বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির ঘোষণা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে ওয়েলথ অ্যান্ড রিটেইল ব্যাংকিং (ডব্লিউআরবি) ব্যবসা বিক্রির সম্ভাবনা যাচাইয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। গতকাল বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।
এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ব্যক্তিগত ঋণ, শাখা ব্যাংকিং, ইসলামী ব্যাংকিং এবং কার্ড সেবাসহ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হলো। তবে সম্ভাব্য এই হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত গ্রাহকসেবা এবং দৈনন্দিন ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক নিয়মেই চলবে বলে ব্যাংকটি নিশ্চিত করেছে।
এদিকে গতকালই রিটেইল গ্রাহকদের ই-মেইলে এক বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। ব্যাংকটির ওয়েলথ অ্যান্ড রিটেইল ব্যাংকিং বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান লুৎফুল হাবিবের পাঠানো ওই বার্তায় গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে বলা হয়, এ সিদ্ধান্তের কোনো তাৎক্ষণিক প্রভাব তাদের ওপর পড়বে না।
সূত্র জানায়, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের লাভজনক রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসাটি কিনে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় ছয় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। আগ্রহী ব্যাংকের তালিকায় আছে– ব্র্যাক, সিটি, পূবালী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ঢাকা এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। আগ্রহী কয়েকটি ব্যাংক ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক ও আর্থিক তথ্য বিনিময়ের লক্ষ্যে অপ্রকাশযোগ্য চুক্তি (এনডিএ) স্বাক্ষর করেছে এবং বাকি ব্যাংকগুলোও চুক্তি স্বাক্ষরের আগ্রহ প্রকাশ করে চিঠি পাঠিয়েছে।
মূলত স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ও সচ্ছল গ্রাহকভিত্তি, বড় অঙ্কের স্বল্প সুদের আমানত এবং শক্তিশালী ক্রেডিট কার্ড পোর্টফোলিওর কারণেই স্থানীয় ব্যাংকগুলোর কাছে এই ব্যবসাটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
১২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যাংকিং পরিচালনা করা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক মূলত তাদের ব্যক্তিপর্যায়ের খুচরা বা রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে রিটেইল ব্যবসা ছেড়ে দিলেও বাংলাদেশে ব্যাংকটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশে তাদের ‘করপোরেট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং’ (সিআইবি) ফ্র্যাঞ্চাইজি আরও শক্তিশালীভাবে পরিচালনা করবে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড জানায়, যেসব ব্যবসায়িক খাতে ব্যাংকের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও অনন্য সেবার সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি কাজে লাগানো সম্ভব, সেসব খাতে কৌশলগত মনোযোগ বৃদ্ধির অংশ হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটি আশ্বস্ত করেছে, এই ঘোষণার কারণে তাদের রিটেইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক কিংবা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রভাব পড়বে না।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এনামুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশে কৌশলগত অগ্রাধিকারকে আমরা আরও সুনির্দিষ্ট করছি, যাতে আমাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, মূলধন প্রবাহ এবং অবকাঠামোগত অর্থায়নের ক্ষেত্রে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখার বিষয়ে তাদের অঙ্গীকার আগের মতোই সুদৃঢ় আছে। চুক্তি প্রক্রিয়া ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদনসাপেক্ষে রিটেইল ব্যবসা হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে আনুমানিক দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগতে পারে। এই সময়ে সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ন্যায্য ও পেশাদার সহায়তার মাধ্যমে কল্যাণ নিশ্চিত করা ব্যাংকটির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার থাকবে বলে নিশ্চিত করেন।
বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিংয়ের ভিত অত্যন্ত শক্তিশালী। ব্যাংকটির ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী– ব্যাংকটির গ্রাহক প্রায় তিন লাখ, যার মধ্যে প্রায় দেড় লাখ গ্রাহক ডিজিটাল চ্যানেলের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে ব্যাংকটির রিটেইল ব্যবসার আওতায় মোট আমানত রয়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। স্ট্যার্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের আমানতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বল্প ব্যয়। এসব আমানতের বড় অংশের বিপরীতে ব্যাংকটিকে সুদ দিতে হয় তুলনামূলক অনেক কম। কম সুদের আমানত স্থানীয় ব্যাংকগুলোর কাছে বড় আকর্ষণ।
আমানতের পাশাপাশি কার্ড ব্যবসাতেও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও অগ্রগামী প্রতিষ্ঠান। রিটেইল পোর্টফোলিওতে ডেবিট কার্ডের পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন প্রিমিয়াম ও রিওয়ার্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড এবং ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অধীনে পরিচালিত ‘সাদিক’ ক্রেডিট কার্ড।
আর্থিক হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকটির রিটেইল ঋণের মধ্যে শুধু ক্রেডিট কার্ডেই ঋণের স্থিতি রয়েছে এক হাজার ৬৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা এবং সাদিক ক্রেডিট কার্ডে রয়েছে আরও প্রায় ৭৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া ব্যক্তিগত ঋণ হিসেবে তিন হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা, গৃহঋণ বাবদ ৯৫০ কোটি টাকার বেশি এবং গাড়ি ঋণসহ তাদের রিটেইল গ্রাহকদের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ছয় হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা, যা এসএমই ঋণসহ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকায়। বর্তমানে ব্যাংকটির ১৮টি শাখা ও একটি ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো রয়েছে এবং এতে কাজ করছেন প্রায় দেড় হাজার কর্মী।
রিটেইল ব্যাংকিং বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু করলেও সার্বিক আর্থিক সক্ষমতায়ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড অত্যন্ত শক্ত অবস্থানে আছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ছিল তিন হাজার ২১৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যা বাংলাদেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের মধ্যে একক ব্যাংক হিসেবে অর্জিত সর্বোচ্চ মুনাফা।
- বিষয় :
- স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক