ব্যাংক খাত
দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ সাড়ে ৭ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৫ | ১২:১৫
ব্যাংকের আদায় অনিশ্চিত হিসেবে বিবেচিত দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ আরও বেড়ে ২০২৪ সাল শেষে সাড়ে ৭ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংক খাতের মোট ঋণের যা ৪৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। এক বছর আগে এ ধরনের ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। এক বছরে বেড়েছে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা বা ৫২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত বার্ষিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন–২০২৪-এ এমন তথ্য উঠে এসেছে।
দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বা ‘ডিসট্রেসড অ্যাসেট’ বলতে ব্যাংকের দেখানো খেলাপি ঋণ, পুনঃতপশিল করা অনাদায়ী ঋণ এবং অবলোপনের পর আদায় না হওয়া ঋণের যোগফল বোঝানো হয়। আইএমএফের শর্ত মেনে ২০২১ সাল থেকে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের তথ্য প্রকাশ করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতি বছরই এ ধরনের ঋণ বাড়ছে। মূলত এসব ঋণ অনাদায়ী। এর একটি অংশ ব্যাংকের খাতায় থাকা খেলাপি ঋণ। আরেকটি অংশ পুনঃতপশিলের মাধ্যমে নিয়মিত দেখানো এবং অবলোপনের মাধ্যমে ব্যালান্সশিট বা আর্থিক হিসাব বিবরণী থেকে আলাদাভাবে দেখানো ঋণ। এ ধরনের ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুব কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণস্থিতি ১৭ লাখ ১১ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে পুনঃতপশিল করা অনাদায়ী ঋণ রয়েছে তিন লাখ ৪৮ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। এক বছর আগে যা ছিল ২ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। নিয়মিত খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়েছে তিন লাখ ৪৬ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। এক বছর আগে যা ছিল এক লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। এছাড়া অবলোপন করে অনাদায়ী ঋণস্থিতি ৬২ হাজার ৩২৭ কোটি টাকায় ঠেকেছে। এক বছর আগে যা ছিল ৫৩ হাজার ৬১২ কোটি টাকা। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিগত সরকারের সময়ে ঋণ আদায়ে কঠোরতার চেয়ে বরং বিভিন্ন কৌশলে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর সুযোগ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগ থেকে একের পর এক সুবিধা দেওয়া শুরু হয়। কখনও নামমাত্র ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতপশিল এবং কখনও দুই শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় ১২ বছরের জন্য ঋণ নবায়ন কিংবা পুনর্গঠন করা হয়। এতে করে খেলাপিরা সুযোগ পান। আবার করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরুর পর ২০২০ সালে এক টাকা না দিলেও কাউকে খেলাপি করা হয়নি। যে পরিমাণ ঋণ পরিশোধের কথা, কেউ তার ১৫ শতাংশ দিলে খেলাপিমুক্ত রাখার সুযোগ দেওয়া হয় ২০২১ সালে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে ৫০ শতাংশ কিস্তি দিলেই নিয়মিত রাখা হয়েছে। এমন বিভিন্ন শিথিলতার কারণে ঋণ পরিশোধ না করার নতুন একটি গোষ্ঠী তৈরি হয়।
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর খেলাপি ঋণের সংজ্ঞায় পরিবর্তন হয়েছে।
এখন কোনো ঋণ অনাদায়ী থাকলেই তা শ্রেণীকৃত দেখানো হচ্ছে। ২০১৯ সাল থেকে মেয়াদি ঋণ অনাদায়ী থাকার ৬ মাস পর থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ
বিবেচনা করা হতো। নিয়ম মেনে বিতরণ না করা ঋণ অনেক ক্ষেত্রে এখন গুণগত মানের বিচারে খেলাপি করে দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন নিয়ম অনুযায়ী খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের ওপরে থাকলে কোনো ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পারবে না। গত বছর ডেফারেল সুবিধা তথা প্রভিশন সংরক্ষণে বাড়তি সময় নেওয়া ব্যাংককে লভ্যাংশ দিতে দেওয়া হয়নি।
আব্দুর রউফ তালুকদার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে যোগদানের এক সপ্তাহের মাথায় ২০২২ সালের ১৮ জুলাই ব্যাপক শিথিল করে ঋণ পুনঃতপশিলের নীতিমালা জারি করেন। ওই নীতিমালার পর আগের সব রেকর্ড ভেঙে প্রচুর ঋণ পুনঃতপশিল হয়। এ নীতিমালার আওতায় গত তিন বছর পুনঃতপশিল করা হয় ২ লাখ ৪০ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত সরকারের অনেক নীতিমালায় পরিবর্তন আনলেও পুনঃতপশিলের নিয়ম অপরিবর্তিত রেখেছে। সম্প্রতি বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতপশিলের একটি কমিটি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিল হয়েছে। আগের বছর পুনঃতপশিল করা হয় রেকর্ড ৯১ হাজার ২২১ কোটি টাকা। তার আগের বছর পুনঃতপশিল হয় ৬৩ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। এর আগে ২০২১ সালে যেখানে মাত্র ২৬ হাজার ৮১০ কোটি টাকা পুনঃতপশিল হয়েছিল। ২০২০ সালে পুনঃতপশিলের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৯ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা। অবশ্য ওই ২০২০ ও ২০২১ সালে ঋণ পরিশোধে তেমন চাপ ছিল না। যে কারণে পুনঃতপশিলে তেমন আগ্রহ দেখাননি ঋণগ্রহীতারা।
বর্তমানে আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের জন্য বিভিন্ন শর্ত পরিপালন করতে হচ্ছে। সংস্থাটি ২০২৬ সালের মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে এবং সরকারি ব্যাংকের ১০ শতাংশের নিচে নামানোর শর্ত দিয়েছে। তবে খেলাপি ঋণের আসল চিত্র সামনে আসায় এখন প্রতি প্রান্তিকেই বাড়ছে।
- বিষয় :
- বাংলাদেশ ব্যাংক
- ঋণ
- ব্যাংক খাত
