জ্বালানি তেল আমদানিতে খরচ বেড়ে দ্বিগুণ
ছবি: সংগৃহীত
ওবায়দুল্লাহ রনি
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৫৩ | আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ১০:২৬
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দর। বেড়ে গেছে চাহিদাও। সব মিলিয়ে গত অর্থবছর পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের খরচ হয়েছে প্রায় এক হাজার ৬৪ কোটি ডলার। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর যেখানে আমদানিতে ব্যয় ছিল ৫১৪ কোটি ডলারের কম। এক বছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে খরচ বেড়েছে ৫৫০ কোটি ডলার বা ১০৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছর সব মিলিয়ে আমদানি খরচ হয়েছে সাত হাজার ৫২৪ কোটি ডলার। আগের অর্থবছর যেখানে ব্যয় হয় ছয় হাজার ৮৩৫ কোটি ডলার। সামগ্রিকভাবে গত অর্থবছর আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৬৮৯ কোটি ডলার যা ১০ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিতে মূল ভূমিকা রেখেছে জ্বালানি তেল। গত অর্থবছর শুধু পেট্রোলিয়াম আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ৫৫০ কোটি ডলার।
গত অর্থবছর পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে ৯৪৪ কোটি ডলার খরচ হয়। আগের অর্থবছর যেখানে ব্যয় ছিল ৪৫১ কোটি ডলার। এতে খরচ বেড়েছে ১০৯ শতাংশের বেশি। আর অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে খরচ ৯২ শতাংশ বেড়ে ১২০ কোটি ডলার খরচ হয়েছে। আগের অর্থবছর যা ছিল মাত্র ৬২ কোটি ডলার। গত অর্থবছর জ্বালানি তেল আমদানির এ খরচ এযাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে করোনা অতিমারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতে সর্বোচ্চ ব্যয় হয় ৭৯৯ কোটি ডলার। পরের অর্থবছর কমে ৫৭৭ কোটি ডলারে নেমে যায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছর আবার বেড়ে ৬১৩ কোটি ডলার ব্যয় হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর হামলা শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এতে জ্বালানি তেল আমদানির খরচ অনেক বেড়েছে। দিন যত যাচ্ছে খরচ আরও বাড়ছে। শুধু গত জুন মাসে জ্বালানি তেল আমদানিতে ১৬০ কোটি ৩৩ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে। গত অর্থবছর ১২ মাসে যেখানে গড়ে ব্যয় ছিল ৮৮ কোটি ৬২ লাখ ডলার। জ্বালানি আমদানিতে এত খরচের পরও চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। জ্বালানি তেলের কারণে অনেক শিল্পকারখানায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম একটি কারণ হিসেবে যা বিবেচিত হচ্ছে।
জ্বালানি আমদানিতে এভাবে ব্যয় বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যসহ কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় কমেছে। গত অর্থবছর তেল, চিনি, ডাল, মসলা এবং দুধ ও ক্রিমের মতো ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ব্যয় হয় ৫০৩ কোটি ডলার। আগের অর্থবছর যা ছিল ৫৬৮ কোটি ডলার। ভোগ্যপণ্য আমদানিতে খরচ কমেছে প্রায় ৩৫ কোটি ডলার বা ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া গত অর্থবছর চাল আমদানিতে সাড়ে ২২ শতাংশ খরচ কমে ৫৩ কোটি ডলারের নিচে নেমেছে। আগের অর্থবছর চাল আমদানির ব্যয় ছিল ৬৮ কোটি ডলারের বেশি। গম আমদানিতে ব্যয় ২৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়ে ২০৫ কোটি ডলার হয়েছে। আগের অর্থবছর যেখানে খরচ ছিল ১৬২ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ডলারের দর ১২২ থেকে ১২৪ টাকার মধ্যে রয়েছে। ডলার পেতেও এখন কোনো সমস্যা হচ্ছে না। মূলত উচ্চ রেমিট্যান্সের কারণে এমন হচ্ছে। বৈশ্বিক বাজারে পরিস্থিতি খারাপ না হলে হয়তো আমদানিতে এত খরচ হতো না। তাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও হয়তো বাড়ত। গত সোমবার বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। আর বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। আওয়ামী লীগ পতনের সময় যা ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল। এর আগে ২০২১ সালের আগস্টে সর্বোচ্চ রিজার্ভ ওঠে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। তবে অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়াসহ নানা কারণে কমে যায়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছর তৈরি পোশাক-সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি চার শতাংশ কমে এক হাজার ৭৭০ কোটি ডলারে নেমেছে। অবশ্য অন্য মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি প্রায় ৯ শতাংশ বেড়ে এক হাজার ৯৩৫ কোটি ডলারে উঠেছে। গত অর্থবছর মূলধনি পণ্যের আমদানি ৭ শতাংশের বেশি বেড়ে হয়েছে এক হাজার ২৩ কোটি ডলার। অন্যান্য পণ্য আমদানি ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে হয়েছে ৯৭১ কোটি ডলার।
ব্যাংকাররা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদহার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নানা কারণে এখন আশানুরূপ বিনিয়োগ হচ্ছে না। যে কারণে বেসরকারি খাতের ঋণ ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে, যা এযাবৎকালের সর্বনিম্ন। বিনিয়োগ চাহিদা না থাকা এবং অর্থ পাচারে কড়াকড়ির কারণে ডলার বাজারে স্বস্তি রয়েছে। এই স্বস্তি ধরে রাখতে হলে রেমিট্যান্সের পাশাপাশি রপ্তানি আয় বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান বাড়াতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। এ ছাড়া কোনোভাবেই যেন আগের মতো অর্থ পাচার না হয় সে বিষয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে হবে।