ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

সরকারের সঙ্গে অপরাপর দলের দূরত্ব

সরকারের সঙ্গে অপরাপর দলের দূরত্ব
×

ফরিদুল আলম

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৩:২৫

রাজনীতির মাঠে উত্তেজনা নেই বেশ কয়েক বছর ধরেই। মূলত ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই ক্ষমতাসীন দল এক রকম প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতাহীন রাজনৈতিক সময় পার করছে। অবশ্য এই সময়ের মধ্যে দেশের আর্থ-সামাজিক অনেক ক্ষেত্রেই বৈপ্লবিক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। প্রচুর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য যেমন ভালো হয়েছে; উত্তেজনাহীন রাজনৈতিক পরিবেশে সাধারণ মানুষের জীবনেও এসেছে লক্ষণীয় স্বস্তি। তার পরও দিন শেষে মনে হয়, কোথায় যেন একটা ফারাক! একটি সরকারের নিত্যকর্ম সম্পাদনের স্বার্থে সক্রিয় বিরোধী দল যেখানে জবাবদিহির জায়গাকে স্পষ্ট করে, সেখানে দেশের চলমান উন্নয়নের ধারার সঙ্গে ক্রমেই অপরাপর রাজনৈতিক দল সাইনবোর্ডসর্বস্ব হয়ে যাচ্ছে। রাজনীতিতে সংঘাত যেমন কারও কাছে প্রত্যাশিত নয়, তেমনি প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতাহীন রাজনীতিও এক পর্যায়ে রাজনীতিতে খরা ডেকে আনে। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, আমাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতন মানুষ কমবেশি চিন্তিত।
প্রায় দুই মাস আগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশন সম্পন্ন হলো। একটি নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় দলের নেতৃত্ব নির্বাচিত হলেন। কাউন্সিল অধিবেশনের পর স্বল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় পূর্ণাঙ্গ কমিটিও গঠন হয়ে গেছে। অন্যদিকে, বর্তমান সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও তাদের কাউন্সিল সম্পন্ন করেছে। রওশন এরশাদকে দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রেখে জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান এবং মসিউর রহমান রাঙ্গাকে মহাসচিব করে তাদের কমিটি গঠন হলেও এখন পর্যন্ত দেবর-ভাবির মধ্যকার দূরত্ব দূর হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারম্যান প্রেসিডিয়াম সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করবেন এবং সে অনুযায়ী যখন তা হচ্ছিল সে সময় দেখা যাচ্ছে, প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ নিজের মতো তার কিছু অনুসারীকে দলের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব দিচ্ছেন। আবার জিএম কাদের এদের কাউকে ভিন্ন পদ দিচ্ছেন বা অনেককে বাদ দিচ্ছেন। এভাবে এই বিশৃঙ্খলার চক্কর থেকে বের হতে পারছে না দলটি। তারপরও আশার কথা, তারা তাদের কাউন্সিলটি সম্পন্ন করতে পেরেছেন। এদিকে রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি এখন পর্যন্ত তাদের সম্মেলন বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। দলটি বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে লন্ডন প্রবাসী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের নির্দেশনায়। আপাতত সেখান থেকে যেভাবে নির্দেশনা আসছে, সেভাবেই তারা চলছে।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মাঠের রাজনীতি এখন দলগুলোর ঘরের ভেতর স্থান নিয়েছে। ক্ষমতাসীন দল কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গোছানোর কাজটি সম্পন্ন করলেও দল ও সরকারের ভেতর অনেকের মধ্যে না পাওয়ার এক ধরনের ক্ষোভ রয়েছে। তবে সেটা যতটা চাপা; জাতীয় পার্টি ও বিএনপির ভেতরকার নেতৃত্ব নিয়ে ক্ষোভ অনেকটা প্রকাশ্য। কার্যত সংসদের বিরোধী দলের নেতৃত্ব দেওয়ার বাইরে মাঠের রাজনীতি কিংবা সরকারবিরোধী রাজনীতিতে তাদের উপস্থিতি লক্ষণীয় নয়। দলের ভেতর গৃহবিবাদে ভুগতে থাকা দলটির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে শঙ্কার মধ্যে খোদ দলের সিনিয়র নেতারা। আর বিএনপিও এর থেকে যে খুব একটা বাইরে রয়েছে, তা নয়।
সরকারকে ক্রমাগত ব্যর্থ বললেও সরকারের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে বিএনপি কোনো কর্মসূচি দিতে পারছে না, নিজেদের সেভাবে মাঠে দাঁড় করাতে না পারার কারণে। কিছুদিন আগ পর্যন্ত দলের চেয়ারপারসনের মুক্তি বিষয়ে তারা আইনি প্রক্রিয়ায় তৎপরতা দেখিয়ে এলেও সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট থেকে খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়টি নাকচ হয়ে যাওয়ার পর তাদের হতাশার চিত্র আরও স্পষ্ট। দু'দিন আগে আবারও তার জামিনের আবেদন জানানো হয়েছে। তবে দলের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিনের এক ধরনের চাপা ক্ষোভ রয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্ব নিয়ে। অনেকেই চান বিদেশ থেকে তিনি নেতৃত্ব না দিয়ে দেশের ভেতর থেকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম এমন কোনো অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব বের হয়ে আসুক।
এ অবস্থায় তারা কয়েকদিন আগে ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ঘিরে দলকে কিছুটা চাঙ্গা করার একটা উপলক্ষ খুঁজে নিতে চেষ্টা করেছেন। ২০১৫ সালের নির্বাচনে তারা দায়সারাগোছের অংশগ্রহণ করলেও এবার বেশ জোরেশোরে নির্বাচনের মাঠ দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা ছিল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কাউন্সিলর এবং অন্তত একটি সিটিতে তাদের মেয়র প্রার্থী যদি বিজয়ী হয়ে আসতে পারেন, তাহলে রাজধানীতে দলের নেতাকর্মীরা অনেকটা চাঙ্গা হবেন। পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য স্থানে তারা এই জয়কে ইস্যু হিসেবে কাজে লাগাতে পারবেন। কিন্তু সেই আশা পরাহত হয়েছে। অবাক করার বিষয় হচ্ছে, একাদশ সংসদ নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে সেই নির্বাচনের পরপরই উপজেলা নির্বাচন বয়কট করে তারা ক্ষমতাসীন দলকে এমন ওয়াকওভার দিয়ে দেয়, যা আওয়ামী লীগ আসলে হয়তো কল্পনাও করতে পারেনি। দেশের প্রায় সব উপজেলা পরিষদে এখন আওয়ামী লীগ মনোনীত অথবা তাদের বিদ্রোহী প্রার্থীরা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ সেখানে তাদের খুব ভালো একটা সুযোগ ছিল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে উপলক্ষ করে স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনকে চাঙ্গা করে তোলার। মজার বিষয় হচ্ছে, পরবর্তী সময়ে তারা সংসদের উপনির্বাচন থেকে শুরু করে সিটি নির্বাচনে অংশ নেয় এবং বোধ করি আগামীর সব স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ করবে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সরকারি দলের জন্য অনুকূল থাকলেও সরকারের জন্য অনুকূল বলে মনে করা যায় না। দল হিসেবে সরকারি দল সবসময় চাইবে যতটুকু নির্বিঘ্নে তারা তাদের দলীয় স্বার্থ হাসিল করতে পারে, ততই দলের জন্য ভালো। এখানে দলীয় লাভ-ক্ষতির হিসাবের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থগত দিকটির একটু অমিল রয়েছে। একটি নির্দিষ্ট দল সরকার গঠন করলেও কার্যত এই সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটে গঠিত হয় বিধায় সরকারকে জনগণের সরকার বলা যায়। বর্তমান সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রের আকার বড় হওয়ার কারণে প্রাচীন গ্রিক নগররাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে এসে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমেই প্রকারান্তরে এতে সব জনগণের প্রতিনিধিত্ব ঘটে। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলকে যখন হ্যামলক বিষপানে মৃত্যুদণ্ডের বিধান দেওয়া হয়েছিল, যুক্তির বিচারে তা অগ্রহণযোগ্য হলেও জুরি বোর্ডের ২৮০-২২০ মতামতে এটিকে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। আজ আড়াই হাজার বছর পরও এটা নিয়ে সমালোচনা হলেও দিন দিন গণতন্ত্রেরই জয় হচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটের যে গণতন্ত্র, তা যে সবসময় যুক্তিকে গ্রাহ্য করবে, তা কিন্তু ইতিহাস বলে না। তারপরও গণতন্ত্রই এখন পর্যন্ত সর্বোৎকৃষ্ট। আর তাই এই গণতন্ত্রের একটা শক্ত প্রতিপক্ষ থাকা চাই, যেখানে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হবে।
আমাদের রাজনীতি এখন হয়ে গেছে তাই। সরকারি দলের সঙ্গে অপরাপর দলের ফারাক সেখানে শুধু বেড়েই চলেছে। ফলত দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বৃহস্পতি এখন তুঙ্গে থাকলেও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নিস্তেজতার কারণে জনগণের সরকার অনেকটাই একতরফা হয়ে গেছে। অথচ এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দেশে সরকারি দল এবং সরকারের অনেক কর্মকাণ্ডকে ইতিবাচকভাবে দেখেন না, এমন লোক এখনও অনেক। একটি সংগঠনের মূল দায়িত্ব হচ্ছে নিজেদের আদর্শের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এমন অনেককে সংগঠিত করে একটি ছাতার নিচে নিয়ে আসা। আর সংগঠনের পক্ষ থেকে নেতারা প্রকৃত দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন। সে ক্ষেত্রে নেতাদের হতে হবে নেতার মতো, যিনি বিপদে বুক পেতে দেবেন, আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ করতে সদা প্রস্তুত থাকবেন। কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে আজ এমন ব্যক্তি ক'জন আছেন, এটা বোঝা মুশকিল। এই নেতৃত্বের ব্যর্থতা আজ বিশেষ করে বিএনপির সর্বনাশ ডেকে এনেছে। আওয়ামী লীগ আজ একাধারে ক্ষমতাসীন এবং রাজনৈতিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন থাকার পরও দলের প্রধান শেখ হাসিনার বাইরে তাদের ভেতরও কি এমন কাউকে দেখা যায়, যিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পথ অনুসরণ করে জীবনভর জনগণের মুক্তির জন্য নিজেকে নিবেদন করবেন?
সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×