ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে তো?

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে তো?
×

ড. বদিউল আলম মজুমদার

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:৫০

নতুন বছরের শুরুতেই আমরা এক নির্বাচনী আমেজের মধ্যে রয়েছি। আমাদের দ্বারে কড়া নাড়ছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন। আগামীকাল ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই নির্বাচন, যে নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে ৭৪৯ জন প্রার্থী (দক্ষিণে ৪১৪ জন, উত্তরে ৩৩৫ জন) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

কারসাজিপূর্ণ একাদশ জাতীয় নির্বাচন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন উপজেলা নির্বাচনের পর এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ নির্বাচন। বিশেষ করে কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থার ঘাটতি নিরসনে ও জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণের জন্য এই নির্বাচনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনের জন্য এটি একটি অগ্নিপরীক্ষা। কিন্তু কমিশনের গৃহীত কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয় না যে- সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এই নির্বাচন আয়োজনে কমিশনের সদিচ্ছা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা রয়েছে। আমাদের এই আশঙ্কার কিছু কারণ রয়েছে।

আশঙ্কার একটি কারণ হলো- আচরণবিধি লঙ্ঘন রোধে কমিশনের অকার্যকারিতা। আমরা দেখেছি, মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন থেকেই মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা আচরণবিধি ভঙ্গ করে আসছেন। তারা মিছিল করে বা নিয়ম-বহির্ভূতভাবে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ নিয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। পরবর্তীকালে কোনো কোনো মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর বিরুদ্ধে মিছিল করা, নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে শব্দযন্ত্র ব্যবহার, ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রচার, গাড়িবহর ব্যবহার, মোটরসাইকেল বহর ব্যবহার, রাতের আঁধারে ক্যাম্প ভেঙে দেওয়া, নির্বাচনী প্রচারকালে অন্য দলের প্রার্থীর ওপর হামলা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ ওঠে। দুই সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ডে ৪৩ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করলেও আচরণবিধি ভঙ্গের ব্যাপারে তাদের কোনো তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়নি। আচরণবিধি লঙ্ঘনে কমিশন দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নিলে গাবতলীতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের ওপর হামলা ও গোপীবাগে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা এড়ানো যেত। সবচেয়ে হতাশাব্যঞ্জক হলো- একজন নির্বাচন কমিশনারের মতে, আসন্ন নির্বাচন সম্পর্কে কমিশনের সভায় কোনো আলোচনাও হয় না। অর্থাৎ নির্বাচনী আচরণবিধি রোধসহ নির্বাচন সংশ্নিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে তারা যেন নির্বাক!

আমরা মনে করি, আচরণবিধি লঙ্ঘন রোধ করতে না পারার পেছনে কমিশনের সদিচ্ছা ও দৃষ্টিভঙ্গিই মূলত দায়ী। কারণ তারা কমিশনকে অনেকটা 'পোস্ট অফিস' হিসেবে দেখেন। তারা মনে করেন, স্বপ্রণোদিত হয়ে কোনো আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে উদ্যোগ নেওয়া তাদের দায়িত্ব নয়। তাদের মতে, কোনো বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিতে হলে আগে কমিশনের কাছে অভিযোগ করতে হবে। কমিশনের সদস্যরা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীন সাংবিধানিক পদে আসীন এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে যে কমিশন সুপ্রিম কোর্টের ব্যাখ্যা অনুযায়ী প্রয়োজনে নির্বাচনী বিধিবিধানের সঙ্গে সংযোজনও করতে পারে, তা তারা অনুধাবন করতে পারছেন না।

আশঙ্কার আরেকটি দিক হলো, রাজনৈতিক মতৈক্য ছাড়াই ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণে কমিশনের সিদ্ধান্ত। ইভিএম যন্ত্র নিয়ে জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের আস্থার সংকট রয়েছে, আস্থার সংকট রয়েছে যন্ত্রটি ব্যবহারকারী নির্বাচন কমিশনের ওপর। জনগণের সন্দেহের কারণ হলো, ইভিএমকে বিভিন্নভাবে 'কেলিব্রেট' বা নির্দেশনা দিয়ে বা কারসাজি করে নির্বাচন কমিশন যে বিশেষ দলের প্রার্থীকে জিতিয়ে দেবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? তাছাড়া আধুনিক ইভিএমে ভোটার ভেরিফায়েবল পেপার অডিট ট্রেইল (ভিভিপিএটি) থাকে; যা ব্যবহার করে ভোটাররা যাকে ভোট দিয়েছিলেন, তার পক্ষে ভোট পড়েছে কিনা তা নিশ্চিত হতে পারেন এবং প্রয়োজনে ভোট পুনর্গণনাও করা যেতে পারে। কিন্তু টেকনিক্যাল ও উপদেষ্টা কমিটির সুপারিশ সত্ত্বেও আমাদের ইভিএমের সঙ্গে 'ভিভিপিএটি' যুক্ত করা হয়নি; যার ফলে ওই কমিটির উপদেষ্টা জামিলুর রেজা চৌধুরী কমিটির সুপারিশে স্বাক্ষর করেননি। 'ভিভিপিএটি' যুক্ত না করায় কমিশন যে ফলাফল ঘোষণা করবে, তা-ই মেনে নিতে হবে। কারণ ভোট পুনর্গণনার মাধ্যমে তা যাচাই করার কোনো সুযোগ থাকবে না। আরেকটি বিষয় হলো, ইভিএমে ভোটারদের বায়োমেট্রিক্স বা আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে ভোট দিতে হয়। যদি আঙুলের ছাপ মেশিন পড়তে না পারে, তাহলে নির্ধারিত নির্বাচনী কর্মকর্তা ১ শতাংশ ভোটারের বায়োমেট্রিক্স ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা 'ওভাররাইড' বা বাদ দিতে পারেন। কিন্তু যে কমান্ড দিয়ে এ ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করা যায়, আরেকটি কমান্ড দিয়ে তা খুলে দেওয়া যায়। তাই ভোটার, এজেন্ট ও গণমাধ্যমের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনী কর্মকর্তা এ ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার পছন্দের প্রার্থীকে জিতিয়ে দিতে পারেন।


দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের ফলে বাংলাদেশে নির্বাচনে হলফনামা জমাদানের বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর উদ্দেশ্য হলো, ভোটারদের ক্ষমতায়িত করা, যাতে তারা জেনেশুনে-বুঝে সঠিক প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের মতে, '...নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হবে যদি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে ভোটাররা না জানে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের আয়কর বিবরণী ও কর পরিশোধের তথ্য প্রদান করা হয়নি; যদিও জাতীয় নির্বাচনসহ অতীতে অনুষ্ঠিত সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তথ্যগুলো প্রকাশ করা হয়েছিল। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত 'সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন পরিচালনা ম্যানুয়েলেও' (২০১৯ সংস্করণ) ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশের কথা বলা আছে। প্রার্থীদের আয়কর বিবরণী ও কর পরিশোধের তথ্যগুলো ওয়েবসাইটে প্রকাশ এবং প্রাপ্তির ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিবকে সুজন-এর পক্ষ থেকে দুই দুইবার চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু তথ্যগুলো ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি এবং চিঠির উত্তরও দেওয়া হয়নি। পরবর্তীকালে গত ২২ জানুয়ারি ২০২০-এ সুজন সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান এবং আমি নিজে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সিনিয়র সচিবের কাছে প্রার্থীদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশের আবেদন জানিয়ে ২৪ ঘণ্টার সময় দিয়ে একটি উকিল নোটিশ প্রেরণ করি। প্রার্থীদের আয়কর বিবরণী তথ্য নিয়ে কমিশনের এই লুকোচুরির কারণ আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।

আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি, অনেক প্রার্থীই হলফনামায় বিভিন্ন তথ্যের ছক ফাঁকা রেখেছেন। কিন্তু হলফনামা যাচাই করে সংশ্নিষ্ট প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়নি। দু'জন হেভিওয়েট মেয়র প্রার্থীর বিরুদ্ধে তথ্য গোপন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদানের অভিযোগ উঠলেও কমিশন তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। উল্লেখ্য, অনেক কাউন্সিলর প্রার্থী হলফনামার সঙ্গে আয়কর বিবরণীর পরিবর্তে এনবিআরের প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এরূপ অসম্পূর্ণ তথ্য জমাদানের কারণে প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার কথা। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

প্রসঙ্গত, ভোটারদের কাছে প্রার্থীদের স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের অংশ হিসেবে আমরা সুজন-এর পক্ষ থেকে নিকট অতীতের সব নির্বাচনে প্রার্থীদের নিয়ে 'জনগণের মুখোমুখি অনুষ্ঠানে'র আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু বহু চেষ্টার পরও রাজনৈতিক দলগুলোর অসহযোগিতার কারণে আমরা এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারিনি। এই ব্যর্থতার ফলে ভোটাররা তাদের সম্ভাব্য প্রতিনিধিদের সম্পর্কে জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেন।

গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে ঢাকায় বিশেষ অভিযান নামবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আমাদের আশঙ্কার আরেকটি দিক হলো, বিগত কয়েক বছরে বহুসংখ্যক বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলা দায়ের করা হয়েছে। আগের নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের মনে কতগুলো প্রশ্ন উদয় হচ্ছে :বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে বিরোধী পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে মাঠছাড়া করে ফেলা হবে না তো? গ্রেপ্তার আতঙ্ক এড়িয়ে বিরোধী পক্ষের কর্মী-সমর্থকরা নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন তো? বিরোধী পক্ষের নির্বাচনী এজেন্টরা কেন্দ্রে অবস্থান করতে পারবেন তো? নাকি গাজীপুর সিটি নির্বাচনের মডেল অনুসরণ করে এজেন্টদের পুলিশ কর্তৃক উঠিয়ে নেওয়া হবে বা চাপ প্রয়োগ করে তাদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া থেকে বিরত রাখা হবে? নির্বাচনটি অবাধ হবে নাকি খুলনা সিটির মতো নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হবে? সর্বোপরি জনগণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কারও চাপ প্রয়োগ কিংবা বুথের মধ্যে অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের উপস্থিতি ছাড়াই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন? আশা করি, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে কমিশন এসব প্রশ্ন আমলে নেবে।

সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে কমিশন ও রাজনৈতিক নেতাদের সদিচ্ছার অভাবে বিগত অনেক নির্বাচনে ভোটাররা ভোটাধিকার প্রয়োগ করা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং দেশে বর্তমানে নির্বাচনের প্রতি নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের অনীহা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই অবস্থার উত্তরণে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাই আমরা নাগরিকরা খুলনা, গাজীপুর আর বরিশাল সিটির নির্বাচনের মতো আর কোনো জালিয়াতির নির্বাচন দেখতে চাই না। বরং নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে- এই আশায় আমরা বুক বাঁধতে চাই।
 
সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক



আরও পড়ুন

×