ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার হারিয়ে চামড়া রপ্তানি এখন চীননির্ভর
আনোয়ার ইব্রাহীম
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
তৈরি পোশাকের পর দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রপ্তানি আয়ের উৎস চামড়া শিল্প। অথচ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে খাতটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে আছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে মোট রপ্তানি আয়ের ৪ শতাংশের বেশি এসেছিল চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে। কমতে কমতে এখন তা ২ শতাংশের ঘরে।
এ শিল্পের কাঁচামালের বড় অংশের জোগান আসে কোরবানির ঈদে। অথচ দাম না পেয়ে প্রতিবছর মূল্যবান প্রচুর চামড়া ফেলে দিচ্ছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী ও কোরবানির চামড়া সংগ্রহ করা এতিমখানা ও মাদ্রাসা। যত পশু কোরবানি হয়, তার পুরো চামড়া কেনায় ট্যানারিগুলো আগ্রহ দেখায় না। ফলে ১৫ থেকে ২০ বছর আগেও যে গরুর চামড়া তিন হাজার টাকায় কেনাবেচা হতো, এখন তা ৬০০ টাকায়ও মিলছে না।
চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, সংকটের মূলে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে না পারা। সাভারের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) গত সাত বছরেও পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর না হওয়ায় ইউরোপ ও আমেরিকার বড় ক্রেতাদের কাছে চামড়া রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দেশের চামড়া শিল্প এখন চীনের বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যেখানে চামড়ার দাম বিশ্ববাজারের তুলনায় অনেক কম।
২০১৭ সালে তৎকালীন সরকার রপ্তানি বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে এ খাতকে চিহ্নিত করেছিল। ২০১৯ সালে চামড়া নীতিও করা হয়। ২০২৪ সালের মধ্যে রপ্তানি ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রাও ঘোষণা করা হয়। তবে ওই নীতিমালা ও ঘোষণা কেবল কাগুজে। এক দশকেরও বেশি সময়ে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে পারেনি সরকার।
রপ্তানি আটকে আছে বিলিয়ন ডলারে
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১২-১৩ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে রপ্তানি আয় ছিল ৯৮ কোটি ডলার। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১৩০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। ওই বছর মোট রপ্তানিতে এই খাতের অংশ ছিল ৪.২৯ শতাংশ, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। তবে এরপর থেকেই খাতটি পতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পর থেকে রপ্তানি আয় নিম্নমুখী হতে শুরু করে।
২০১৯-২০ অর্থবছরে রপ্তানি আয় কমে ৮০ কোটি ডলারে নেমে আসে। কভিড-পরবর্তী সময়ে কিছুটা উন্নতি হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ১১৮ কোটি ডলারের। তবে এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে হয় ১০৪ কোটি ডলার। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে প্রায় ১১৫ কােটি ডলার রপ্তানি আয় এসেছে। চলতি অর্থবছরে প্রথম ১০ মাসে এসেছে প্রায় ৯৯ কােটি ডলার।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ জানান, এলডব্লিউজি সনদ না থাকার কারণে তারা ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে যেতে পারছেন না। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একসময় মূল ক্রেতা ছিল। কিন্তু কমপ্লায়েন্সের কারণে ২০১৬ সালের পর থেকে তারা কেনাকাটা বন্ধ করে দিয়েছে।
শাহীন আহমেদ আরও জানান, একটি ইটিপি করতে প্রায় ১০ কোটি টাকা লাগে, যা বর্তমানে আর্থিকভাবে দুর্বল ট্যানারি মালিকদের পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর সিইপিটির মাধ্যমে পুরো তরল বর্জ্য পরিশোধন করা যাচ্ছে না। ফলে ট্যানারিগুলো এ সনদ পাচ্ছে না।
চামড়া ব্যবসায়ী আফতাব খান রপ্তানি বাধার প্রধান কারণ হিসেবে বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তনকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের চামড়া বিশ্বের অন্যতম সেরা গুণগত মানের হওয়া সত্ত্বেও এলডব্লিউজি সার্টিফিকেট না পাওয়ায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি।’
তিনি জানান, একসময় বাংলাদেশের চামড়ার প্রধান ক্রেতা ছিল জাপান, যারা সবচেয়ে বেশি দাম দিত। কিন্তু এখন চীনের ক্রেতারাই আমাদের একমাত্র ভরসা, যারা বিশ্বে সবচেয়ে কম দামে চামড়া কেনে। সাভারে যে সিইটিপি করা হয়েছে তা চীনাদের দ্বারা নির্মিত এবং এটি শুরু থেকেই অকার্যকর, যার খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো শিল্পকে।
সংকট উত্তরণের নতুন পরিকল্পনা
সাভার চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম শাহনেওয়াজ জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে ইতোমধ্যে একটি ‘রোডম্যাপ’ তৈরি করা হয়েছে। ইতালির বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ কোম্পানি ইটালপ্রোগেত্তি বর্তমানে সিইটিপির পূর্ণাঙ্গ ত্রুটি ও আধুনিকায়নের বিষয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন করছে, যার রিপোর্ট শিগগিরই পাওয়া যাবে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে সিইটিপিকে ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ডে উন্নীত করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা হবে।
তিনি জানান, সরকার ২০-৩০টি বড় ট্যানারিকে নিজস্ব ইটিপি করার ব্যাপারে উৎসাহিত করছে, যাতে কোরবানির সময়ের অতিরিক্ত লোড সামলানো যায়। এই পরিকল্পনায় ইতোমধ্যে বেশ কিছু বড় কোম্পানি যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে অ্যাপেক্স শেয়ারবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করে নিজস্ব ইটিপি করার ঘোষণা দিয়েছে। সামিনা, বেঙ্গল, ঢাকা হাইড অ্যান্ড স্কিন, আঞ্জুমান এবং সালমা ট্যানারিও নিজস্ব উদ্যোগে ইটিপি করার জন্য কাজ শুরু করেছে।
যাদের সনদ রয়েছে
বর্তমানে দেশে শিল্পনগরীসহ মোট আটটি কোম্পানি এলডব্লিউজি সনদপ্রাপ্ত। এর মধ্যে পাইওনিয়ার ইতোমধ্যে গোল্ড সার্টিফিকেট অর্জন করে ইতালির প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফল হয়েছে। এ ছাড়া রিফ লেদার, অস্টান লিমিটেড, এবিসি লেদার, সুপারেক্স লেদার, এসএএফ ইন্ডাস্ট্রিজ, পাইওনিয়ার সিমোনা ট্যানিং, সং শিন লেদারের এই সনদ আছে। নতুন করে এলডব্লিউজি সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় সদর ট্যানারি অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
গোলাম শাহনেওয়াজ আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বড় কোম্পানিগুলো নিজস্ব ইটিপি করলে দ্রুত সনদ পাবে এবং সিইটিপি আধুনিকায়ন হলে পুরো শিল্পনগরীই আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থায় ফিরে আসবে।
- বিষয় :
- চামড়া খাত
