ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

তবুও জয় হবে জীবনের

তবুও জয় হবে জীবনের
×

লাভা মাহমুদা

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৩:৫৩

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ভয়াবহ আতঙ্কে কাঁপছে প্রায় সারাবিশ্ব। মধ্য চীনের উহান শহর থেকে উদ্ভূত এ রোগ এখন পুরো বিশ্বকে চোখ রাঙাচ্ছে। চীনা কর্তৃপক্ষ প্রথমে রাখঢাক করলেও পরে রোগের ভয়াবহতা ও তীব্রতার কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং উন্নত দেশগুলোর সহায়তা কামনা করে। ইতোমধ্যে মৃতের সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়েছে এবং পৌনঃপুনিকভাবে এ সংখ্যা বাড়ছে। এক দশক আগে সার্স নামে যে ভাইরাসের সংক্রমণে ৮০০ লোকের মৃত্যু হয়েছিল, সেটিও ছিল এক ধরনের করোনাভাইরাস। ২০১২ সালে মার্স নামের ভাইরাসটিও ৮৫৮ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। বাংলাদেশে এখনও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ না ঘটলেও অন্যান্য দেশের মতো আতঙ্কে কম্পমান প্রায় সবাই। কারণ এত ঘন জনবসতির দেশে মারাত্মক ছোঁয়াচে এই ব্যাধির বিস্তার ঘটলে কতখানি সর্বনাশ ডেকে আনবে, তা চিন্তা করলেও গা শিউরে ওঠে।
করোনাভাইরাসের প্রভাবে মানুষের জীবন হুমকির মুখোমুখি; পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিও টালমাটাল। চীনের সঙ্গে বহু দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে, যা বন্ধের উপক্রম। করোনাভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক এখনও আবিস্কৃৃত হয়নি, যদিও প্রতিষেধক তৈরির সর্বাত্মক চেষ্টা শুরু হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের অনুমান, প্রতিষেধক তৈরি করা গেলেও সময় লাগতে পারে ছয় মাস থেকে এক বছর। স্বাভাবিকভাবেই এই সময়ে উহান, হুবেই তথা পুরো চীন পৃথিবীর ভয়ের কারণ হয়ে থাকবে। আর এই ভীতির কারণে একদিকে যেমন চীনের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি মন্থর হবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির গতিও। বিশ্নেষকরা বলছেন, এ বছরের প্রথম প্রান্তিকে চীনের প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ কমে যেতে পারে। অথচ করোনাভাইরাসের আবির্ভাবের আগে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ শতাংশ। এ ভাইরাসের কারণে চীন তথা বিশ্ব অর্থনীতি যে প্রবল ধাক্কা খাবে, তাতে সন্দেহ নেই। তবে সার্স ভাইরাসের অভিজ্ঞতা আমলে নিয়ে বলা যায়, এ ধরনের সংকট কাটিয়ে ওঠার পরপরই চীনা অর্থনীতিতে বড় রকমের উল্লল্ফম্ফন দেখা যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। কিন্তু এই আশাবাদ মূলত করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানো ও তা কার্যকর প্রতিরোধের ওপর নির্ভরশীল। হুমকিতে রয়েছে আমাদের অর্থনীতিও। সেফটি পিন থেকে শুরু করে বড় বড় মেশিন, মসলা, কৃষিজাত খাদ্য, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, মিনারেল ওয়াটার, তেল, বলপয়েন্ট কলম, ফেসিয়াল টিস্যু পর্যন্ত ১৮১ ধরনের পণ্য এ দেশে আমদানি করা হয় চীন থেকে এবং এ অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৪ মিলিয়ন ডলার। এই মুহূর্তে চীন গোটা বিশ্ব থেকেই এক রকম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। চীনের নিজের বহু কোম্পানি বন্ধ রয়েছে। বহু শহরে মানুষ ঘর থেকে বের না হওয়ার কারণে এখন ভুতুড়ে শহরে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে চীন থেকে বাংলাদেশের পণ্য আমদানি বন্ধ রয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে চীনের সঙ্গে যোগাযোগও। এ পরিস্থিতিতে বাজারে ব্যাপক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো, করোনাভাইরাসের কারণে যদি দীর্ঘকাল আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকে, তাহলে আমাদের এক বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি সিদ্ধান্তও জরুরি। কারণ আপদকালে মন্ত্রণালয়গুলো আমাদের বিপদ বাড়িয়ে দেয়। করোনার সুযোগ নিয়ে দেশীয় বাজার যেন অস্থিতিশীল না হয়, সে জন্য বাজার মনিটরিংয়ে সরকারকে অনমনীয় হতে হবে। পৃথিবীতে যুগে যুগে যত মরণব্যাধি এসেছে, সেসবের বেশিরভাগের সঙ্গে যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে মানুষেরই। ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস প্রতিরোধী ভ্যাকসিন আবিস্কার মানুষের বেঁচে থাকাকে স্বচ্ছন্দ দিয়েছে; দীর্ঘায়িত করেছে আয়ুরেখা। ইতোমধ্যে পৃথিবীর দেশে দেশে গবেষণাগারে মহৎপ্রাণ মানুষেরা এ ভাইরাসকে বশীভূত করতে জীবন বাজি রেখে কাজ করে যাচ্ছেন। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, করোনাভাইরাসের প্রবল আধিপত্য পরাজিত হবে মনুষ্য মস্তিস্কের কাছে। যদিও ততদিনে ঝরবে মহামূল্যবান আরও অনেক মনুষ্যপ্রাণ। তবুও জয় হবে মানুষের; জীবনের। মুক্তি পাবে লাখ-কোটি প্রাণ।
শিক্ষক

আরও পড়ুন

×