বিসিআইর কর্শমালা
হালাল পণ্যের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি নগণ্য
গতকাল শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিসিআই কার্যালয়ে হালাল পণ্যের বাজার নিয়ে কর্মশালায় এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হােসেন, বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী, ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মােহাম্মদ হাসান আরিফ প্রমুখ বক্তব্য দেন ফটাে রিলিজ
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বের সাড়ে তিন লাখ কোটি ডলারের হালাল পণ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ৮৫ কোটি ডলার। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ হালাল অর্থনীতিকে রপ্তানির নতুন চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে পারে। এজন্য একক হালাল অথরিটি, আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা, আধুনিক পরীক্ষাগার ও সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) আয়োজিত ‘হালাল ফর এক্সপোর্ট ডাইভার্সিফিকেশন’ শীর্ষক কর্মশালায় এমন মত উঠে আসে। বিসিআই বোর্ডরুমে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ। বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হােসেন ও প্রাণ-আরএফএল, প্যারাগন, বেঙ্গল মিট, বোম্বে সুইটস, বিডি ফুডসহ এ খাতের বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধে আইইউবিএটির সহকারী অধ্যাপক ড. মোমিনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ এখন ৮৫ কোটি ডলারের হালাল পণ্য রপ্তানি করছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, বিস্কুট, জুস, মসলা, স্ন্যাকস, হালাল মাংস, ওষুধ ও প্রসাধনী। এসব পণ্যের প্রধান বাজার মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ হালাল পণ্যের বাজারের সম্ভাব্য আকার ১২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা ইন্দোনেশিয়ার পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম।
ড. মোমিনুল বেলেন, বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অংশ হালাল খাদ্য, যার পরিমাণ ৬১ শতাংশ। এছাড়া ইসলামিক ফাইন্যান্স, মুসলিমবান্ধব পর্যটন, পোশাক, ওষুধ ও প্রসাধনী খাতেও দ্রুত সম্প্রসারণ হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য শুধু কৃষি ও খাদ্যপণ্য নয়, ফার্মাসিউটিক্যালস, কসমেটিকস, পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে নতুন রপ্তানি বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। বর্তমানে দেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বিএসটিআই পৃথকভাবে হালাল সনদ দিচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একক সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি জাতীয় হালাল অথরিটি গঠন, সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া একীভূত করা, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার গড়ে তোলা, মালয়েশিয়াসহ সফল দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক স্বীকৃতি চুক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিসিআই সভাপতি বলেন, হালাল পণ্যের রপ্তানি কম হলেও এ খাতের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। কারণ বিশ্বজুড়ে শুধু মুসলিম নয়, অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও স্বাস্থ্য, গুণগত মান ও নৈতিক মানদণ্ডের কারণে হালাল পণ্যে আগ্রহী হচ্ছেন। বাংলাদেশের জন্য এ খাতে বড় সুযোগ রয়েছে।
বিসিআইয়ের পরিচালক ও ইজি ফুডের চেয়ারম্যান জিয়া হায়দার মিঠু বলেন, ‘বিএসটিআই থেকে হালাল সনদ আনতে গেলে তারা টন অনুপাতে কমিশন চায়।’ মহাব্যবস্থাপক খুরশীদ আহমাদ ফরহাদ বলেন, ‘প্রতিটি সনদের জন্য ১৬ থেকে ১৮ লাখ টাকা মাশুল দিতে হয়। এসব সনদ সৌদি আরবে টেকে না। কারণ, তাদের সঙ্গে চুক্তি নেই। বাধ্য হয়ে ভারত, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর থেকে সনদ নিতে হয়।’
বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিরা বলেন, বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বিএসটিআই পৃথকভাবে হালাল সনদ দিচ্ছে। কিন্তু বৈশ্বিকভাবে এই দুটি সংস্থা অনুমোদিত নয়। এতে ব্যবসার খরচ ও জটিলতা বাড়ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করছে। তাই রপ্তানি বাড়াতে এসব সনদ বিনা মূল্যে দিতে হবে।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এখন সময়ের দাবি। হালাল খাত এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ইপিবি ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে। শুধু কৃষিভিত্তিক ও খাদ্যপণ্য নয়, হালাল অর্থনীতির আওতায় আরও বহু ধরনের পণ্য ও সেবার সুযোগ রয়েছে। তবে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ।
কর্মশালায় কিছু সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে–বাংলাদেশকে একটি হালাল হাব হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে ব্র্যান্ডিং করতে হবে। এছাড়া উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় শরিয়াহ, স্বাস্থ্যবিধি ও নৈতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার সুবিধা সম্প্রসারণ, প্রয়োজন হলে বেসরকারি খাতে ল্যাব স্থাপনের সুযোগ দেওয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরসহ সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো এবং গবেষণা ও উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
- বিষয় :
- বিসিআইসি