এডিবির পূর্বাভাস
দক্ষিণ এশিয়ায় এবারও সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকবে বাংলাদেশে
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৮:০৩ | আপডেট: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৮ দশমকি ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ। গত অর্থবছরেও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের চেয়ে বেশি ছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) এমন পূর্বাভাস দিয়েছে। এডিবির এই পূর্বাভাস গত অর্থবছরে বাংলাদেশে যে হারে মূল্যস্ফীতি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সম্প্রতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। গত অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
এডিবি বলেছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এটি চলতি অর্থবছরে বিবিএসের সাময়িক হিসাবে ৩ দশমকি ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় বেশি। বাংলাদেশে গত তিনটি অর্থবছর ধরে প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের আশপাশে ছিল।
এডিওতে বাংলাদেশ বিষয়ে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি খুব দ্রুত বাড়বে না। কারণ ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ঘাটতি এখনও বড় বাধা হয়ে রয়েছে। জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রভাব, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিনিময় হারজনিত চাপের কারণে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকবে।
এডিবির বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান আকিরা মাতসুবাগা বলেন, কঠিন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং সেবা খাতের স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সহায়তা করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, আর্থিক খাতের সুশাসন এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে সংস্কার জরুরি।
মূল্যস্ফীতি কেন অন্যদের চেয়ে বেশি থাকবে
এডিবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার পরোক্ষ প্রভাব চলতি অর্থবছরেও অনুভূত হবে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘর্ষের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে এবং দাম বেড়েছে। বাংলাদেশ আমদানি করা জ্বালানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হওয়ায় এই অভিঘাত সরাসরি দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি, পরিবহন এবং খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে পরিবহন খরচ এবং সার উৎপাদন বা আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে, যা সরাসরি খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দিচ্ছে। সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ার কারণে মালবাহী জাহাজের ভাড়াসহ অন্যান্য লজিস্টিক খরচ বেড়ে যাওয়াও মূল্যস্ফীতি উঁচুতে রাখার একটি বড় কারণ।
তুলনামূলকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে মূল্যস্ফীতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ভারতে ৪ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং নেপালে ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হতে পারে। এমনকি পাকিস্তানের প্রক্ষেপিত মূল্যস্ফীতিও (৮.৩ শতাংশ) বাংলাদেশের চেয়ে কিছুটা কম থাকবে। মূলত অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং জ্বালানি দামের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কারণেই বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি সবার চেয়ে বেশি থাকার শঙ্কা রয়েছে।
ভারতে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম দ্রুত স্বাভাবিক স্তরে ফিরে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা সামগ্রিক মূল্যস্তর কমিয়ে আনবে। নেপালে কৃষিপণ্যের সরবরাহ উন্নত হওয়ায় খাদ্যপণ্যের দাম কমতির দিকে ছিল, যা তাদের গড় মূল্যস্ফীতি সীমিত রাখতে সাহায্য করবে। শ্রীলঙ্কায় আইএমএফ কর্মসূচির আওতায় জ্বালানি মূল্যের সংস্কার এবং খরচ-সাশ্রয়ী নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে। ফলে ২০২৭ সালে সেখানে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ২ শতাংশে থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ভারত ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। প্রতিবেশী পাকিস্তান এবং নেপালের প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে যেসব দেশ পঞ্জিকা বছর অনুসরণ করে, তাদের মধ্যে ভুটান ২০২৭ সালে ৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কা ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেতে পারে। মালদ্বীপের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
- বিষয় :
- এডিবি
- মূল্যস্ফীতি
- বাংলাদেশ