ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সংকটে এলোমেলো পাট খাত

সংকটে এলোমেলো পাট খাত
×

আবু হেনা মুহিব

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ২২:৩৯

নানামুখী সংকটে এলোমেলো হয়ে পড়েছে দেশের পাট খাত। প্রতি মাসেই কাঁচাপাটের রপ্তানি বাড়ছে। অথচ পাটের অভাবে ৭০টির মতো মিল বন্ধ রয়েছে। চালু থাকা পাটকলগুলোতেও সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন হচ্ছে। কাঁচাপাট মিললেও দাম অস্বাভাবিক। তাই উৎপাদিত পণ্যের দাম পড়ে যাচ্ছে বেশি। এতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টেকা মুশকিল হয়ে পড়ছে উদ্যোক্তাদের। যে কারণে পাটপণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি দুটিই কমছে। বিদেশি ব্র্যান্ড এবং ক্রেতারা বিকল্প খুঁজছেন। ফলে নতুন রপ্তানি আদেশও প্রায় বন্ধ।

কাঁচাপাট পাচার ও অবৈধ মজুতের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পাটকল মালিকরা। সম্প্রতি পাট খাতের তিন সংগঠন বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমএ), জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ) ও জুট অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএ) যৌথ সভায় এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। ওই সভায় পাট খাতের উদ্যোক্তারা অভিযোগ করেন, বেশি মুনাফার উদ্দেশ্যে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রেখেছেন কিছু ব্যবসায়ী। তাদের অবৈধ মজুতের কারণে বাজারে চাহিদা অনুসারে পাট পাওয়া যাচ্ছে না। দরও অস্বাভাবিক বেশি।

এদিকে, মজুতদারি ঠেকাতে বাজারে অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়ে উদ্যোক্তারা ইতোমধ্যে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সরকারের অন্যান্য বিভাগেও যোগাযোগ করছেন তারা।

উদ্যোক্তারা বলেন, সাধারণত পাটকলে তিন শিফটে উৎপাদন চলে। কাঁচাপাটের সংকটে চালু থাকা বেশিরভাগ পাটকলের উৎপাদনই এখন এক শিফটে নেমে এসেছে। হাতে থাকা পাট দিয়ে আগামী মাস পর্যন্ত উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। এরপর কী হবে তা কেউ জানেন না। তারা জানান, গত পাটের মৌসুমে কাঁচাপাটের মণপ্রতি দর ছিল গড়ে দুই হাজার টাকা। এখন বিক্রি হচ্ছে গড়ে তিন হাজার ৬০০ টাকায়। কৃষকের হাত থেকে পাট ছেড়ে দেওয়ার পরই দাম বেড়েছে। সাধারণত আষাঢ়-শ্রাবণের মধ্যেই পাট বিক্রি করে দেন চাষি।

জানতে চাইলে বিজেএমএর চেয়ারম্যান আবুল হোসাইন সমকালকে বলেন, কাঁচাপাটের নৈরাজ্যের অনেকগুলো কারণ রয়েছে। প্রথমত, অবৈধ মজুতে পাট ধরে রেখেছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। পাচারের মাধ্যমেও দেশ থেকে পাট চলে যাচ্ছে। কাঁচাপাট রপ্তানিও বন্ধ করা হয়নি। আবার পাট খাতের উদ্যোক্তাদের একটা অংশের কারণেও সংকট বেড়েছে। মণপ্রতি তিন হাজার টাকার ওপরে কাঁচাপাট না কেনার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলেও কিছু উদ্যোক্তা বেশি দামে পাট কিনছেন। তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে অবৈধ মজুত ঠেকাতে কোনো অভিযান নেই। হাতের পাট শেষ হয়ে যাওয়ার পর মার্চ থেকে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া দ্বিতীয় আর কোনো পথ দেখছেন না তারা। মূলত সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ হওয়ার পরই পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করে। সরকারি পাটকলে সরবরাহের স্বার্থে পাটের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রচেষ্টা ছিল।

বিজেএমএ ও বিজেএসএর তথ্যমতে, পাটের সংকটে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কাঁচাপাটের ব্যবহার কমেছে আট শতাংশ। চলতি অর্থবছরের চার মাসে চার লাখ ৬১ হাজার বেল পাট ব্যবহার হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল প্রায় পাঁচ লাখ বেল। এ ছাড়া কাঁচাপাটের অভাবে পাটপণ্যের উৎপাদন কমেছে ১৩ শতাংশ। ৯২ হাজার ৬৮৯ টন থেকে নেমে এসেছে ৮১ হাজার ৯৯৭ টনে। এর আগে, প্রতি বছর গড়ে ১০ থেকে ১১ লাখ টনের মতো উৎপাদন হয়ে আসছিল।

উৎপাদন কমে যাওয়ায় পাটপণ্যের রপ্তানিও কমেছে। অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রপ্তানি কমেছে ২৩ শতাংশেরও বেশি। আগের একই সময়ের তুলনায় পাটপণ্যের রপ্তানি কম হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টন। সাধারণত বছরে সাত থেকে আট লাখ টন পাটপণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে। আগামী মাসগুলোতে রপ্তানির পরিসংখ্যানটি আরও উদ্বেগজনক হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।

বিজেএমএর মহাসচিব আব্দুল বারেক খান সমকালকে বলেন, যতই দিন যাচ্ছে সমস্যা তত প্রকট হচ্ছে। ২০২০ সালে একবার এ রকম সংকট হয়েছিল। পরিস্থিতি পাল্টাবে সে আশায় লোকসান গুনে উৎপাদন চালিয়ে নিয়েছেন কেউ কেউ। অনেকে পাটকল বন্ধ করে দিয়েছেন। গত বছর পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসে। তবে বন্ধ পাটকল আর উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। ওই সময় থেকে এ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে ৭০টি পাটকল। বিজেএমএর মোট কারখানা ২০২টি। এখন ১৩২টি উৎপাদনে আছে। পাটকলগুলোর দুই-তৃতীয়াংশ লুমস বা তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, গত জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত অর্থবছরের সাত মাসে পাটের বস্তার রপ্তানি আগের একই সময়ের চেয়ে কম হয়েছে ২৪ শতাংশ। পাটের সুতার রপ্তানি কমেছে ১৭ শতাংশ। অথচ একই সময়ে ৩৯ শতাংশেরও বেশি হয়েছে কাঁচাপাট রপ্তানি।

আরও পড়ুন

×