এডিপিতে নজিরবিহীন বড় থোক, স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
আবু হেনা মুহিব
প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ০৭:২৩ | আপডেট: ২৬ মে ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ব্যয়ের অর্থ জোগানে টানাপোড়েনে রয়েছে সরকার। এমন পরিস্থিতির মধ্যে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার রেকর্ড বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এই এডিপির ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকাই থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। এর আগে আর কোনো অর্থবছর এত বড় থোক বরাদ্দ রাখা হয়নি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর যা ছিল ১০ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা। তার আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ১১ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। থোকের এই অর্থ পুরোটাই সরকারের নিজস্ব উৎস থেকে জোগান দেওয়া হবে। অর্থাৎ থোকের অর্থ জোগাতে কোনো ধরনের বিদেশি ঋণ নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান সমকালকে বলেন, থোক বাবদ এত বড় বরাদ্দ অবশ্যই অস্বাভাবিক ও উদ্বেগের বিষয়। চলতি অর্থবছরে যেখানে এই বরাদ্দ ছিল মাত্র ১০ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা, সেখানে হঠাৎ করে এত বড় পরিমাণ বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
তিনি বলেন, সাধারণত থোক বরাদ্দ এমন খাতে রাখা হয় যেখানে নির্দিষ্ট প্রকল্প বা ব্যয়ের বিস্তারিত আগে থেকে স্পষ্ট থাকে না। কিন্তু এডিপির বড় একটি অংশ যদি এভাবে অনির্দিষ্ট খাতে রাখা হয়, তাহলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। এত বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারকে আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হবে, কীভাবে ব্যয় হবে এবং তার অগ্রগতি কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে–এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা জরুরি। অন্যথায় অপচয়, অদক্ষতা কিংবা অনিয়মের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিভিন্ন খাতে থোকের ছড়াছড়ি
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (এনইসি) অনুমোদন হওয়া এডিপি বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা; যার মধ্যে থোক বরাদ্দই ২৩ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। শিক্ষা খাতে ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকার মধ্যে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৬ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। সামাজিক সুরক্ষা খাতে ৩৫টি প্রকল্পের বিপরীতে মোট বরাদ্দ দুই হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এ খাতে থোক বরাদ্দ রয়েছে ১০৭ কোটি টাকা।
গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা খাতে থোক বরাদ্দ এক হাজার ২৭ কোটি টাকা। এ খাতে মোট এডিপি বরাদ্দ ২০ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি খাতে থোক রাখা হয়েছে ৯২৪ কোটি টাকা। মোট বরাদ্দ তিন হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নে মোট বরাদ্দ ১৩ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা। এরমধ্যে থোক আকারে রাখা হয়েছে ৭০১ কোটি টাকা।
পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। এই খাতের মোট বরাদ্দ রয়েছে ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা। মোট ১৭৮ প্রকল্পের বিপরীতে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে এই বরাদ্দ রয়েছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ প্রকল্পে ৩০ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা আর থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৩ হাজার ৯০২ কোটি টাকা।
এরকম প্রায় সব খাতেই থোক বরাদ্দ রাখা রয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বিপরীতে থোক বরাদ্দ ছাড়াও উন্নয়ন সহায়তা বাবদ ৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা রয়েছে। এছাড়া বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা ও সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা খাতে ৩৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এডিপি প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, থোক আকারে রাখা এ অর্থ প্রকল্পভিত্তিক খাতেই ব্যয় করতে হবে। থোক এবং বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা খাতের বরাদ্দ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো উন্নয়ন প্রকল্প নিতে পারবে। তবে উন্নয়ন প্রকল্পের বাইরে এই অর্থ ব্যয় করার সুযোগ নেই। তবে প্রকল্পের আওতায় সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন খাতে কিছু অর্থ ব্যয় করার সুযোগ রয়েছে।
অবশ্য নতুন এডিপিতে নির্বিচারে ঢালাও নতুন প্রকল্প নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়নি। বরং চলমান মেগা প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করা এবং উৎপাদনশীল খাতে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে। চলতি ও প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো মেগা প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করার ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পে চাহিদা মতো বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়েছে।
এই প্রকল্পগুলো দ্রুত চালু করে অর্থনীতিতে দ্রুত সেবা সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। আবার সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে কৃষি খাতে ভর্তুকি সচল রাখা এবং স্বাস্থ্য-শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে জোর দেওয়া হয়েছে।
পুরোনো প্রকল্পের চাপ কমাতে চলতি অর্থবছরের জুনের মধ্যে সমাপ্ত হওয়ার তালিকায় থাকা ২৮৩টি প্রকল্পের মেয়াদ আর না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পগুলো আবশ্যিকভাবে শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এনইসি বৈঠকে।
এক টাকা বরাদ্দের নজির
তিন লাখ কোটি টাকার রেকর্ড এডিপিতে কোনো কোনো প্রকল্পে ১ টাকা বরাদ্দের নজিরও সৃষ্টি হয়েছে নতুন এডিপিতে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নের প্রকল্প ‘তথ্য আপা দ্বিতীয় পর্যায়’ প্রকল্পে আগামী অর্থবছরের এডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ১ টাকা। চলতি অর্থবছর প্রকল্পটির বরাদ্দ ছিল ৯৯ কোটি টাকা। প্রকল্পটির অনুমোদিত মোট ব্যয় ৬৬১ কোটি টাকা। প্রকল্পটি চলতি অর্থবছরে শেষ হওয়ার কথা। ২০১৭ সালের এপ্রিলে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এছাড়া মাত্র এক লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এরকম প্রকল্প রয়েছে ৫৪টি। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোনো প্রকল্পের বিপরীতে কোনো অর্থবছরে বরাদ্দ না থাকলে প্রকল্পটি তামাদি হয়ে যায়। এ কারণে নামমাত্র বরাদ্দ দিয়ে তামাদি হওয়া থেকে প্রকল্প রক্ষা করা হয়।
- বিষয় :
- এডিপি
