ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

পিপিআরসির আলোচনায় হোসেন জিল্লুর রহমান

বাজেট বাস্তবায়ন তিন মাস অন্তর তদারক করতে হবে

বাজেট বাস্তবায়ন তিন মাস অন্তর তদারক করতে হবে
×

হোসেন জিল্লুর রহমান

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ০৭:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। শুধু উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, বাস্তবে কতটুকু অর্জিত হচ্ছে, তার ওপর নিয়মিত নজরদারি রাখতে হবে। গতকাল শনিবার পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত এক আলোচনায় সভায় সংগঠনটির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এমন মত দিয়েছেন।

‘পিপিআরসির বাজেট বিশ্লেষণ’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে হোসেন জিল্লুর বলেন, যেকোনো বাজেটের প্রকৃত পরীক্ষা তার প্রতিশ্রুতিতে নয়, বরং বাস্তবায়নে। এ কারণে বাজেট বাস্তবায়ন কৌশলকে সরকারের শাসন কাঠামোর মধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ত্রৈমাসিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। এতে বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিতা এবং প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ ছাড়া বাজেটের লক্ষ্য অর্জন কঠিন। তিনি মনে করেন, দেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে দীর্ঘদিন ধরে তিনটি বড় সমস্যা বাধাগ্রস্ত করছে—দুর্নীতি, বাস্তবায়নে বিলম্ব ও ব্যর্থতা এবং অপ্রয়োজনীয় দপ্তর ও প্রকল্পের কারণে সৃষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক অপচয়। এসব সমস্যা সমাধান না হলে বাজেটের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাবে না।

তিনি আরও বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু সুরক্ষা থাকলেও মধ্যবিত্তের ওপর বাজেটের প্রভাব নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি। করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হলেও করহার বাড়ানোর কারণে করদাতাদের একটি অংশ প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। পাশাপাশি প্রান্তিক অঞ্চলের বৈষম্য কমানো, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার গুণগত সমস্যাগুলো সমাধানে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শক্তিশালী গতি এবং অধিকতর স্বচ্ছতা ছাড়া উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কতটুকু সম্ভব, সে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি রাজস্ব প্রশাসনে প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়নের গতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, রাজস্ব মূলত একটি কার্যকর অর্থনীতি থেকেই আসে। উৎপাদনশীল খাত ও বেসরকারি উদ্যোগগুলো প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে রাজস্ব আহরণ স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে।

নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, বাজেটের অনেক প্রক্ষেপণ দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অনুমানের ওপর নির্ভরশীল। কিছু ব্যবসাবান্ধব প্রশাসনিক সংস্কারকে স্বাগত জানালেও তিনি ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর ভাষ্য, বাজেটে যেন ধরে নেওয়া হয়েছে অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে, কিন্তু বাস্তবে পুনরুদ্ধারের জন্য সময় প্রয়োজন। প্রত্যাশিত ফল অর্জন নির্ভর করবে এমন একটি পরিবেশ তৈরির ওপর, যেখানে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণে আস্থা পাবেন।

একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক তরুণকে একাধিক কাজ করতে হচ্ছে, এমনকি কেউ কেউ খরচ সামলাতে এক বেলা কম খাচ্ছেন। তিনি বলেন, শুধু ঢাকা শহরের চিত্র দেখে দেশের সামগ্রিক অবস্থা মূল্যায়ন করা যাবে না। রাজধানীর বাইরের অঞ্চলে মানুষের কষ্ট ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বেশি দৃশ্যমান।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. এ. সাত্তার মণ্ডল বলেন, কৃষি খাতে সহায়তা অব্যাহত থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও দীর্ঘমেয়াদি কৃষি উন্নয়ন কৌশলের ঘাটতি রয়েছে। তিনি স্মার্ট কৃষি, প্রযুক্তিগত অভিযোজন এবং কৃষির আধুনিকায়নের ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা খাতে আরও কার্যকর বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মালালা ফান্ডের সাবেক কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ মুশাররফ তানসেন শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ বৃদ্ধি সত্ত্বেও এ বরাদ্দ শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল উন্নয়নে কতটা ভূমিকা রাখবে, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞানের বিদ্যমান ঘাটতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মূল চ্যালেঞ্জ বাজেটের আকারে নয়, বরং সম্পদের কার্যকর ব্যবহারে। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল পেতে হলে শেখার মান উন্নয়ন এবং শিক্ষাদানের গুণগত পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হবে।

আরও পড়ুন

×