অর্থনীতি উচ্চ দারিদ্র্য ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির ফাঁদে আটকে গেছে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩৩ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের অর্থনীতি উচ্চ দারিদ্র্য এবং নিম্ন বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির ফাঁদে আটকে গেছে। দারিদ্র্য কমার বদলে বাড়ছে। মধ্যবিত্ত আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে বহু পরিবার। যার ফলে আয়বৈষম্য অনেক বেড়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগের মতো মানুষকে দ্রুত দারিদ্র্যমুক্ত করতে পারছে না। এ পরিস্থিতিকে শুধু ভূরাজনৈতিক কিংবা বিশ্ব অর্থনীতির অভিঘাতের কুফল বলার সুযোগ নেই।
গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ফ্ল্যাগশিপ প্রকাশনা ‘স্টেট অব দ্য রিয়েল ইকোনমি: ডায়নামিকস অব রিভার্সালস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’-এর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা। গতকাল শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে পিপিআরসির পক্ষ থেকে এ আয়োজন করা হয়।
বইটি যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এবং সংস্থার জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী নামিরা শামীম। গত বছর আট হাজার ৬৭ খানার জরিপের ওপর ভিত্তি করে বইটি লেখা হয়েছে। জরিপের ফল সে সময় প্রকাশ করা হয়।
বইটিতে পিপিআরসির জরিপের মৌলিক কিছু তথ্য দিয়ে বলা হয়, ২০২৫ সালে দারিদ্র্য বেড়ে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ হয়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। চরম দারিদ্র্য ৫ দশমিক ৬ থেকে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ব্যয়ভিত্তিক জিনি সহগ বেড়েছে শূন্য দশমিক ৪৩৬, যা বৈষম্য বাড়ার ইঙ্গিত। প্রায় ১৮ শতাংশ খানা, অর্থাৎ তিন কোটি ১০ লাখ মানুষ ‘ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত’। তারা দারিদ্র্যসীমা ও মধ্যম আয়ের স্তরের মাঝামাঝি থাকলেও স্থবির আয়, ব্যয়ের চাপ ও অর্থনৈতিক ধাক্কায় যে কোনো সময় নিচে নামতে পারেন। খানার গড় মাসিক আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা, ব্যয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা; উদ্বৃত্ত মাত্র ৭০ টাকা। ব্যয়ের ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ যায় খাদ্যে, গড় ঋণ সঞ্চয়ের চেয়ে ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। প্রায় অর্ধেক পরিবারে অন্তত একজন দীর্ঘস্থায়ী রোগী রয়েছেন। ফলে ওষুধ ও চিকিৎসায় নিয়মিত খরচ বাড়ছে। কর্মজীবীদের ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার কম কাজ করেন।
আলোচনায় ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দারিদ্র্যের উল্টো প্রবণতা ও মধ্যবিত্তের ক্রমবর্ধমান ভঙ্গুরতা নিয়ে পিপিআরসি ও বিশ্বব্যাংকের তথ্যে মিল পাওয়া গেছে। অর্থনীতি শুধু ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধাক্কায় বন্দি নয়। এটি উচ্চ দারিদ্র্য, নিম্ন বিনিয়োগ ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির কাঠামোগত ফাঁদে আটকে গেছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা পেতে হয়রানির কথায় জরিপ থেকে তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ খানা স্বাস্থ্যসেবায় হয়রানির কথা জানিয়েছে। আর ৭৪ দশমিক ৬ শতাংশের
মতে টাকা না দিলে কিছুই হয় না। হোসেন জিল্লুর বলেন, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শাসন হয়রানিমুক্ত করতে হবে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও সংস্কারহীন প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত ফাঁদ অবিলম্বে স্বীকার করে নেওয়াটা উত্তম। অর্থনৈতিক গণতন্ত্র, নতুন প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি, মানসম্মত শিক্ষা, উৎপাদনশীলতার রূপান্তর এবং দ্রুত ফলের জন্য শাসন ব্যবস্থার সংস্কার– পাঁচ স্তম্ভের একটি সমন্বিত রূপান্তর সমঝোতার পরামর্শ দেন তিনি।
আলোচনায় বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জঁ পেম বলেন, ‘অর্থনীতির সামনে থাকা প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাণিজ্য, সরকারি অর্থায়ন ও জ্বালানি দক্ষতায় অবিলম্বে কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে আয়বৈষম্য দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগের মতো মানুষকে দ্রুত দারিদ্র্যমুক্ত করতে পারছে না, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও দেখা যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, ২০ বছর ধরে তৈরি পোশাক খাত ছাড়া অন্য কোনো খাত দাঁড়াতে পারেনি। মোট রপ্তানিতে তৈরি পোশাকের হিস্যা ৭৩-৭৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৪-৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে। কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডিগ্রি এখন আর চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না। তবে এ সংক্রান্ত সেবা সহজ করতে হবে। আজকের ‘জেন-জি’ প্রজন্ম একটি সাধারণ সেবার জন্য সরকারি অফিসে ৩০ থেকে ৪০ বার যাওয়া সহ্য করবে না।
একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, খাদ্যের দাম বাড়ছে, ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তাও নেই। তৈরি পোশাকে নারীর কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান ঠিক রাখতে এখন বিকল্প কৃষি-পরিবেশগত কাজ, শিশু যত্নকেন্দ্র ও লিঙ্গ-সংবেদনশীল বিনিয়োগের ওপর জোর দিতে হবে।
- বিষয় :
- অর্থনীতি