২০২৬-২৭ অর্থবছর
সুদ পরিশোধের ব্যয় প্রাক্কলন নিয়ে প্রশ্ন
ছবি: সমকাল ইপেপার
মেসবাহুল হক
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৫ | আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬ | ০৯:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাজেটে সুদ পরিশোধে ব্যয় প্রাক্কলনের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় প্রস্তাবিত বরাদ্দ অনেক কম দেখানো হয়েছে। আবার পরবর্তী দুই অর্থবছরে এ খাতে বড় ধরনের বৃদ্ধি প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রীর পেশ করা বাজেট দলিলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সুদ পরিশোধ খাতে সরকারের প্রকৃত ব্যয় দেখানো হয় এক লাখ ৩৬ হাজার ১০০ কোটি টাকা। অথচ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সুদ পরিশোধ খাতে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে এক লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছিল। সংশোধিত বাজেটেও একই পরিমাণ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই এ খাতে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। সেই হিসাবে অর্থবছর শেষে মোট ব্যয় অন্তত এক লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। আগামী অর্থবছরেও এ ব্যয় কমার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করছেন খোদ অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ বাড়তে থাকায় বাজেট প্রণয়নের আগে ইআরডি এ খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়েছিল।
পরবর্তী বছরগুলোতে এ খাতে ব্যয়ের বড় ধরনের বৃদ্ধি ধরা হয়েছে, যা বাস্তবসম্মত মনে করছেন কর্মকর্তারা। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে সুদ পরিশোধের ব্যয় এক লাখ ৪২ হাজার ১০০ কোটি টাকা এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে এক লাখ ৬২ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছাবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক নীতি বিবৃতির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তা বেড়ে হবে ২৯ লাখ ৫৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছর শেষে ঋণের পরিমাণ পৌঁছাবে ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়।
বাজেটের হিসাব মেলাতে কম বরাদ্দ?
নীতি বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি এবং স্থানান্তর ব্যয়ের মতো খাতগুলো সরকারের পরিচালন ব্যয়ের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে এবং আগামী কয়েক বছরেও এ চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
অর্থ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সুদ পরিশোধ খাতে যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তা দিয়ে প্রকৃত ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হতে পারে। তবে বাজেটের সামগ্রিক হিসাব মেলাতে আপাতত এ পরিমাণ বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। উন্নয়ন বাজেটের বিভিন্ন খাতে যে অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তার পুরোটা ব্যয় না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরবর্তীতে সংশোধিত বাজেটে সেসব খাত থেকে অর্থ স্থানান্তর করে সুদ পরিশোধের বরাদ্দ বাড়ানো হতে পারে। প্রকৃত ব্যয় আরও বেশি হলে অন্যান্য খাতের অব্যবহৃত অর্থ থেকেও তা সমন্বয় করা হতে পারে।
গত শুক্রবার বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অসংগতিপূর্ণ বরাদ্দ নির্ধারণের বিষয়ে একাধিকবার প্রশ্ন করা হলেও অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ বিষয়ে কোনো জবাব দেননি।
বিশেষজ্ঞ মত
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ সমকালকে বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান ঋণ পরিস্থিতি ও সুদ ব্যয়ের প্রবণতা বিবেচনায় এ খাতে ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ারই কথা। নিকট ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধ ব্যয় কমার কোনো সুযোগ নেই। তাই বাজেট প্রণয়নের সময় শুধু নতুন বরাদ্দ নয়, আগের অর্থবছরের প্রকৃত ব্যয় এবং সংশোধিত বাজেটের বাস্তব চিত্র নিয়েও আরও গভীর আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সুদ পরিশোধের মতো একটি বাধ্যতামূলক ব্যয়ের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত প্রাক্কলন না থাকলে তা সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ সমকালকে বলেন, বাংলাদেশের বাজেট প্রস্তাব ও চূড়ান্ত বাজেটে প্রায়ই এমন কিছু লক্ষ্যমাত্রা ও বরাদ্দ রাখা হয়, যা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি রাজস্ব আহরণের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সুদ পরিশোধ বাবদ যে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা তা বাস্তবসম্মত নয়। বিদ্যমান ঋণের পরিমাণ ও সুদের চাপ বিবেচনায় এ ব্যয় কমার সুযোগ নেই; বরং বাড়বে।
মাসরুর রিয়াজ আরও বলেন, প্রায় প্রতি বছরই বাজেট সংশোধনের উন্নয়ন ব্যয় কমানো হলেও ভর্তুকি ও সুদ পরিশোধের মতো বাধ্যতামূলক খাতে ব্যয় সাধারণত বেড়ে যায়। তাই বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় আরও সংস্কার প্রয়োজন। তাঁর মতে, বাজেটের প্রতিটি খাতের বরাদ্দ ও লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত তথ্য-উপাত্ত ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা উচিত।
- বিষয় :
- সুদ
