করদাতাদের উৎসাহিত করতে সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা জরুরি
ভয়েস ফর রিফর্ম ও ব্রেইনের সেমিনারে বক্তারা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজস্ব আদায় ও সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে জনগণের মধ্যে কর সম্মতি বাড়ানো কঠিন হবে। করদাতাদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ কীভাবে ব্যয় হয় তা দৃশ্যমান না হওয়ায় জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পাশাপাশি রাজস্ব প্রশাসনের ন্যায্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। তারা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সময়ে বিভ্রান্তিকর পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর না করে দেশের বাস্তব অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন।
ভয়েস ফর রিফর্ম ও বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (ব্রেইন) এ সেমিনারের আয়োজন করে। ভয়েস ফর রিফর্মের সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর এতে সঞ্চালনা করেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান।
সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, যতক্ষণ মানুষ দেখতে না পাবে যে তাদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, ততক্ষণ কর সম্মতি বিকশিত হবে না। করদাতাদের অর্থ জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজস্ব ব্যবস্থায় ন্যায়বিচারের অভাবজনিত কারণে মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ব্যবস্থায় ন্যায্যতা নেই বলেই আস্থা সংকট দেখা দিয়েছে।
অনুষ্ঠানে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, দেশের অর্থনীতিতে পুঞ্জীভূত বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১৩ বিলিয়ন ডলার। ঋণের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন টাইম বোমার ওপর অবস্থান করছে। যে কোনো সময় এর বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
তিনি বলেন, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই বললেই চলে। ফলে যারা রাজস্ব আয় করবেন আর যারা খরচ করবেন, কারও সঙ্গে কারও সমন্বয় নেই। প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনটি জরুরি, কোনটি অপ্রয়োজনীয়, কোনটি অপচয়– এসব সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। সরকার ব্যয় ঠিক করে আয়ের দায়িত্ব এনবিআরকে চাপিয়ে দেয়। আর রাজস্ব আহরণকারী সরকারি সংস্থা এনবিআর কখনও সরকারকে তার সক্ষমতার কথা জানাতে পারে না। চুপচাপ সব মেনে নেয়। আর এর মধ্যেই করদাতাদের হয়রানির মূলমন্ত্র নিহিত।
ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, ‘আমি যে কর দিই তার বিনিময়ে আমি কী পাই? অন্যান্য দেশে করদাতারা বিনামূল্যে বহু সেবা পান।’ তিনি বলেন, কর প্রদানের পর নাগরিক সুবিধা দৃশ্যমান হলে মানুষ আরও বেশি কর দিতে আগ্রহী হবে। বর্তমানে দেশের করযোগ্য জনগোষ্ঠীর মাত্র ২০ শতাংশ কর প্রদান করে, বাকি ৮০ শতাংশ কর না দেওয়ার কারণে চাপ পড়ে ওই ২০ শতাংশ করদাতার ওপর।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, পূর্ববর্তী সরকারগুলোর সময় দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে করদাতাদের অর্থের অপচয় হয়েছে, যা রাজস্ব প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা কমিয়েছে।
আলোচনায় এনবিআরের ন্যূনতম কর আদায় নীতির সমালোচনা করে বক্তারা বলেন, কর ন্যায্যতার প্রশ্নে বাংলাদেশ ব্যতিক্রমী অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে বাংলাদেশে উৎসে কর কর্তন করা ন্যূনতম কর ফেরত পাওয়া যায় না, এমনকি কোনো প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়লেও তা প্রযোজ্য থাকে। করের মৌলিক দর্শন আয়ের ওপর কর আরোপ করার; আয় না থাকলে কর আরোপের প্রশ্নই আসে না। বাস্তবে কোম্পানিগুলোর কার্যকর করহার ঘোষিত করহারের চেয়ে অনেক বেশি বলেও মন্তব্য করেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানে কর ও রাজস্ব বিশেষজ্ঞ, স্নেহাশীষ মাহমুদ অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা অংশীদার স্নেহাশীষ বড়ুয়া, ব্রেইনের নির্বাহী পরিচালক ড. শফিকুর রহমান, ইনোভেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রোবায়েত সারওয়ার প্রমুখ বক্তব্য দেন।
- বিষয় :
- আয়কর রিটার্ন
