দেশি কর্মস্থলে বিদেশি কর্মী
×
জাহিদ হোসেন
প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৩:৫৪
বিদেশি কর্মীদের ব্যবহার এবং আচরণের ওপর টিআইবির অনুসন্ধানী রিপোর্ট অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। উদ্বেগ প্রকাশ করে অনেক সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে। সবাই একমত যে- অনুমতিবিহীন কাজ, আয়ের পাচার, তাও কর না দিয়ে, মোটেও কাম্য নয়। এটি বেআইনি শুধু আমাদের দেশে নয়, সব দেশেই। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই।
প্রশ্নটি হলো, সমস্যা নিরসনে আমরা এই আচরণকে কীভাবে দেখব- অপরাধ নাকি অপকর্ম? অপরাধ দণ্ডনীয় আর অপকর্ম আরোগ্যসাধ্য। টিআইবি যদিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে এ ব্যাপারে আরও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করার কথা তারা বলেনি। অপকর্মের প্রতিকার চেয়েছে।
কেন বিদেশিরা অনুমতি ছাড়া কাজ করতে পারছে? কেন আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দিয়ে অনুমতি ছাড়া করাচ্ছে, যত্ন নিচ্ছে, বেতন দিচ্ছে? এগুলো শুধু আইনি প্রশ্ন নয়, অর্থনৈতিক প্রশ্নও বটে। আমার ধারণা ছিল যে, আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে, যেমন- পোশাক, ওষুধ, বিদ্যুৎ, বিভিন্ন অবকাঠামো খাতে যে পরিমাণ ও মানের দক্ষ কর্মী প্রয়োজন, সেই পরিমাণ ও একই মানের দেশি কর্মীর অভাব আছে। টিআইবি রিপোর্ট সংক্রান্ত আলোচনা দেখে মনে হলো, এ নিয়ে ঐকমত্যেরও অভাব আছে। কেন ঐকমত্য নেই, সেটা বোঝা দুস্কর। কারণ একটা কথা সবাই মানেন- কর্ম নিয়োগকারীরা বলেন, যোগ্য লোক পাই না আর কর্মসন্ধানীরা বলেন, কাজ পাই না। শ্রমবাজারের ওপর করা যে কোনো সমীক্ষায় এই চিত্রটি এমনভাবে উঠে এসেছে যে, শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব সবচেয়ে বেশি হওয়ার ব্যাখ্যায় এটি প্রচলিত জ্ঞান হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টা এমন না যে, কোনো রকম দক্ষ শ্রমিক স্থানীয় বাজারে পাওয়া যায় না। ব্যাপারটা হলো, জোগানের তুলনায় চাহিদা বেশি; তাই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে, যাতে বিনিয়োগ আর উৎপাদন বিঘ্নিত না হয়।
কাজেই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, এই চাহিদা মেটাতে বেআইনি পন্থাকে অবলম্বন করতে হচ্ছে। আইনে তো কাজ করতে অনুমতি দেওয়ার বিধান আছে। কিছু মানা হচ্ছে, কিছু মানা হচ্ছে না। আবার কিছু মানতে গিয়ে হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়। যেসব ক্ষেত্রে আইনি পথে বিদেশি কর্মী ব্যবহারে কোনো জটিলতা নেই, সেখানে বেআইনি আচরণ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। যেখানে জটিলতা আছে, সেসব ক্ষেত্রে সমাধানের পথ কেবল বিদেশি কর্মী এবং তাদের নিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে আইনি
ব্যবস্থা নিয়ে নয়, আইনের সংস্কার এবং উন্নত প্রয়োগের মাধ্যমেও। এমন কোনো পথে যাওয়া ঠিক হবে না, যেটা কারও উপকারে আসবে না বা
যেটা আন্তর্জাতিক শ্রমিক চলাচলে আমাদের জাতীয় দর্শন ও নৈতিক অবস্থানের পরিপন্থি।
কথায় বলে, কাচের ঘরে বাস করে অন্যের বাড়িতে ঢিল মারতে নেই। বিদেশে প্রচুর বাংলাদেশি শ্রমিক আছেন, যারা যে দেশে আছেন সেই দেশের আইনি জটিলতা ও অপপ্রয়োগের কারণে অনুমতিবিহীন কাজ করছেন নিজে ও পারিবারিক জীবিকার তাগিদে। এদেরকে
আইনি কাঠামোর ভেতরে এনে নিয়মিতকরণ দু'পক্ষের স্বার্থরক্ষায় সহায়ক হবে। বাংলাদেশে অনুমতিবিহীন বিদেশি কর্মীদের বেলায়ও একই সুপারিশ প্রযোজ্য।
দেশে এত শিক্ষিত তরুণ থাকা সত্ত্বেও দক্ষ জনবলের জন্য বিদেশ-নির্ভরতা আমাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন। এই বাস্তবতার স্বীকৃতি দিয়ে দুর্বলতার মূল্যায়নগুলো নিরূপণ করে সমাধান খুঁজে বের করাকে সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। অপ্রতুল বা অদক্ষ ব্যয়, প্রশাসন ও পরিষেবা সরবরাহের চ্যালেঞ্জ এবং অবকাঠামোগত ব্যবধানের মতো জটিল সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সরকারের সব স্তরে মানব মূলধন গড়ে তোলার জন্য স্থায়ী সমন্বয় ও নেতৃত্বের প্রয়োজন। মানব মূলধনে বিনিয়োগ দক্ষতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি। নিম্নশিক্ষা অর্জন, সাম্প্রতিক দশকে শিক্ষায় এক্সেসের প্রসার এবং দক্ষতা প্রশিক্ষণ সত্ত্বেও, বাংলাদেশে শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতায় উলেল্গখযোগ্য বাধা সৃষ্টি করছে। কেবল ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সের প্রায় ৪৬ শতাংশ লোক মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করেছে এবং একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশের (৪ শতাংশ) উচ্চস্তরের শিক্ষাগত যোগ্যতা রয়েছে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পরে দক্ষতার প্রশিক্ষণগুলোতে অংশগ্রহণ নগণ্য। জনসংখ্যার মাত্র ২.১ শতাংশ আনুষ্ঠানিক স্কুলিং সিস্টেমের বাইরে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে। এই জায়গাগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন আর পরিবর্ধন সাধন না করতে পারলে বিদেশি দক্ষ শ্রম-নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসার পথ কখনও খুলবে না।
হঅর্থনীতিবিদ
প্রশ্নটি হলো, সমস্যা নিরসনে আমরা এই আচরণকে কীভাবে দেখব- অপরাধ নাকি অপকর্ম? অপরাধ দণ্ডনীয় আর অপকর্ম আরোগ্যসাধ্য। টিআইবি যদিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে এ ব্যাপারে আরও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করার কথা তারা বলেনি। অপকর্মের প্রতিকার চেয়েছে।
কেন বিদেশিরা অনুমতি ছাড়া কাজ করতে পারছে? কেন আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দিয়ে অনুমতি ছাড়া করাচ্ছে, যত্ন নিচ্ছে, বেতন দিচ্ছে? এগুলো শুধু আইনি প্রশ্ন নয়, অর্থনৈতিক প্রশ্নও বটে। আমার ধারণা ছিল যে, আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে, যেমন- পোশাক, ওষুধ, বিদ্যুৎ, বিভিন্ন অবকাঠামো খাতে যে পরিমাণ ও মানের দক্ষ কর্মী প্রয়োজন, সেই পরিমাণ ও একই মানের দেশি কর্মীর অভাব আছে। টিআইবি রিপোর্ট সংক্রান্ত আলোচনা দেখে মনে হলো, এ নিয়ে ঐকমত্যেরও অভাব আছে। কেন ঐকমত্য নেই, সেটা বোঝা দুস্কর। কারণ একটা কথা সবাই মানেন- কর্ম নিয়োগকারীরা বলেন, যোগ্য লোক পাই না আর কর্মসন্ধানীরা বলেন, কাজ পাই না। শ্রমবাজারের ওপর করা যে কোনো সমীক্ষায় এই চিত্রটি এমনভাবে উঠে এসেছে যে, শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব সবচেয়ে বেশি হওয়ার ব্যাখ্যায় এটি প্রচলিত জ্ঞান হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টা এমন না যে, কোনো রকম দক্ষ শ্রমিক স্থানীয় বাজারে পাওয়া যায় না। ব্যাপারটা হলো, জোগানের তুলনায় চাহিদা বেশি; তাই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে, যাতে বিনিয়োগ আর উৎপাদন বিঘ্নিত না হয়।
কাজেই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, এই চাহিদা মেটাতে বেআইনি পন্থাকে অবলম্বন করতে হচ্ছে। আইনে তো কাজ করতে অনুমতি দেওয়ার বিধান আছে। কিছু মানা হচ্ছে, কিছু মানা হচ্ছে না। আবার কিছু মানতে গিয়ে হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়। যেসব ক্ষেত্রে আইনি পথে বিদেশি কর্মী ব্যবহারে কোনো জটিলতা নেই, সেখানে বেআইনি আচরণ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। যেখানে জটিলতা আছে, সেসব ক্ষেত্রে সমাধানের পথ কেবল বিদেশি কর্মী এবং তাদের নিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে আইনি
ব্যবস্থা নিয়ে নয়, আইনের সংস্কার এবং উন্নত প্রয়োগের মাধ্যমেও। এমন কোনো পথে যাওয়া ঠিক হবে না, যেটা কারও উপকারে আসবে না বা
যেটা আন্তর্জাতিক শ্রমিক চলাচলে আমাদের জাতীয় দর্শন ও নৈতিক অবস্থানের পরিপন্থি।
কথায় বলে, কাচের ঘরে বাস করে অন্যের বাড়িতে ঢিল মারতে নেই। বিদেশে প্রচুর বাংলাদেশি শ্রমিক আছেন, যারা যে দেশে আছেন সেই দেশের আইনি জটিলতা ও অপপ্রয়োগের কারণে অনুমতিবিহীন কাজ করছেন নিজে ও পারিবারিক জীবিকার তাগিদে। এদেরকে
আইনি কাঠামোর ভেতরে এনে নিয়মিতকরণ দু'পক্ষের স্বার্থরক্ষায় সহায়ক হবে। বাংলাদেশে অনুমতিবিহীন বিদেশি কর্মীদের বেলায়ও একই সুপারিশ প্রযোজ্য।
দেশে এত শিক্ষিত তরুণ থাকা সত্ত্বেও দক্ষ জনবলের জন্য বিদেশ-নির্ভরতা আমাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন। এই বাস্তবতার স্বীকৃতি দিয়ে দুর্বলতার মূল্যায়নগুলো নিরূপণ করে সমাধান খুঁজে বের করাকে সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। অপ্রতুল বা অদক্ষ ব্যয়, প্রশাসন ও পরিষেবা সরবরাহের চ্যালেঞ্জ এবং অবকাঠামোগত ব্যবধানের মতো জটিল সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সরকারের সব স্তরে মানব মূলধন গড়ে তোলার জন্য স্থায়ী সমন্বয় ও নেতৃত্বের প্রয়োজন। মানব মূলধনে বিনিয়োগ দক্ষতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি। নিম্নশিক্ষা অর্জন, সাম্প্রতিক দশকে শিক্ষায় এক্সেসের প্রসার এবং দক্ষতা প্রশিক্ষণ সত্ত্বেও, বাংলাদেশে শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতায় উলেল্গখযোগ্য বাধা সৃষ্টি করছে। কেবল ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সের প্রায় ৪৬ শতাংশ লোক মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করেছে এবং একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশের (৪ শতাংশ) উচ্চস্তরের শিক্ষাগত যোগ্যতা রয়েছে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পরে দক্ষতার প্রশিক্ষণগুলোতে অংশগ্রহণ নগণ্য। জনসংখ্যার মাত্র ২.১ শতাংশ আনুষ্ঠানিক স্কুলিং সিস্টেমের বাইরে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে। এই জায়গাগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন আর পরিবর্ধন সাধন না করতে পারলে বিদেশি দক্ষ শ্রম-নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসার পথ কখনও খুলবে না।
হঅর্থনীতিবিদ
- বিষয় :
- বিদেশি কর্মী
