ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি
সিদ্ধান্তের চেয়ে কার্যকারিতাই বড় প্রশ্ন নয় কি
সেলিম রায়হান
সেলিম রায়হান
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:৫৪ | আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৭:১৭
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলালে ছয় মাস অপেক্ষা না করে প্রতি তিন মাসে নীতির কার্যকারিতা পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হবে। তবে মুদ্রানীতি কত ঘন ঘন ঘোষণা করা হচ্ছে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সেই নীতি অর্থনীতিতে কতটা কাজ করছে।
বর্তমান মুদ্রানীতিতে নীতিসুদ ৯.৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। সিদ্ধান্তটির যুক্তি আছে। আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮.২৬ শতাংশে নেমে এলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৩২ শতাংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির চাপ। ফলে এখনই সুদের হার আরও কমানো হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি ছিল।
কিন্তু এখানে একটি বড় নীতিগত দ্বন্দ্ব রয়েছে। উচ্চ সুদের হার বজায় রেখেও মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামানো যাচ্ছে না, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়েছে। আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ। ব্যাংকিং ব্যবস্থার একাংশে যথেষ্ট তারল্য থাকার পরও সেই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকও স্বীকার করেছে, নীতিসুদের প্রভাব বাজারের সুদহারে পড়লেও বেসরকারি ঋণ ও প্রকৃত অর্থনীতিতে তার সঞ্চালন দুর্বল।
এ কারণেই এবারের মুদ্রানীতিতে ব্যাংক খাতের সংস্কার আরও কেন্দ্রীয় জায়গা পাওয়া উচিত ছিল। মুদ্রানীতি বিবৃতিতে ব্যাংক খাতের সংকট এড়িয়ে যাওয়া হয়নি। খেলাপি ঋণের হার ৩২.৭৮ শতাংশে পৌঁছানো, মূলধনের ক্ষয় এবং ব্যাংকগুলোর মধ্যে তারল্যের অসম বণ্টনের কথা স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে। কিন্তু সমস্যার স্বীকৃতি এবং তাকে নীতির কেন্দ্রে রাখা এক বিষয় নয়। দুর্বল ব্যাংক, বিপুল খেলাপি ঋণ এবং ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলার অভাব থাকলে নীতিসুদের পরিবর্তন দিয়ে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত ফল আনা কঠিন।
তাই শুধু সুদের হার নিয়ে আলোচনা যথেষ্ট নয়। খেলাপি ঋণের কার্যকর নিষ্পত্তি, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে কঠোর শৃঙ্খলা এবং ব্যাংক তদারকির বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারের ব্যাংকঋণ নির্ভরতা কমানো এবং রাজস্বনীতি, বিনিময় হার ও মুদ্রানীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতির সূচনা ইতিবাচক। তবে তিন মাস পরপর নীতি ঘোষণা করাই সাফল্য নয়। আসল পরীক্ষা হবে মূল্যস্ফীতি কমানোর পাশাপাশি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক করা। ব্যাংক খাতের গভীর সংস্কার ছাড়া সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিনই থেকে যাবে।
লেখক: অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম
- বিষয় :
- মুদ্রানীতি
- বাংলাদেশ ব্যাংক