সিন্দুকের অর্থে সংকট এড়ানো যাবে?
আবদুল মান্নান
প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৩:৫৪
আমি কোনো ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা বা গণক নই। লেখাপড়ার সুবাদে চলমান ঘটনাকে বিশ্নেষণ করে কোনো কোনো বিষয় সম্পর্কে কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করার চেষ্টা করি। সবসময় যে আগামবাণী সঠিক হয়, তা কিন্তু নয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে তা প্রত্যাশা অনুযায়ী মিলে যায়। ২০০৬ সালের কথা। মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকতে মরিয়া। ইচ্ছামতো আইনকানুন বদলে দিচ্ছেন। তার ইশারায় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন নিজেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান ঘোষণা করেছেন। একটি পত্রিকায় লিখেছিলাম, বাংলাদেশ এখন নাইজেরিয়া হওয়ার পথে। খালেদা জিয়া ক্ষমতাচ্যুত হবেন। নতুন একটা সরকার জোর করে ক্ষমতা গ্রহণ করার সম্ভাবনা আছে। অনেকটা তাই হয়েছিল। আমার লেখাটি প্রকাশিত হয়নি।
তারও আগে যখন শেখ হাসিনা ২০০১ সালে তার প্রথম দফার শাসনকাল শেষ করেছেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ধরে নিয়েছেন আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসছে। কিন্তু শেখ হাসিনা বঙ্গভবনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে গণভবনে ফেরার সংক্ষিপ্ত সময়কালে যখন লতিফুর রহমানের হুকুমে ১৩ জন সচিবের বদলির আদেশ হয়ে যায়, তখন একটা সন্দেহের গন্ধ পাই। রাত সাড়ে ১০টার দিকে আমার কাছে থাকা গণভবনের ফোন নম্বরে ফোন করলে দেখি, সব টেলিফোন নো রেসপন্স। শেষতক আমাকে দেওয়া শেখ হাসিনার একটি প্রাইভেট নম্বরে ফোন করলে জানতে পারি, গণভবনের সবক'টা ফোনের লাইন কেটে দেওয়া হয়েছে। সংসদ নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হলে প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছিল, সবাই সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করছেন আওয়ামী লীগকে সেই নির্বাচনে পরাজিত করতে। রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের স্থবিরতা দেখে ধারণা হচ্ছিল, তিনিও চান না আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসুক। পত্রিকায় লেখা পাঠাই, সতর্ক না হলে বিপর্যয় অনিবার্য। সেই লেখাও প্রকাশিত হয়নি। পরে সম্পাদকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অকপটে বলেন, তিনি নির্বাচনের পূর্বমুহূর্তে এমন একটা লেখা প্রকাশ করে প্যানিক সৃষ্টি করতে চাননি।
এমন বেশ কিছু উদাহরণ আরও আছে। অনেক বিষয়ে আগাম বার্তা দিতে হলে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা বা গণক হওয়ার প্রয়োজন নেই। একটু বিচার-বিশ্নেষণের ক্ষমতা থাকলেই তা করা যায়। হয়তো একশ' ভাগ মিলবে না। যতটুকু মেলে তাই যথেষ্ট।
বাংলাদেশ আগামী বছর স্বাধীনতার ৫০ বছর পালন করবে। এ বছর দেশটির মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার জন্য যা যা পূর্বশর্ত আছে, তা পূরণ করার সম্ভাবনা আছে বলে মনে করা হয়। কিন্তু গত কয়েক মাসে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা ও সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত সেই সম্ভাবনাকে কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। প্রথম বিষয়টা হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে লাগামহীনভাবে বিদেশে অর্থ পাচার আর এই পাচারের সঙ্গে যুক্ত ব্যাংক পরিচালক, ব্যাংক কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা, মিডিয়ার মালিক, সামরিক-বেসামরিক আমলা, সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালক, ছাত্রনেতাসহ আরও অনেকে। এই পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ কত তার সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাবমতে, তা বছরে ৭৫ হাজার কোটি টাকার কম নয়। বাংলাদেশে এ ধরনের দুর্নীতি এখন অনেকটা নিয়মিত হয়ে গেছে। সরকার যতই চেষ্টা করুক না কেন, তা খুব ফলদায়ক হবে বলে মনে হয় না। কারণ সর্ষের মধ্যেই ভূত আছে। 
সম্প্রতি যে বিষয়টি নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষ বেশ বিচলিত তা হচ্ছে, ব্যাংক ও অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষের গচ্ছিত অর্থের ওপর সুদহার কমিয়ে দেওয়া। আমানতকারীকে প্রদেয় সুদ ও ঋণের সুদ হ্রাস-বৃদ্ধি, খোলাবাজার অর্থনীতিতে বাজারের চাহিদা, জোগান দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আর্থিক গতিপ্রকৃতির ওপর ছেড়ে দেওয়াটাই মঙ্গল। সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছে, ব্যাংকে জামানতের সুদহার ৬ শতাংশের বেশি হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, দেশে মুদ্রাস্টম্ফীতির হার এই মুহূর্তে ৫.৭০ শতাংশ। গত নভেম্বরে তা ৬.০৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছিল। বিশ্বায়নের এই যুগে একটি দেশের মুদ্রাস্টম্ফীতি তার একক কোনো সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। তার ওপর আছে খাদ্য মূল্যস্টম্ফীতি। বর্তমানে এটিও মুদ্রাস্টম্ফীতির কাছাকাছি। অন্যদিকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে তার ওপর সুদ দিতে হবে ৯ শতাংশের নিচে। এই ব্যবস্থা বর্তমানে প্রায় সব ব্যাংক চালু করে দিয়েছে।
এসব কিছু বুঝে ওঠার আগে অনেকটা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো সরকারি সিদ্ধান্তে ডাকঘর সঞ্চয়পত্রে আমানতের সুদহার প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা হলো। এতে কার ওপর কী প্রভাব পড়বে? প্রথমে এটি চরমভাবে আঘাত করবে, যারা চাকরি থেকে অবসর নিয়ে পেনশনের টাকা সঞ্চয়পত্র বা ব্যাংকে স্থায়ী আমানতে রেখেছেন তাদের। ওটাই তাদের একমাত্র রোজগারের পথ। আর প্রাপ্ত সুদহার এবং মুদ্রাস্টম্ফীতি যদি কাছাকাছি হয়, তা হলে গচ্ছিত অর্থের মূল্য মূল অর্থমানের নিচে চলে আসবে। ১শ' টাকা ব্যাংকে রাখলে যদি এক বছর পর তা ৯০ টাকা (ক্রয়ক্ষমতা) হয়ে যায়, তা হলে কোন পাগলে ব্যাংকে টাকা রাখবে? ফলে কয়েক বছরের মধ্যে অধিকাংশ ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগবে। তাতে নানামুখী ক্ষতি।
মানুষ যদি ব্যাংকে টাকা না রাখে, তা হলে দেশে মূলধন কীভাবে গঠিত হবে? আর তা যদি না হয় তা হলে দেশে শিল্পায়ন কীভাবে হবে? অনেকে বলবেন, শেয়ার মার্কেট থেকে মূলধন আসবে। শেয়ার মার্কেটের বিদ্যমান অবস্থা দেখে মনে হওয়ার কারণ নেই, এই অসুস্থ শেয়ারবাজার সুস্থ হবে। শেয়ারবাজারকে অসুস্থ করে অনেকেই সুস্থ আছেন। ব্যাংক যদি তারল্য সংকটে ভোগে, তাহলে সরকারও-বা প্রয়োজনে কোথা থেকে ঋণ নেবে? তা হলে বাংলাদেশ কি আবার নিম্ন আয়ের দিকে ধাবিত হবে? যারা বিভিন্নভাবে যৎসামান্য সঞ্চয় করত, তারা কী করবে? তারা সঞ্চয়ে নিরুৎসাহিত হবে, যা আগে উল্লেখ করেছি। যাদের অবৈধ পথ জানা আছে, তারা সেই পথে বিদেশে অর্থ পাচার করবে। অনেকে অপ্রয়োজনীয় ভোগবিলাসে অর্থ ব্যয় করবে। ফলে দেশে আরও মুদ্রাস্টম্ফীতি হবে। সাধারণ মধ্যবিত্ত একসময় তীব্র অর্থ সংকটে পড়বে আর মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত হবে। এখানে আরও একটা বিষয় উল্লেখের দাবি রাখে। সরকার বলছে, নারীদেরও সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন নম্বর লাগবে। গ্রামের অনেক নারী হাঁস-মুরগি বা গরুর দুধ বিক্রি করে সামান্য কিছু অর্থ জমাতে পারলে সঞ্চয়পত্র কেনেন। তার টিআইএন নম্বর কোথা থেকে আসবে?
ঋণের ওপর সুদ কমানোতে লাভ হলো কার? অবশ্যই ব্যবসায়ী ও অর্থ পাচারকারীদের। দুর্নীতি বাড়বে লাগামহীনভাবে। অসৎজনেরা ব্যাংক থেকে কম সুদে মোটা অঙ্কের অর্থ ধার নিয়ে তা বিদেশে পাচার করে দিলে তাকে ঠেকাবে কে? দুর্নীতি বন্ধের সব প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি অকেজো হয়ে গেছে বা করে ফেলা হয়েছে। সম্ভাব্য এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী? প্রথমে ব্যাংক পরিচালকদের নিজস্ব ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া বন্ধ করতে হবে। তাতে সমস্যা মিটবে না। বর্তমানে এক পরিচালক তার বন্ধু পরিচালকের ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন। এই ব্যবস্থার সম্পূর্ণ সংস্কার প্রয়োজন। এই ঋণের মোট পরিমাণ কত হবে, তা নির্ধারণ করে দিতে হবে। যেসব ব্যাংক পরিচালক লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা জরুরি। দেশের ব্যাংকগুলোর বর্তমান দুরবস্থার প্রধান কারণ, কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে ব্যাংক মালিক এবং ব্যবস্থাপকরা স্বয়ং। সরকারি ব্যয় সংকোচনের ব্যবস্থা হিসেবে গাছে চড়া আর পুকুর কাটার প্রশিক্ষণ নিতে সরকারি কর্মকর্তাদের হাস্যকর বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী ইদানীং প্রায় বলে থাকেন, চিন্তার কোনো কারণ নেই, সরকারের সিন্দুকে অনেক অর্থ জমা আছে। সিন্দুকে অর্থ জমা থাকা শক্তিশালী অর্থনীতির সূচক নয়। যেমন নয় দু'বেলা মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খাওয়া। চীনে যে করোনাভাইরাসজনিত মহামারি দেখা দিয়েছে, তাতে সারাবিশ্বে একটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প ইতোমধ্যে তার উত্তাপ পেতে শুরু করেছে। চীনকে বলা হয় সারাবিশ্বের কারখানা। সেই কারখানায় আগুন লাগলে বিশ্ব অর্থনীতির কী হতে পারে, তা আন্দাজ করার জন্য অমর্ত্য সেন হওয়ার প্রয়োজন নেই। অনেকে বিরক্ত হয়ে বলেন, সব সমস্যার সমাধান প্রধানমন্ত্রীকে কেন দিতে হবে? উল্লিখিত সম্ভাব্য আর্থিক সংকট বাস্তবে ঘটার আগেই তার হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। এর জন্য তার আস্থাভাজন অর্থনীতিবিদদের তিনি পরামর্শ নিতে পারেন। এই লেখাটি কোনো আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য নয়। তবে প্রার্থনা করব, আমার করা সম্ভাব্য আগাম বার্তাটি যেন ভুল প্রমাণিত হয়।
লেখক, বিশ্নেষক ও গবেষক
- বিষয় :
- সুশাসন
