ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকা

তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকা
×

বাংলাদেশ ব্যাংক

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ১৬:০৮ | আপডেট: ০২ জুন ২০২৬ | ২২:৩৫

এক প্রান্তিকে কমার পর আবার বাড়ল খেলাপি ঋণ। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ৩১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা বেড়ে খেলাপি ঋণ উঠেছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। মোট ঋণের যা ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অবশ্য গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা এবং মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। তবে বিশেষ নীতি সহায়তা, আদায় জোরদারসহ বিভিন্ন উপায়ে বছরের শেষ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমানো হয়।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ডিসেম্বরভিত্তিক যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছিলো তা ছিল প্রভিশনাল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে পরবর্তীতে অনেক খেলাপি ঋণ উদঘাটন হয়েছে। যে কারণে মার্চের তথ্যে খেলাপি বেড়েছে। আবার ব্যাংকগুলো ডিসেম্বরভিত্তিক তথ্যের ভিত্তিতে লভ্যাংশ ঘোষণা করে। যে কারণে সব সময় বছর শেষের খেলাপি ঋণ কমানোর ওপর তৎপরতা বেশি থাকে। সে তুলনায় ব্যাংকগুলোর মার্চ প্রান্তিকে আদায় তৎপরতা কম থাকে। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ এভাবে বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তিন মাসে ঋণস্থিতি মাত্র ৩ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা বেড়ে মার্চ শেষে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা হয়েছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ঋণ ছিল ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি বা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ ছিল খেলাপি। 

গত মার্চ প্রান্তিকের বিপুল অংকের এ খেলাপি ঋণের বিপরীতে ৪ লাখ ৬১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল। ব্যাংকগুলো রাখতে পেরেছে মাত্র ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। এর মানে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। আরা মার্চের এ খেলাপির প্রায় ৫ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা বা ৯৩ দশমিক ৬৯ শতাংশই মন্দমানের খেলাপি। এধরনের ঋণ আদায়ের সম্ভবনা খুব কম থাকে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অনিয়ম-জালিয়াতিতে সম্পৃক্ত প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের অনেকেই পালিয়েছেন। কেউ-কেউ জেলে আছেন। আবার নানা নীতি সহায়তার আড়ালে খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখার সুযোগ বন্ধ হয়েছে। ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার অন্যতম শর্ত ছিল নীতি সহায়তার আড়ালে খেলাপি ঋণ কম দেখানো যাবে না। আগের সরকার এই নীতি না মানলেও অন্তবর্তীকালিন সরকার সময় থেকে কঠোরভাবে তা পরিপালন করা হচ্ছে। এতে করে খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়ছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সময় খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওই বছরের জুনভিত্তিক খেলাপি ঋণের প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে দেখা যায়, তিন মাসে ৬৬ হাজার কোটি টাকা বেড়ে ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা হয়েছে। পরবর্তীতে প্রতি প্রান্তিকে বাড়তে–বাড়তে গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা উঠে যায়। মোট ঋণের যা ছিল ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। খেলাপি ঋণের এই হার দক্ষিণ এশিয়ার যে কোনো দেশের মধ্যের সর্বোচ্চ। অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা কমিয়ে আনা হয়। এভাবে খেলাপি ঋণ কমলেও ২০২৫ সালের জন্য অনেক ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পারেনি। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে কেবল ১৬টি লভ্যাশ দিয়েছে। ২০২৬ সালের জন্য লভ্যাংশ দেওয়ার নিয়ম আরও কড়াকড়ি করা হয়েছে। এখন থেকে উচ্চ খেলাপির পাশাপাশি কোনো ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকার কম হলে আর নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন কৌশলে খেলাপি ঋণ কম দেখানো হতো। কখনো বিশেষ ব্যবস্থায় ঋণ পুনঃতপশিল বা পুনর্গঠন, কখনো আদায় না করেও নিয়মিত দেখানো, কিংবা বাড়তি সময় দেওয়া হতো। খেলাপি ঋণ কম দেখানোর সবচেয়ে বড় চুরির সুযোগ দেওয়া হয় ২০১৯ সালে। সাধারণভাবে ঋণ পরিশোধের সময় পার হলেই মেয়াদোত্তীর্ণ হিসাব করা হয়। তবে ওই বছর থেকে মেয়াদি ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত তারিখের ৬ মাস পর থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ হিসাব করা হচ্ছিল। তবে এখন আর এ নিয়ম নেই। কঠোর নিয়মের কারণে পরিস্থিতির খানিকটা উন্নতি হয়েছে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের স্বার্থে এখন নির্বাচিত সরকারও এসব কঠোরতা বজায় রেখেছে।

আরও পড়ুন

×