গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা
পরোক্ষ করের অতিনির্ভরতা মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ সংকট বাড়াচ্ছে
রাজধানীর কাওরান বাজারে বিডিবিএল ভবনে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা। ছবি-সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ | ১৯:৫৪ | আপডেট: ১৮ মে ২০২৬ | ২০:৩০
রাজস্ব আহরণে পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়ানো এবং বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিচ্ছে বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ, কর বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা। তারা বলছেন, ভ্যাট ও অগ্রিম আয়করের মতো পরোক্ষ করের চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপরই গিয়ে পড়ে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে।
সোমবার রাজধানীর কাওরান বাজারে বিডিবিএল ভবনে অনুষ্ঠিত ‘পরোক্ষ করের উপর অতি নির্ভরশীলতা : অর্থনীতির উপর বহুমুখী প্রভাব’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব মত তুলে ধরা হয়। ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কর বিশেষজ্ঞ ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া। তিনি বলেন, ভারতে সরকারের মোট কর আয়ের মধ্যে পরোক্ষ করের অংশ ৫০ শতাংশের নিচে থাকলেও বাংলাদেশে বর্তমানে তা প্রায় ৮০ শতাংশ, যা এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। প্রত্যক্ষ কর আদায়ে দুর্বলতার কারণেই সরকার সহজ রাজস্ব আহরণের পথ হিসেবে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, তাত্ত্বিকভাবে অগ্রিম আয়কর প্রত্যক্ষ কর হলেও বাস্তবে এটি অনেকাংশে পরোক্ষ করের মতো কাজ করছে। পণ্য ও কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ভ্যাট ও কাস্টমস ডিউটির পাশাপাশি অগ্রিম কর আরোপের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারদরে। সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির পেছনেও ভ্যাট ও অগ্রিম আয়করের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে এনবিআরের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ ফরিদউদ্দিন বলেন, কোনো অবস্থাতেই ভ্যাট হার ১০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। তিনি জানান, কর কাঠামো সংস্কারে গঠিত টাস্কফোর্সও সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ভ্যাট হারের সুপারিশ করেছিল। তবে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
তিনি আরও বলেন, শুধু ডিজিটাইজেশন করলেই রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি আসবে না। ভ্যাট, কাস্টমস ও আয়কর ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বিত আন্তঃসংযোগ গড়ে তুলতে হবে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, রাজস্ব আহরণের পাশাপাশি সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন পে-স্কেলের জন্য অতিরিক্ত ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় উপযুক্ত সময় নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আলোচনায় আরও অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ড. এম আবু ইউসুফ, বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ইমরান হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. রুশাদ ফরিদী, ইউনিলিভার বাংলাদেশের সাবেক হেড অব ট্যাক্স সাঈদ আহমেদ খান, ভ্যাট ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. আব্দুর রউফ এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আক্তার মালা।
বক্তারা বলেন, পরোক্ষ করের অতিনির্ভরতা শুধু মূল্যস্ফীতিই বাড়াচ্ছে না, বরং বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বাড়াতে কর ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনার বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানের শেষাংশে ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ কয়েকটি সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে সাধারণ ভ্যাট হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ, বিলাসপণ্যে ২৫ শতাংশের বেশি ভ্যাট আরোপ, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের আমদানিতে অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার, মোবাইল টকটাইমে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বাতিল এবং বাজেটে প্রত্যক্ষ করের অংশ ৪০ শতাংশে উন্নীত করা।
