বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস
যুদ্ধের ধাক্কায় এ বছর বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বাড়তে পারে ১৬%
জ্বালানির দাম চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হতে পারে
ছবি: রয়টার্স
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:১৭
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বৈশ্বিক পণ্যবাজারে বড় ধরনের ধাক্কা দিচ্ছে, যার ফলে এ বছর জ্বালানির দাম ২৪ শতাংশ বাড়তে পারে- যা ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর সর্বোচ্চ। ২০২৬ সালে সামগ্রিক পণ্যের দাম ১৬ শতাংশ বাড়তে পারে। এর প্রধান কারণ জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধি এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর রেকর্ড উচ্চ মূল্য। এ ধাক্কার ফলে বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উন্নয়নের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়বে।
মঙ্গলবার ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সর্বশেষ ‘কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক’ প্রতিবেদনে এমন পূর্বাভাস রয়েছে। গত বছর এপ্রিলে প্রকাশিত একই প্রতিবেদন বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য ১২ শতাংশ কমার পূর্বাভাস ছিল। এ বছর ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও পণ্যমূল্য ইতিমধ্যে অনেকটাই বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন তেল সরবরাহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সৃষ্টি করেছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ প্রাথমিকভাবে দৈনিক প্রায় ১ কোটি ব্যারেল কমে গেছে। বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩৫ শতাংশ এই পথে পরিবহন হয়।
এতে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ স্তর থেকে কিছুটা কমলেও এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বছরের শুরু থেকে ৫০ শতাংশ বেশি ছিল। ২০২৬ সালে অপরিশোধেত তেলের গড় মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৮৬ ডলার হতে পারে, যা ২০২৫ সালের ৬৯ ডলার থেকে অনেক বেশি। মে মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিঘ্ন কেটে যাবে এবং ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে- এমন অনুমানের ভিত্তিতে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, যুদ্ধের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ভুগবে। বিশ্বের ৭০ শতাংশ পণ্য আমদানিকারক এবং ৬০ শতাংশ পণ্য রপ্তানিকারক দেশ তাদের প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধির চেয়ে কম প্রবৃদ্ধি দেখতে পারে। যদি সংঘাত আরও তীব্র হয় বা সরবরাহ বিঘ্ন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে ২০২৬ সালে ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলার পর্যন্ত যেতে পারে। এতে সারের দাম ও বিকল্প জ্বালানির দামও বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মূল্যস্ফীতি ৫.৮ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে, যা গত দশকে শুধুমাত্র ২০২২ সালেই এর চেয়ে বেশি ছিল।
বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্স বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ইন্দরমিত গিল বলেন, এই যুদ্ধ প্রথমে জ্বালানির দাম, তারপর খাদ্যের দাম এবং শেষে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে ধাপে ধাপে বিশ্ব অর্থনীতিকে আঘাত করছে। এতে সুদের হার বাড়বে এবং ঋণ আরও ব্যয়বহুল হবে।
তিনি বলেন, ‘এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র মানুষ, যারা তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য ও জ্বালানিতে ব্যয় করে। উন্নয়নশীল দেশগুলো, যেগুলো ইতোমধ্যে ঋণের চাপে রয়েছে, তারাও বড় ধাক্কা খাবে। এটি আমাদের একটি কঠিন সত্য মনে করিয়ে দেয়- যুদ্ধ মানে উন্নয়নের বিপরীত।’
পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালে সারের দাম ৩১ শতাংশ বাড়তে পারে, যার মধ্যে ইউরিয়া সারের দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ফলে সার কেনার সামর্থ্য ২০২২ সালের পর সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছাবে, যা কৃষকের আয় কমাবে এবং ভবিষ্যৎ ফসল উৎপাদন ঝুঁকিতে ফেলবে। যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে খাদ্য সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ বাড়বে এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির অনুযায়ী, এ বছর অতিরিক্ত ৪৫ মিলিয়ন মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়তে পারে।
প্রতিবেদনটি বলছে, অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনসহ বেস মেটালের দামও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। ডেটা সেন্টার, ইলেকট্রিক গাড়ি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি শিল্পে চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এই দাম বাড়ছে। অন্যদিকে, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণসহ মূল্যবান ধাতুর চাহিদা বাড়ছে, যার ফলে ২০২৬ সালে এদের গড় মূল্য ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সার্বিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ২০২৬ সালে মূল্যস্ফীতি গড়ে ৫.১ শতাংশ হতে পারে, যা যুদ্ধের আগে অনুমান করা স্তরের তুলনায় ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি এবং গত বছরের ৪.৭ শতাংশ থেকেও বেশি। একই সঙ্গে, উন্নয়নশীল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৬ শতাংশ হতে পারে, যা জানুয়ারির পূর্বাভাসের তুলনায় ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট কম।
- বিষয় :
- বিশ্বব্যাংক
- খাদ্যপণ্য
- জ্বালানি তেল
- ইরান যুদ্ধ
