রন হক সিকদারকে ২২২ কোটি টাকা ফেরত দিতে হবে
এমডি রন হক সিকদার
ওবায়দুল্লাহ রনি
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৫ | ১৩:৩১ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৫ | ১৩:৪৩
সিকদার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত জয়নুল হক সিকদারের বড় ছেলে রন হক সিকদারের মালিকানাধীন জেড এইচ সিকদার শপিং কমপ্লেক্স নামে সাততলা ভবন নির্মাণে এক দশক আগে ঋণ দেয় জনতা ব্যাংক।
ব্যাংকের অভিযোগ, ভবন না করে তিনি সেই টাকা অন্যত্র সরিয়ে ফেলেন। এখন পর্যন্ত এক টাকাও পরিশোধ করেননি। এই ঋণের বিপরীতে জনতা ব্যাংকের পাওনা ২২২ কোটি টাকা। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে পুরো দায় সমন্বয়ের নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকার অর্থঋণ আদালত-৫-এর বিচারক মুজাহিদুর রহমান। গতকাল রোববার এ আদেশ দেন তিনি। জনতা ব্যাংকে অবশ্য রন হক সিকদারের মোট ঋণ প্রায় এক হাজার ১৬৬ কোটি টাকা।
জনতা ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ব্যাংকটি ২০১৫ সালে জেড এইচ সিকদার শপিং কমপ্লেক্সের জন্য আর অ্যান্ড আর হোল্ডিংসের অনুকূলে ১০০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করে। জনতা ভবন করপোরেট শাখা থেকে এ ঋণ দেওয়া হয়। এর বাইরে রন হক সিকদারের মালিকানাধীন পাওয়ারপ্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেডের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা রয়েছে প্রায় ৯৪৩ কোটি টাকা। চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্পত্তি বিক্রির নিলাম ডাকে জনতা ব্যাংক। বিদ্যুৎকেন্দ্রের তপশিলভুক্ত জমি, অবকাঠামো ও মজুত মালপত্র বিক্রির নিলাম ডাকা হয়। তবে তাতে সাড়া পায়নি ব্যাংক।
এসব বিষয়ে বক্তব্যের জন্য জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবর রহমানকে কয়েক দফা ফোন করেও পাওয়া যায়নি। রন হক সিকদারের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে ফোন করে তা বন্ধ পাওয়া গেছে।
গত মার্চ থেকে শপিং কমপ্লেক্সের ঋণ ইস্যুতে জনতা ব্যাংকের মামলায় তিনি হাজিরা দেননি। তাঁর পক্ষে মামলাটিতে কোনো আইনজীবীও দেওয়া হয়নি।
গতকালের আদেশে বলা হয়, এর আগে অর্থঋণ আদালত থেকে ঋণ পরিশোধে ১৫ দিনের নোটিশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া পত্রিকায় ১৫ দিনের সময় দিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তবে গতকাল পর্যন্ত বিবাদী পক্ষ লিখিত জবাব কিংবা মামলার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি। যে কারণে একতরফা শুনানি করে আদেশ দেওয়া হলো। ব্যাংকের আবেদন পর্যালোচনা, বিভিন্ন ডকুমেন্ট যাচাই, হলফনামাসহ সব রেকর্ড পর্যালোচনা করে একতরফা আদেশের এখতিয়ার আদালতের রয়েছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়।
আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, মামলা দায়ের তারিখ থেকে ডিক্রিকৃত টাকা আদায় না হওয়া পর্যন্ত ১২ শতাংশ সুদসহ দায় পরিশোধ করতে হবে। এ সময়ে অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যাংক ডিক্রিকৃত টাকা আদায়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে পারবে। চলতি বছরের ৪ মার্চের ঋণস্থিতি ধরে এ মামলা হয়েছে। ওই দিন আর অ্যান্ড আর হোল্ডিংসের অনুকূলে বিতরণ করা ঋণস্থিতি ছিল ২২১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
জনতা ব্যাংক ঋণ আদায় বিভাগের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, চলতি বছরের মার্চে অর্থঋণ আদালতে মামলা করা হয়। সেই মামলায় আগামী ৬০ দিনের মধ্যে পুরো ঋণ সমন্বয়ের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া আদালতের নির্দেশে সম্পত্তি এলাকায় নোটিশ টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে হয়তো ঋণ আদায় হবে না। তবে অন্তত ব্যাংক সম্পত্তির মালিকানা নিতে পারবে। সম্ভব হলে জমি বিক্রি করে ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা নেবে।
শর্ত না মেনেই ঋণছাড়
ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেড এইচ সিকদার শপিং কমপ্লেক্সের জন্য আর অ্যান্ড আর হোল্ডিংসের অনুকূলে ২০১৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঋণ অনুমোদন করে জনতা ব্যাংক। সাততলা ভবন নির্মাণের জন্য শর্তসাপেক্ষে ১০০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করা হয়। ঋণ বিতরণের শর্তে বলা হয়, গ্রাহকের নিজের টাকায় ‘গ্রেড বিম’ পর্যন্ত নির্মাণ করতে হবে। এরপর ঋণের অর্ধেক অর্থাৎ ৫০ কোটি টাকা বিতরণ করা যাবে। প্রথম ধাপের ঋণে সন্তোষজনক হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে দ্বিতীয় ধাপে ৫০ কোটি টাকা বিতরণ করা যাবে। প্রতিটি কিস্তি বিতরণের আগে ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতের বিষয়ে প্রকৌশলী থেকে প্রতিবেদন নিতে হবে। আর শেষ কিস্তির টাকায় ভবনের নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে। অথচ কাজের অগ্রগতি যাচাই না করেই শর্ত ভেঙে ২০১৬ সালের মার্চের মধ্যে পুরো ১০০ কােটি টাকা ছাড় করে ব্যাংক।
ঋণের শর্তে আরও বলা হয়, নির্মাণে অতিরিক্ত ব্যয় হলে গ্রাহককে বহন করতে হবে। প্রথম কিস্তি বিতরণের ২৪ মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে। আর প্রথম কিস্তি বিতরণের ১৫ মাস পর প্রথম কিস্তি আদায়যোগ্য হবে। ত্রৈমাসিক কিস্তিতে ঋণ আদায় হবে। পুরো অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত অ্যাপার্টমেন্ট ও ফ্লোর স্পেস বুকিং এবং পজিশন বিক্রির সম্পূর্ণ অর্থ ব্যাংকে জমা করতে হবে। দুটি কিস্তি দিতে ব্যর্থ হলে পুরো ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা করবে ব্যাংক। তবে এসব শর্ত লঙ্ঘন করে কাজের অগ্রগতি যাচাই ছাড়াই ঋণ দেয় ব্যাংক।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সিকদার পরিবার প্রভাবশালী ছিল। বেসরকারি খাতের প্রথম প্রজন্মের ন্যাশনাল ব্যাংক ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে নানা জালিয়াতির মাধ্যমে নামে-বেনামে বিপুল অঙ্কের অর্থ বের করে তা পাচারের তথ্য উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন পরিদর্শনে। একসময়ের সেরা ন্যাশনাল ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীর অর্থ ঠিকমতো ফেরত দিতে পারছে না। টানা তিন বছর ধরে নিট লোকসানে রয়েছে ব্যাংকটি।
