ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উচ্চ সংরক্ষণমূলক শুল্কের কারণে ভোক্তার ক্ষতি ২০ বিলিয়ন ডলার

বৈঠকে ড. জাইদী সাত্তার

উচ্চ সংরক্ষণমূলক শুল্কের কারণে ভোক্তার ক্ষতি ২০ বিলিয়ন ডলার
×

আলোচনা সভা

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ২১:০৫

বাংলাদেশে আমদানিতে উচ্চ সংরক্ষণমূলক শুল্কের বোঝা বহন করছেন ভোক্তারা। স্থানীয় শিল্প সুরক্ষার নামে অত্যন্ত ব্যয়বহুল আমদানিরকারণে ভোক্তা পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। যার ফলে ভোক্তার ক্ষতি হচ্ছে জিডিপির ৫ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার এমন প্রাক্কলন করেছেন। 

জাইদী সাত্তার উল্লেখ করেন, বাণিজ্য নীতির সবচেয়ে বড় অংশীদার ভোক্তারা, অথচ তারাই সবচেয়ে উপেক্ষিত। বাংলাদেশের মূল্যস্তর ভারতের চেয়েও বেশি হওয়ায় মার্কিন ডলারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাংলাদেশে ভারতের তুলনায় কম। পিআরআইয়ের সেন্টার ফর ট্রেড অ্যান্ড প্রোটেকশন পলিসি রিসার্চ (সিটিটিপিআর) আজ সোমবার ‘বাণিজ্য নীতি, শিল্প সুরক্ষা, বিনিয়োগের প্রভাব ও ভোক্তা কল্যাণ’ শিরোনামে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। 

পিআরআই এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, অনুষ্ঠানে নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা এবং ভোক্তা অধিকারকর্মীরা অংশ নিয়ে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও শিল্প সুরক্ষা নীতির বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং ভোক্তা কল্যাণের ওপর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সংরক্ষণবাদ চিরকাল চলতে পারে না। এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির সময় আমাদের আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিল্পকে অনির্দিষ্টকাল সুরক্ষা দেওয়া নয়, বরং এমন শিল্প গড়ে তোলা যা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।’ 

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে পিআরআই চেয়ারম্যান দেশের শুল্ক কাঠামো, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং রপ্তানি উন্নয়ন কৌশলে জরুরি সংস্কারের আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান কাঠামো উৎপাদক ও ভোক্তা—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। বিনিময় হার অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যগুলোর একটি। বাণিজ্য নীতি প্রণয়ন করা হবে কিন্তু বিনিময় হার কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা বিবেচনায় নেওয়া হবে না—এটা একেবারেই অযৌক্তিক।

বৈশ্বিক মানদণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন শুল্ক কাঠামো
ড. জাইদী সাত্তার উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের গড় শুল্কহার বর্তমানে ২৮ শতাংশ, যা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর (৭ শতাংশ) চার গুণ এবং উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর  (৩ শতাংশ) প্রায় দশ গুণ। প্যারা-ট্যারিফ যুক্ত হলে কার্যকর শুল্কহার প্রায় ৫৫ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২২ সালের পর থেকে মুদ্রার ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়নের ফলে আমদানির মূল্য ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে এবং উচ্চ শুল্কহার ভোক্তা মূল্য বৃদ্ধি ও উৎপাদন খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল করেছে।

তিনি আরও বলেন, ১৯৯২ সালে কাস্টমস ডিউটি ৭০ শতাংশ থেকে বর্তমানে ১৪ শতাংশে নেমে এলেও একই সময়ে সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কসহ প্যারা-ট্যারিফ ২.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে শুল্ক উদারীকরণের সুফল অনেকাংশে ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং শুল্ক কাঠামো আরও জটিল হয়েছে।

রপ্তানিবিরোধী পক্ষপাত 
ড. জাইদী সাত্তার বলেন, বাংলাদেশের শিল্পনীতিতে একটি সুস্পষ্ট রপ্তানিবিরোধী পক্ষপাত বিদ্যমান। আমদানিবিকল্প শিল্পে গড় সুরক্ষা ২৮ শতাংশ হলেও গড় রপ্তানি ভর্তুকি মাত্র ৭ শতাংশ। এর ফলে পোশাকবহির্ভূত পণ্যের রপ্তানি স্থবির হয়ে পড়েছে এবং নগদ সহায়তা প্রধান নীতি উপকরণ হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি বাণিজ্য নীতির দ্বৈততার কথাও উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, তৈরি পোশাক খাতের জন্য তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত ও শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি ব্যবস্থা থাকলেও অর্থনীতির অন্যান্য খাতের জন্য উচ্চ সুরক্ষাবাদী কাঠামো বিদ্যমান। সময়সীমাবদ্ধ ও কর্মদক্ষতাভিত্তিক শর্ত ছাড়া এই সুরক্ষা স্থায়ীভাবে অপ্রতিযোগিতামূলক শিল্প তৈরি করতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

প্রধান নীতিগত সুপারিশ
আলোচনা সভায় বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়, যার অন্যতম জাতীয় শুল্কনীতি ২০২৩ বাস্তবায়ন করা। এছাড়া বাণিজ্য নীতির সঙ্গে বিনিময় হার নীতির সুস্পষ্ট সমন্বয় নিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, ট্যারিফ কমিশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার সুপারিশ আসে।  নিম্ন-মধ্যম ও উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মানদণ্ড অনুযায়ী ধাপে ধাপে ও স্বচ্ছ রোডম্যাপের মাধ্যমে শুল্কহার হ্রাস ও যৌক্তিকীকরণ করার সুপারিশ করা হয়। 

অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে রপ্তানি নীতি ও আমদানি নীতি আদেশ ইংরেজিতে প্রকাশ করা, ডব্লিউটিওর বাধ্যবাধকতা ও আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিল্প সুরক্ষাকে সময়সীমাবদ্ধ ও কর্মদক্ষতাভিত্তিক করা এবং  রপ্তানি উন্নয়নের পাশাপাশি ভোক্তা কল্যাণকে বাণিজ্য নীতির কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়া। 

আলোচকরা যা বলেছেন
অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ও শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব এ. এইচ. এম. শফিকুজ্জামান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য (ভ্যাট) মো. ফরিদ উদ্দিন; ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ; ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশনের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা ড. এম মাশরুর রিয়াজ।

এ. এইচ. এম. শফিকুজ্জামান বলেন, ভোক্তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে আমদানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যবসা ও কৃষকদের সুরক্ষা দেওয়ার নীতি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে যৌক্তিক শুল্কহার, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং ভোক্তা কল্যাণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন ।

তাসকীন আহমেদ নীতিনির্ধারণে এনবিআর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, অতিরিক্ত সুরক্ষাবাদ রপ্তানি বহুমুখীকরণে বাধা সৃষ্টি করেছে এবং ক্রমবর্ধমান এফটিএ ও পিটিএ-এর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে আরও উন্মুক্ত বাণিজ্য পরিবেশের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, কিছু শিল্প অত্যধিক সুরক্ষা পেলেও অন্য অনেক শিল্প কোনো সুরক্ষাই পায় না। কার্যকর কর সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে এনবিআরের মূল ভূমিকা হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণ নয়, বরং বাস্তবায়ন।

রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং দক্ষ স্থানীয় শিল্প, বিশেষত ওষুধ শিল্পের মাধ্যমে আমদানি বিকল্পায়ন ভোক্তাদের জন্য উপকারী হবে।
ড. এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, উচ্চ সুরক্ষামূলক শুল্কের পরিবর্তে সমন্বিত বাণিজ্য, শিল্প, বিনিয়োগ ও করনীতির মাধ্যমে রপ্তানিমুখী অর্থনৈতিক ভিশন প্রয়োজন। তিনি রাজস্ব ও প্রবৃদ্ধি কৌশলের মধ্যে সামঞ্জস্য, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং ভোক্তা কল্যাণ, বিনিয়োগ ও রপ্তানি বহুমুখীকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।

আরও পড়ুন

×