পেঁয়াজ আমদানিতেও চক্রের দ্বিগুণ মুনাফা
ছবি: সমকাল
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:০৪ | আপডেট: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৯:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
চলছে মুড়িকাটা পেঁয়াজের মৌসুম। কয়েক বছর লোকসানের পর এবার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন চাষিরা। ঠিক এই সময়েই পেঁয়াজের বাজারে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। এ পরিস্থিতির জন্য আমদানিকারক ও পাইকারি পর্যায়ের একটি শক্তিশালী চক্রকে দায়ী করছেন বাজার-সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখনও আগের মৌসুমের প্রায় এক লাখ টন পেঁয়াজ মজুত রয়েছে। সব মিলিয়ে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক থাকার কথা। বাস্তবতা এর উল্টো।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ কেজিপ্রতি সব খরচ মিলিয়ে দেশে আসছে প্রায় ৫০ টাকায়। সেই পেঁয়াজই খুচরা পর্যায়ে দাম হাঁকা হচ্ছে ১১০ থেকে ১৩০ টাকা।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও ঢাকার পাইকারি বাজারে অভিযান চালিয়ে আমদানিমূল্য ও বিক্রয়মূল্যের বড় ফারাকের তথ্য পেয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সংস্থাটির দাবি, অনিয়ম প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও পেঁয়াজের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়েছে। কৃষকের স্বার্থ উপেক্ষা করে অদৃশ্য শক্তির চাপে সরকার আমদানির অনুমতি দিতে বাধ্য হয়েছে। তাঁর মতে, আমদানিকারকরা কত দামে পেঁয়াজ আনছেন ও কত দামে বিক্রি করছেন– এই তথ্য প্রকাশ করলেই বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে।
দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার আমদানির অনুমতির সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সোম ও মঙ্গলবার দিনে ৫৭৫টি করে আমদানি অনুমতি (আইপি) ইস্যু করা হয়। প্রতিটি আইপির বিপরীতে সর্বোচ্চ ৩০ টন পেঁয়াজ আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে ভারত থেকে ১৯ হাজার ৫০০ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর আগে প্রতিদিন মাত্র ৫০টি আইপি ইস্যু করা হলেও বাজারে দাম না কমায় আমদানির পরিমাণ বাড়ানো হয়।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বাস্তবে পেঁয়াজের ঘাটতি নেই। দেশে মোট উৎপাদন প্রায় ৪৪ লাখ টন, যেখানে বার্ষিক চাহিদা ২৮ লাখ টন। তারা বলছেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আগেই ঘোষণা দিয়েছে, পেঁয়াজের দাম ১৫০ টাকা অতিক্রম করলে আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে। এ জন্য সিন্ডিকেট করে একটি চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে। বাস্তবে ঘাটতি নেই। এরই মধ্যে বাজারে নতুন পেঁয়াজ চলে এসেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইং অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) ড. মো. জামাল উদ্দীন বলেন, আমদানির অনুমতি আদায়ের জন্য একটি চক্র ইচ্ছা করে সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে। দেশের বিভিন্ন গুদামে এখনও এক লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ রয়েছে।
ড. জামাল উদ্দীন বলেন, গত বছর প্রায় চার লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে, এর আগের বছর আমদানি হয়েছিল সাড়ে সাত লাখ টন। এবার উৎপাদন ভালো হওয়ায় মাত্র ১২ হাজার ৯০০ টন আমদানি হয়েছে। আমরা সংরক্ষণ সুবিধা যদি বাড়াতে পারি তাহলে দেশের উৎপাদন আরও স্থিতিশীল হবে।
বাজার-সংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানির অনুমতি পেলেও ভোক্তারা এর সুফল পাচ্ছেন না। সব লাভ যাচ্ছে আমদানিকারকের পকেটে। কারওয়ান বাজারের আড়তদাররা বলছেন, নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসার পর কেজি ১০০ টাকার নিচে নামার কথা। তবে তার আগেই যদি অতিরিক্ত আমদানির চাপ দেওয়া হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন দেশের কৃষক।
এদিকে দামের চাপে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পাতাসহ অপরিপক্ব পেঁয়াজ বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে। বেশি লাভের আশায় অনেক কৃষক পুষ্ট হওয়ার আগেই জমি থেকে পেঁয়াজ তুলে ফেলছেন। কৃষি কর্মকর্তাদের শঙ্কা, এতে সামনে প্রকৃত সংকট তৈরি হতে পারে। এভাবে অপুষ্ট পেঁয়াজ বিক্রি করলে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় ধাক্কা লাগতে পারে। এ পেঁয়াজ পরিপক্ব হলে ওজনে বেশি হতো। আর পরিপক্ব হওয়ার আগে পেঁয়াজ তুললে তা বেশি দিন সংরক্ষণ করা যায় না।
পেঁয়াজের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত পাবনার সাঁথিয়া। সেখানকার বায়া গ্রামের কৃষক মাহফুজুর রহমান গতকাল খুশিমনে জমি থেকে আগাম বা মুড়িকাটা পেঁয়াজ তুলছিলেন। যদিও তাঁর এই পেঁয়াজ পরিপক্ব হতে এখনও দুই সপ্তাহ সময় প্রয়োজন। এখন বাজারে ভালো দাম পাওয়ার আশায় তিনি আর অপেক্ষা করছেন না। মাহফুজুর রহমানের মতো সাঁথিয়ার অনেক কৃষকই এবার বেশি দামের আশায় অপরিপক্ব মুড়িকাটা পেঁয়াজ তুলে বাজারে দিচ্ছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এস এম সোহরাব উদ্দিন বলেন, অক্টোবরের শুরুর দিকে খুব অল্প জমিতে যতটুকু মুড়িকাটা আবাদ করা হয়েছিল সেগুলোই শুধু এখন পরিপক্ব হয়েছে। কিন্তু বাজারে ভালো দাম দেখে সেই পেঁয়াজের পাশাপাশি কিছুটা অপরিপক্ব পেঁয়াজও কৃষকরা বাজারে তুলে আনছেন। এতে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কৃষকদের বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করছেন।
কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল রাখতেই আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চাহিদার খুবই সামান্য মাত্র ৫০ হাজার টনের মতো পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। দাম কমতে শুরু করেছে। আশা করি, আর আমদানির প্রয়োজন হবে না।
