ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

ভাষার যথেচ্ছ ব্যবহার

ভাষার যথেচ্ছ ব্যবহার
×

দক্ষিণখানে নিহত স্ত্রী ও দুই সন্তানের সঙ্গে রকিব উদ্দিন ভূঁইয়া লিটন- সংগৃহীত

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৩:০৫

আজকাল তলানিতে থাকে প্রাণপ্রিয় বাংলা ভাষার শব্দ। ফাঁপরে থাকে ভাষার প্রতি মমত্ববোধে মুগ্ধ বাঙালি। ভাষারও যে ভাষা থাকে, দুঃখ-কষ্ট-যাতনায় আড়ষ্ট থাকে ভাষাপ্রেমী ও শুদ্ধ প্রয়োগকারী, সে কথা যেন কেউ ভাবে না। প্রায় সব শ্রেণির মানুষকে যেমন প্রতিনিয়ত নতুন শব্দের সম্মুখীন হতে হচ্ছে, তেমনি ভাবপ্রকাশের জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন বাক্য ও শব্দ। এগুলোতে ভাষার ব্যাকরণ বা নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা থাকছে না। প্রচারমাধ্যম বা নেটওয়ার্কের আওতায় অন্তর্ভুক্ত মানুষগুলোর ইংলিশ-বাংলিশ ব্যবহারও লক্ষণীয়। তরুণ প্রজন্ম ভাবপ্রকাশের ক্ষেত্রে এমন সব উদ্ভট শব্দ (লিখিত ও মৌখিক) তৈরি করছে, যা পরিশীলিত বাংলা ভাষার জন্য আতঙ্ক। টেলিভিশন ও বেতারের বাংলা অনুষ্ঠানেও বাংলা-ইংরেজি মিশ্রিত শব্দ-বাক্যের ব্যবহার লক্ষণীয়। সাম্প্রতিক উদীয়মান লেখকদের মধ্যেও এ রকম খামখেয়ালিপ্রবণতা লক্ষণীয়। অনেক প্রবন্ধ-গল্প-উপন্যাসে দেখা যায়, বাংলায় যথাযথ অনুশব্দ-প্রতিশব্দ বাদ দিয়ে ভাষার লিপ্যন্তরীকরণ করা হচ্ছে- ইংরেজি শব্দ বাংলায় বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি চলচ্চিত্র-নাটক, গল্প-উপন্যাস, কাব্যগ্রন্থ, প্রবন্ধ-সংকলন-সাময়িকীর শিরোনামও লেখা হচ্ছে প্রতিবর্ণীকৃতভাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিষয় খোলার ক্ষেত্রেও বাংলা পরিভাষা তেমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। অধিকন্তু দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের ক্ষেত্রেও বাংলা ভাষার ব্যবহার দিন দিন কমছে। বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দ ব্যবহারের নিয়মনীতিগুলোও যেন শ, স-এর ব্যবহার বা উচ্চারণবিষয়ক আধিক্যে পরিপুষ্ট। বর্তমানে কয়েকটি সংস্থা-সংগঠন ও পত্রপত্রিকা নিজ নিজ ভাষানীতি ও নিয়মে আবদ্ধ। ভাষাবিদদের গুণগত ও সংখ্যাগত তত্ত্বের বাগ্‌বিবাদ এবং ব্যাকরণের সহজ-সরল-কঠিন বিষয়ে প্রকাশভিন্নতা সাধারণ পাঠকের জন্য দুর্বেদ্য। উপরন্তু সঠিক ও সর্বজনীন বাংলা ভাষা প্রয়োগ ও মূল্যায়নের জন্যও বিভ্রান্তিকর। কাজের প্রয়োজনে যারা পরিশীলিতভাবে বাংলাকে (লিখিত ও মৌখিক) প্রকাশ করতে চান, তারা পড়ছেন দুরবস্থায়-স্বীকৃতির সংকটে। অন্যদিকে অনেক বাংলা শব্দ-বাক্য যাচ্ছে হারিয়ে।
বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দ-বাক্য ঢোকানোর প্রবণতাও লক্ষ্যনীয়। মনে রাখা প্রয়োজন, পরিভাষা ও প্রতিবর্ণীকরণ (এক ভাষার শব্দ অন্য ভাষার বর্ণে লিখন) এক নয়। পরিভাষার ক্ষেত্রে প্রতিবর্ণীকরণ হলেও যেসব শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ বা অর্থবোধক শব্দ আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিবর্ণীকৃত শব্দের প্রয়োজন পড়ে না। ইন্দোনেশিয়ার পরিভাষার ক্ষেত্রে মূল ইংরেজি শব্দের প্রতিবর্ণীকৃত হয়েছে বেশি। বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারেও অনেক পরিভাষা যুক্ত হয়েছে। বলা যায়, ১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট স্থাপনের পর বাংলা পরিভাষা প্রণয়ন ও রচনার সূত্রপাত। পরবর্তীকালে বাংলা একাডেমিকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশে পরিভাষার চয়ন ও সংকলন করা হয়েছে। বাংলা ভাষা প্রচলনে আইনও হয়েছে। সবক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রচলন, বেতার-দূরদর্শনে বাংলা ভাষার বিকৃত উচ্চারণ ও দূষণ রোধে হাইকোর্টের রুল এবং নির্দেশনা রয়েছে। যার একটি ২০১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এবং আরেকটি ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারিতে এসেছে। 'বাংলা ভাষা প্রচলন আইন' নামে একটি ভাষাবিষয়ক আইন ১৯৮৭ সালের পাস হয়। এসব আইনের প্রয়োগও প্রতফলিত হচ্ছে না। এ দেশের অনেক পণ্ডিত উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন পরিভাষা প্রয়োগে। বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথ অনেক নতুন শব্দ প্রয়োগ করেছিলেন। কিছু ইংরেজির অনুবাদ করে, কিছু পুরোনো শব্দ বা ধাতুর ওপর কারুকর্ম করে। এ কথাও সত্যি যে, কোনো লোকই তার ভাষার সব শব্দের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে না।
বর্তমানে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার অনেক সমৃদ্ধ। অনেক ক্ষেত্রেই ভাষার আত্তীকরণ প্রয়োজন পড়ে না। প্রতিনিয়ত যেসব নতুন ভাষা ও শব্দ বাংলায় আসছে, সেগুলোর তাৎক্ষণিক ও সময়োচিত বাংলা পরিভাষা ব্যবহারকারী জানতে পারলে, অধিক ও কার্যকর ফলাফল আসবে। প্রচলিত বিধি ও যুক্তির মানদণ্ডে অনেক পারিভাষিক শব্দের গ্রহণযোগ্যতাও বিবেচিত হবে। বাংলা ভাষার যোগ্যতা-মর্যাদার জন্য বিশেষ কোনো উদ্যোগ না থাকলে অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ ও বাক্যের অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকবে। তাই প্রয়োজন একটি সময়োপযোগী জাতীয় ভাষানীতি প্রণয়ন। বেশি প্রয়োজন বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার, প্রয়োগ ও নিষ্ঠা।
  গবেষক ও প্রাবন্ধিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×