রাজস্ব আহরণ
সংস্কার ছাড়া আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে হয়রানি বাড়তে পারে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ | ০৮:৪৮ | আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬ | ১২:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
আগামী অর্থবছরে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য ধরা হয়েছে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে যা ২০ শতাংশ বেশি। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ঢাকা এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী উল্লেখ করে এর বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে। কেননা চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে এনবিআর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬৫ শতাংশ বা তিন লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছে।
এমসিসিআইর মতে, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করদাতাদের ওপর হয়রানি বাড়তে পারে। অতিরিক্ত কর আরোপ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি করে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগকে এমসিসিআই ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।
গতকাল শুক্রবার পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমসিসিআই এই মূল্যায়ন তুলে ধরে। সংগঠনটি বলেছে, বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য করনীতি সংস্কার, কর প্রশাসনের অটোমেশন, সিস্টেমলস কমানো, প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং বাজেট ব্যবস্থাপনায় অধিকতর গতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে করজাল সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আইএমএফের শর্ত পূরণে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা যেন করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি না করে, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরও শৃঙ্খলা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দেশের বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে এমসিসিআই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, চলতি অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিনিয়োগ কমার ফলে কর্মসংস্থান কমছে এবং দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ছে। আগামী অর্থবছরে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তিন লাখ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক হলেও এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং দুর্বল রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ বলে এমসিসিআই মনে করে।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গঠনের লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগকে এমসিসিআই স্বাগত জানিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাবিজ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ওয়ানস্টপ ডিজিটাল সেবা, এফটিএ, পিটিএ ও ইপিএ চুক্তি সম্প্রসারণর পরিকল্পনা এবং ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ শিল্পায়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে চেম্বার মনে করে।
এমসিসিআই উৎসে কর-সংক্রান্ত প্রস্তাবিত সংস্কারকে স্বাগত জানিয়েছে। আয়কর আইন অনুযায়ী অনুমোদিত ব্যয়ের ওপর উৎসে কর কর্তন না করলে সম্পূর্ণ ব্যয়কে ‘অননুমোদনযোগ্য’ হিসেবে গণ্য করে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কর-দায় আরোপ করা হতো। প্রস্তাবিত বাজেটে এ বিধান সংশোধন করে সম্পূর্ণ ব্যয়কে অননুমোদনযোগ্য ঘোষণা করার পরিবর্তে শুধু বকেয়া উৎসে কর এবং তার ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ হারে কর পরিশোধের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা করব্যবস্থাকে ব্যবসাবান্ধব করবে এবং অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত করঝুঁকি হ্রাস করবে।
এমসিসিআই কোম্পানির ন্যূনতম টার্নওভার কর যৌক্তিকীকরণ বা কমাতে কোনো পদক্ষেপ না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করছে। এ ছাড়া, ন্যূনতম টার্নওভার কর ফেরত প্রদানের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় লাভ না করেও টার্নওভারের ভিত্তিতে কর প্রদানের এই বাধ্যবাধকতা ব্যবসার নগদ প্রবাহ, পুনর্বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
কোম্পানির করযোগ্য আয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পারকুইজিটের সীমা ২০ লাখ টাকা থেকে ২৫ লাখ টাকায় উন্নীত করা, আপ্যায়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে টার্নওভারের ৪ শতাংশ অথবা প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে যা কম, তা অনুমোদনের বিধান এবং প্রচারণামূলক ব্যয়ের অনুমোদিত সীমা টার্নওভারের ০.৫০ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাবকে এমসিসিআই স্বাগত জানিয়েছে। ফলে প্রকৃত ব্যবসায়িক ব্যয়ের অধিকতর স্বীকৃতি নিশ্চিত হবে, করযোগ্য আয় নির্ধারণে ন্যায্যতা বাড়বে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও করের চাপ কিছুটা লাঘব হবে।
তথ্যের আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থার অপব্যবহারের ঝুঁকি
এমসিসিআই মনে করে, প্রস্তাবিত ডেটা কানেক্টিভিটি বা তথ্যের আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থার অপব্যবহার হওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে, যা ডেটার গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। যথাযথ আইনি সুরক্ষা ও শক্তিশালী প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা কাঠামো ছাড়া এ ধরনের কানেক্টিভিটি বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের দ্বারা তথ্যের অপব্যবহার, ব্যক্তিগত তথ্যে অননুমোদিত নজরদারি বা তথ্যের অনৈতিক অনুসন্ধান চালানোর আশঙ্কা থাকে। তাই, তথ্যের সর্বোচ্চ গোপনীয়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত সুদৃঢ় ও সমন্বিত আইনি এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা ব্যতিরেকে এ ধরনের সংযোগ স্থাপনের অনুমতি দেওয়া সমীচীন হবে না বলে এমসিসিআই মনে করে।
সর্বনিম্ন করহার বৃদ্ধি চাপ বাড়াবে
এমসিসিআইর মূল্যায়নে আরও বলা হয়, করমুক্ত আয়ের সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০২৬-২০২৭ ও ২০২৭-২০২৮ করবর্ষের জন্য তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে করস্ল্যাব সাতটি থেকে ছয়টিতে নামিয়ে আনা এবং সর্বনিম্ন করহার ৫ শতাংশ বিলুপ্ত করে ১০ শতাংশ নির্ধারণের ফলে করদাতাদের একটি বড় অংশের ওপর তাৎক্ষণিক করের চাপ বাড়বে। ২০২৮-২০২৯ করবর্ষ থেকে ২০৩০-২০৩১ করবর্ষ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে করমুক্ত আয়ের সীমা সাড়ে চার লাখ টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনাকে এমসিসিআই স্বাগত জানায়। তবে ২০২৮-২০২৯ করবর্ষ থেকে সর্বোচ্চ করহার ৩০ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি করার প্রস্তাবকে এমসিসিআই পুনর্বিবেচনার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। সংগঠনটি মনে করে, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির প্রভাব প্রস্তাবিত সীমায় পর্যাপ্তভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
এমসিসিআইর মতে, ব্যক্তি করদাতাদের প্রকৃত বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াতের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ রেয়াতের সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সাত লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত মধ্যবিত্ত ও সৎ করদাতাদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। একদিকে সর্বনিম্ন করহার ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ বাড়ানো, অন্যদিকে বিনিয়োগ রেয়াতের সুযোগ সংকুচিত করা নিয়মিত কর প্রদানে অনীহা সৃষ্টি করতে পারে।
- বিষয় :
- সংস্কার
- বাজেট ২০২৬-২৭