ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

অতীতের পুনরাবৃত্তি চাই না

অতীতের পুনরাবৃত্তি চাই না
×

এম হাফিজউদ্দিন খান

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:৪৮

গণতন্ত্রে নির্বাচন মানেই উৎসব। কিন্তু আমাদের ব্যবস্থাপনাগত নানাবিধ ত্রুটি, নির্বাচন কমিশন ঘিরে আস্থার সংকট ইত্যাদি বিষয়ে গণতন্ত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ নির্বাচন নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা স্বস্তির নয়। এই অভিযোগ নতুন নয়, বিভক্ত ঢাকায় এ পর্যন্ত তিনটি পর্বে যে মেয়র নির্বাচন হয়েছে; প্রত্যেকটিতেই ক্ষুণ্ণ হয়েছে ভোটারের ভোটাধিকার। এমন প্রেক্ষাপটে এবারের ঢাকা সিটি নির্বাচন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এই নির্বাচন ঘিরে জনপ্রত্যাশা ও শঙ্কাও রয়েছে। রাজধানীর দুই সিটি নির্বাচনের নিরাপত্তা কৌশল নির্ধারণে ২২ জানুয়ারি আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বৈঠকে সিইসি বলেছেন, 'কোনো রকম অনিয়ম-গাফিলতি সহ্য করব না।' নির্বাচনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে নির্বাচনে একাধিক মামলার আসামি প্রার্থী হওয়ায় (কাউন্সিলর পদে) উদ্বেগও প্রকাশ করা হয়। তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে রয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। তবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও ভোটের আগে কোনো প্রার্থী গ্রেপ্তার হন- এটা ইসি চায় না।

সিইসি ওই বৈঠকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রয়োজনে যে দৃঢ় অবস্থানের কথা ফের ব্যক্ত করেছেন, তা স্বস্তির বিষয় হলেও এ ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। প্রশ্নমুক্ত, স্বচ্ছ নির্বাচন জনদাবি। আমরা সবাই তা-ই চাই। কিন্তু আমাদের এই প্রত্যাশা বারবার হোঁচট খেয়েছে, শঙ্কা তাড়া করেছে। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং নির্বাচনের ক্ষেত্রে তারাই সর্বেসর্বা। সংবিধান অনুযায়ী তাদের হাতে যেটুকু ক্ষমতা রয়েছে, এর যথাযথ প্রয়োগ ও সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতাবলে তারা যদি নির্মোহ অবস্থান নিয়ে দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে নিষ্ঠ থাকে, তাহলে প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন করা মোটেও যে দুরূহ নয়- এ দৃষ্টান্ত তো আমাদের দেশেই রয়েছে।

নির্বাচন কমিশন আস্থার সংকটে রয়েছে- এটিই হলো বাস্তবতা। শুধু তাই নয়, তাদের কার্যক্রম কখনও কখনও জিজ্ঞাসারও প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। এবার ঢাকা সিটি নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণের সময় তারা যেসব বিষয় আমলযোগ্য মনে না করে উপরন্তু দায়িত্বহীন কথাবার্তা বলেছে, তাতে তাদের ভূমিকা ফের প্রশ্নবিদ্ধ হয়। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের তারিখ পেছাতে হলো সরস্বতী পূজার কারণে। পেছাতে হলো এসএসসি পরীক্ষাও। নির্বাচন কমিশনের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের এসব বিষয় আগেই আমলে রাখা কি উচিত ছিল না?

আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, যে কোনো নির্বাচন এলেই সুযোগসন্ধানী মহল, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তাদের হীনস্বার্থ চরিতার্থকরণে নতুন করে ছক কষতে শুরু করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। ইতোমধ্যে ঢাকা সিটি নির্বাচন ঘিরে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তাদের অনুসারীদের তৎপর হয়ে ওঠার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত হয়েছে। কেবল নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশের স্বার্থেই নয়; সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বার্থেও এমন অপতৎপরতা চলতে দেওয়া যায় না। এ পরিস্থিতির নিরসন ঘটাতে না পারলে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে বড় বাধা জিইয়ে থাকবেই। হোঁচট খাবে জনপ্রত্যাশা; শঙ্কার দানা পুষ্ট হতে থাকবে। এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে প্রয়োজন নির্বাচন কমিশনের দৃঢ়তা, নির্মোহ অবস্থান, সরকারের সদিচ্ছা, প্রশাসনের যথাযথ ভূমিকা, রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার; একই সঙ্গে নির্বাচনে অংশীজনেরও সদিচ্ছা। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও প্রশ্ন রয়ে গেছে। নির্বাচনে অংশীজনরা নিজ নিজ কৌশল নির্ধারণ করে প্রচার চালাবেন, ভোটারদের তাদের প্রতি আকৃষ্ট করতে চেষ্টা করবেন; এগুলো স্বাভাবিক বিষয়। প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে মতের অমিল থাকবে; তাও স্বাভাবিক। কিন্তু নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা তো অস্বাভাবিক।

২১ জানুয়ারি ঢাকা উত্তরের মেয়র পদপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল তার কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে যখন গাবতলী এলাকায় প্রচারাভিযান চালাচ্ছিলেন, তখন তার ওপর হামলার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত হতে দেখা গেছে। এ ক্ষেত্রে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগও শোনা গেছে। তবে যে বিষয়টি উদ্বেগের তা হলো, বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের ওপর এর আগেও হামলার চেষ্টা হয়েছে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এ বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেছেন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বলে। এমন মন্তব্য অনাকাঙ্ক্ষিত। বরং তিনি যদি তার প্রতিদ্বন্দ্বীর ওপর হামলার ব্যাপারে সহানুভূতি প্রকাশ করতেন, তাহলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও সংস্কৃতির জন্য তা হতো সহায়ক। নির্বাচনের পরিবেশ রক্ষার মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন ও সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের হলেও নির্বাচনে অংশীজনের দায়ও কম নয়। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যও সুখকর নয়। আমরা নির্বাচনী আচরণবিধির ক্ষেত্রে শুরু থেকেই যে পরিস্থিতি লক্ষ্য করছি, তা সন্তোষজনক নয়। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা যে ঘটছে, তা তো উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপে আরও স্পষ্ট হলো। পোস্টারের ক্ষেত্রে যা দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠেছে, তাও আচরণবিধির লঙ্ঘন। আমরা কোনোভাবেই অতীতের পুনরাবৃত্তি চাই না। ভোটাররা যাতে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগে কোনো প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতার মুখে না পড়েন, তা নিশ্চিত করার দায় নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরও জরুরি বিষয় হলো, অংশীজনের সমানাধিকার নিশ্চিত করা। যদি সমতল ভূমি নিশ্চিত না হয়, তাহলে তা অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় রকমের প্রতিবন্ধক হয়েই থাকবে। খোদ নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ডই যদি হয় প্রশ্নবিদ্ধ, তাহলে স্বচ্ছ নির্বাচনের প্রত্যাশা দুরাশার নামান্তর।

আমরা সুজনের (সুশাসনের জন্য নাগরিক) পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য চেয়েছিলাম। তারা তা দেয়নি। পরবর্তী সময়ে আমরা এজন্য উকিল নোটিশ পাঠিয়েছি। প্রশ্ন হচ্ছে- কেন এসব ক্ষেত্রে লুকোচুরি থাকবে? প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ঢাকা সিটি নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। আমরাও তা-ই চাই। তবে এর পরও 'কিন্তু' থেকেই যাচ্ছে। এই 'কিন্তু' আগে দূর করতে হবে।

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) এবার ভোট হবে- এ বিষয়টি কৌতূহলোদ্দীপক হলেও এ নিয়ে সংশয়মূলক কথাবার্তা নানা মহলে চলছেই। অনেক উন্নত দেশেও এ পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন আছে। তাছাড়া আমরা এ ক্ষেত্রে সর্বাংশে কতটা দক্ষতা-সক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছি- এ প্রশ্নও উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই। ভোটপর্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ও বিজিবি থাকবে। তবে ইভিএম পরিচালনায় কারিগরি সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে দু'জন সেনাসদস্য থাকবেন। সব কেন্দ্রে নতুন এই পদ্ধতি চালু করতে যে প্রস্তুতি-আয়োজন রয়েছে, তা আমাদের সংশয়মুক্ত করতে পারছে না। এই শঙ্কাও অমূলক নয় যে, এই পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে আবার কোনো আস্থার সংকট সৃষ্টি হয় কিনা! এসব প্রেক্ষাপটে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করা ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইসি এই চ্যালেঞ্জে জয়ী হয়ে হূত আস্থা পুনরুদ্ধারে কতটা সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারবে- এর উত্তর দেবে ভবিষ্যৎ।

এ কথা স্মরণে রাখতে হবে, নির্বাচন প্রক্রিয়া বলতে শুধু ভোটের দিনকেই বোঝায় না। তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত রয়েছে নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া। এই নির্বাচন কেমন হবে, এখনই তা বলে দেওয়া যাবে না। আমাদের শুভ প্রত্যাশা যেন মাঠে মারা না যায়; নির্বাচন কমিশন যেন তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে হোঁচট না খায়। তারা যেন কারও আজ্ঞাবহ না হয়। সরকার যেন যথার্থই সহযোগী শক্তি হিসেবে কাজ করে।

বিদায়ী বছরের ২৫ ডিসেম্বর রাজধানীর নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ভবনে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ উদ্বোধনকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেছিলেন, এই নির্বাচন হবে তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। তার এই প্রত্যয় আমাদের মনে আছে। আমরা দেখতে চাইব, তার নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন আস্থার সংকট কাটিয়ে কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা; সভাপতি সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন

আরও পড়ুন

×