বিল-বন্ডে দুই বছরে ব্যক্তি বিনিয়োগ বেড়ে পাঁচ গুণ
.
ওবায়দুল্লাহ রনি
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৫ | ০০:০০ | আপডেট: ০৬ আগস্ট ২০২৫ | ১০:২০
বেশি সুদ ও ফেরতের নিশ্চয়তার কারণে ট্রেজারি বিল-বন্ডে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে। বছর দুয়েক আগেও ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে বিল-বন্ডে বিনিয়োগকারী পাওয়া যেত না। গত জুন শেষে সরকারি এ উপাদানে ব্যক্তি, করপোরেট বডি, প্রভিডেন্ট, পেনশন ফান্ডের বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৪ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের জুন শেষে যা ছিল মাত্র ২৩ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। গত দুই বছরে বেড়ে প্রায় পাঁচ গুণ হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যাংকের প্রতি আস্থাহীনতা, সঞ্চয়পত্র নিয়ে নানা বিভ্রান্তি এবং শেয়ারবাজারে নিম্নমুখী প্রবণতার কারণে ট্রেজারি বিল ও বন্ড এখন বিনিয়োগের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। গত বছরের জুন পর্যন্ত মোট বিনিয়োগের প্রায় ৯২ শতাংশ ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং আমানত বীমা তহবিলের। তবে চলতি বছরের জুন শেষে তা কমে ৮৩ দশমিক ৫৪ শতাংশে নেমেছে। আর ব্যক্তি, করপোরেট বডি, প্রভিডেন্ট, পেনশন বা গ্র্যাচুয়িটি তহবিলের বিনিয়োগ বেড়ে ১৬ দশমিক ৪৬ শতাংশে উঠেছে। আগে এ ধরনের তহবিলের বেশির ভাগই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হতো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধি তো দূরে থাক, উল্টো কমে যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগ ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা কমে তিন লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকায় নেমেছে। আগের অর্থবছর কমেছিল ২১ হাজার ১২৪ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত ট্রেজারি বিল, বন্ডে মোট বিনিয়োগ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৪৫ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে বিনিয়োগ রয়েছে এক লাখ ৬ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। গত বছর শেষে যা ছিল ৩৮ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের জুন শেষে ছিল ২২ হাজার ১২ কোটি টাকা। আর ব্যক্তি বিনিয়োগ বেড়ে জুন শেষে ৭ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা হয়েছে। মোট বিনিয়োগের যা ১ দশমিক ২৩ শতাংশ। দু্ই বছর আগে মোট বিনিয়োগের মাত্র শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ বা ১ হাজার ১০২ কোটি টাকা ছিল ব্যক্তির। গত বছরের জুন শেষে যা তিন হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা বা মোট বিনিয়োগের শূন্য দশমিক ৭৩ শতাংশ হয়।
ব্যাংকাররা জানান, ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক এই বিনিয়োগের বড় অংশই দেখা যাবে ব্যাংক বা সঞ্চয়পত্র থেকে ভাঙিয়ে এখানে বিনিয়োগ হচ্ছে। কেননা বিশ্বের যে কোনো উপাদানের মধ্যে সর্বোচ্চ নিরাপদ বিবেচনা করা হয় বিল-বন্ডকে। কিছু ব্যাংক আমানত ফেরত দিতে না পারায় একদিকে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। আবার ব্যাংকের চেয়ে এখন বেশি সুদ মিলছে এখানে। ব্যাংকগুলো মেয়াদি আমানতে ৮ থেকে ১০ শতাংশ সুদ দিলেও বিল-বন্ডে গত জুন পর্যন্ত ১১ থেকে ১৩ শতাংশ সুদ পাওয়া গেছে। আবার ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদে কোনো কর কাটা হয় না। এখানে কোনো বিনিয়োগ সীমা নেই। যত মেয়াদি বিলই কেনা হোক সেকেন্ডারি বাজারে ভাঙানো যায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমান সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রধান অগ্রাধিকার দিয়ে ঋণকে আরও ব্যয়বহুল করার মাধ্যমে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। মূল্যস্ফীতি কমে গত জুনে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমেছে। এরপরও চলতি মুদ্রানীতিতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান নীতি সুদহার (রেপো) ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বাজারে তারল্য কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি সরকারকে ঋণ দিচ্ছে না। উল্টো বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগের দেনা পরিশোধ করছে। গত অর্থবছর বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকার এক লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে শোধ করেছে ৬৩ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা। এর ফলে নিট ঋণ বেড়েছে মাত্র ৭২ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, সরকার এখন উন্নয়ন প্রকল্পে তেমন নজর না দেওয়ায় এমনিতেই ঋণ চাহিদা কম। এর মধ্যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ-গ্যাস সঙ্কটসহ বিভিন্ন কারণে বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগ চাহিদা কম রয়েছে। ব্যাংকগুলো ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ না করে সবাই ট্রেজারি বিল, বন্ডে খাটানোর প্রতিযোগিতা করছে।
এর মধ্যে সম্প্রতি ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা ৫০ কোটি উদ্বৃত্ত ডলার কিনে ৬ হাজার কোটি টাকার বাজারে ছেড়েছে। সব মিলিয়ে ট্রেজারি বিল, বন্ডে সুদহার কমেছে। সর্বশেষ গত ২৭ জুলাই এক বছর মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার নেমেছে ১০ দশমিক ৬৩ শতাংশে। আর গত ২৯ জুলাই ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের গড় সুদহার নেমেছে ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশে।
- বিষয় :
- বন্ড
