ্রাহকদের ২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা চার্জ ফেরত দিয়েছে। এসবের বাইরে পেমেন্ট গেটওয়েতে এখনও আটকে আছে ১২৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এসব অর্থ ফেরত দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, গ্রাহক অর্ডার করেও পণ্য পাননি–এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তালিকা রয়েছে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। তাদের তালিকার ভিত্তিতে পেমেন্ট গেটওয়েতে আটকে থাকা অর্থ ‘রিফান্ড’ করা হয়েছে। বাকি অর্থের বিপরীতে তালিকা না পাওয়ায় এসব অর্থ ফেরত দিতে পারছে না মন্ত্রণালয়। মূলত প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে মালিকরা পলাতক থাকা, ডেটাবেস নষ্ট করে ফেলা কিংবা মালিক জেলে আটকসহ বিভিন্ন কারণে তালিকা পাওয়া যাচ্ছে না। যে কারণে গত অক্টোবরে নতুন করে আবার গ্রাহকদের থেকে অভিযোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হলো– অনেক গ্রাহক পণ্য পেয়েও হয়তো বলছেন পাননি। কিংবা কেউ হয়তো ১০টি পণ্যের অর্ডার করে ৮টি পেয়েছেন–এখন বলছেন পায়নি। আগে এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা ছিল না। যে কারণে নিষ্পত্তি করা খুব জটিল।
কোন প্রতিষ্ঠানে কত টাকা আটকে আছে
ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৯৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা আটকে ছিল কিউকমের। প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকরা মোট ৩৪২ কোটি ২ লাখ টাকা ফেরত পাওয়ার পর এখনও আটকে আছে ৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এই অর্থের সবই ফোস্টার করপোরেশনের কাছে। ই-অরেঞ্জের ৩৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা আটকানো হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির মালিকরা কোনো তালিকা না দেওয়ায় এই প্রতিষ্ঠানের এক টাকাও ছাড় হয়নি। প্রতারণার জন্য ওই সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ইভ্যালির ২৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা আটকে ছিল পেমেন্ট গেটওয়েতে। এর মধ্যে ৮ কোটি টাকা পরিশোধ হয়েছে। বাকি ১৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা আটকে আছে। পর্যায়ক্রমে দালাল প্লাসের ৩৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকার মধ্যে পরিশোধ করা যায়নি ১৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। আলেশা মার্টের ৪২ কোটি ৭৩ লাখ টাকার মধ্যে পরিশোধ হয়নি ২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। আলিফ ওয়ার্ল্ডের ২ কোটি ৫৩ লাখ টাকার মধ্যে ২ কোটি ২১ লাখ টাকা পরিশোধ করা যায়নি। অন্য ১৯টি প্রতিষ্ঠানের ১৩ কোটি ১৩ লাখ টাকার মধ্যে ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা পরিশোধ করা যায়নি।
ভোক্তা অধিদপ্তরে যত অভিযোগ
আটকে থাকা অর্থ পরিশোধের জন্য গত বছরের ২৮ অক্টোবর ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক ও বিক্রেতাদের থেকে অভিযোগ চেয়ে একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অনলাইন পোর্টালে অভিযোগ করতে বলা হয়। ভোক্তা অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গণবিজ্ঞপ্তির পর সংস্থাটির কাছে নতুন করে মোট ৫৬ হাজার অভিযোগ জমা হয়েছে। এর মধ্যে ২৯ অক্টোবর থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত জমা হয়েছে ৪০ হাজার অভিযোগ। নির্ধারিত সময়ের পর আরও ১৬ হাজার অভিযোগ এসেছে। আগে থেকে নিষ্পত্তি না হওয়া অভিযোগ ছিল ২২ হাজার। সব মিলিয়ে এখন ভোক্তাদের শুধু ই-কমার্সসংক্রান্ত অনিষ্পন্ন অভিযোগ রয়েছে ৭৮ হাজার। এসব অভিযোগের বিপরীতে গ্রাহকের কী পরিমাণ পাওনা দাবি রয়েছে, তা তাদের জানা নেই।
- বিষয় :
- ই-কমার্স
