সুদ-আসল পরিশোধ বেড়েছে ২১ শতাংশ
.
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৫ | ২৩:২৯
অনেক প্রকল্পের ঋণের কিস্তি শুরু হয়েছে। অন্যদিকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের উন্নীত হওয়ায় বাংলাদেশকে দেওয়া ঋণের সুদের হার বাড়িয়েছে উন্নয়ন সহযোগীরা। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের শর্ত পরিপালনের অংশ হিসেবে বিনিময় হারে নমনীয় করা হয়। এতে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কিছুটা কমে আসে। এসব কারণে বিদেশি ঋণের সুদ-আসল পরিশোধে অর্থনীতিতে চাপ ক্রমেই বাড়ছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০৯ কোটি ডলার, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঋণের আসল পরিশোধ বেড়েছে ২৮ শতাংশের বেশি। সুদ পরিশোধ বেড়েছে ১১ শতাংশের মতো। এতে ব্যয় যেমন বেড়েছে আবার নতুন অর্থপ্রবাহ কমে গেছে। প্রতিবেদন বলছে, গত অর্থবছর উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ-অনুদান বাবদ অর্থছাড় কমেছে আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৭ শতাংশের মতো। শুধু ঋণের ক্ষেত্রে প্রায় ১৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরের তুলনায় গত অর্থবছর ঋণ-অনুদানের প্রতিশ্রুতি কমেছে সাড়ে ২২ শতাংশ। ঋণের প্রতিশ্রুতি কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।
ইআরডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদায়ী বিদেশি ঋণের আসল পরিশোধ হয়েছে ২৬০ কোটি ডলারের মতো, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২০২ কোটি ডলার। অন্যদিকে, গত অর্থবছর সুদ পরিশোধে ১৪৯ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে, যা আগের অর্থবছর ছিল ১৩৫ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে বিদেশি ঋণের সুদ-আসল পরিশোধে ব্যয় বেড়েছে ২১ শতাংশ।
প্রসঙ্গত, এসব ঋণদায় বর্তমান সরকারের নয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আগ্রাসী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় পরিণাম চিন্তা না করেই বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়। রাজনৈতিক প্রকল্প ও ঠিকাদারকে সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজনে নেওয়া হয় অনেক প্রকল্প। এ কারণে অন্তর্বর্তী সরকার চলমান সব প্রকল্প পর্যালোচনা করছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কতটা প্রয়োজনীয়, তা পর্যালোচনা করছে বর্তমান সরকার। এ প্রক্রিয়ায় অনেক প্রকল্প বাদ পড়েছে। স্থগিত রাখা হয়েছে কিছু প্রকল্প। আবার কিছু প্রকল্পের বরাদ্দ কমানো হয়েছে।
অন্যদিকে গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে সরকার পরিবর্তন এবং এ নিয়ে আগে-পরের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির ধাক্কা লেগেছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন চিত্রে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত অর্থবছরে বাস্তবায়নের হার ৬৮ শতাংশ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) রেকর্ডে ২০০৪-০৫ অর্থবছর থেকে সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের রেকর্ড রয়েছে। এতে কোনো অর্থবছরে ৬৮ শতাংশের কম বাস্তবায়ন হতে দেখা যায়নি। এছাড়া আইএমইডি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪ থেকে মোট ৪৮ বছরের এডিপি বাস্তবায়নের তথ্য পাওয়া যায়। তাতে দেখা যায়, কোনো অর্থবছরই গত অর্থবছরের মতো কম বাস্তবায়ন হয়নি। অতিমারি করোনাকাল লম্বা সময় লকডাউনে থাকার বছরও এর চেয়ে বেশি হারে এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছে। করোনাকালে ২০২০-২১ অর্থবছরে বাস্তবায়ন হয়েছে ৮২ দশমিক ১১ শতাংশ।
এদিকে ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বাড়লেও গত অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় ও প্রতিশ্রুতি– দুটোই কমেছে। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ৮৩২ কোটি ডলারের ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যা ছিল ১ হাজার ৭৩ কোটি ডলার। সবচেয়ে বেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে। বাজেট সহায়তা হিসেবে ১০০ কোটি ডলারসহ মোট প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ২৮৪ কোটি ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রতিশ্রুতি এসেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে, মোট ২০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ১৫০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা। এছাড়া জাপানের কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে পাওয়া গেছে ৫৭ কোটি ডলারের মতো। গত অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড়ের পরিমাণ কমে ৮৫৭ কোটি ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের বছরে ছিল ১ হাজার ২৮ কোটি ডলার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইআরডির একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, অনেক প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়েছে। কিছু প্রকল্প পর্যালোচনায় ব্যয় কমানো হয়েছে। আবার কিছু প্রকল্প পরিচালক পালিয়ে গেছেন। এসব কারণে বেশির ভাগ প্রকল্পের নির্মাণকাজ অত্যন্ত ধীর। এ কারণে অর্থছাড়ও কমেছে। তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বিদেশি ঋণের প্রবাহ বাড়বে। ছাড়, প্রতিশ্রুতি সবই বাড়বে।
- বিষয় :
- সুদ
