ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অব্যবস্থাপনা ও করণীয়

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অব্যবস্থাপনা ও করণীয়
×

আলতাফ হোসেন রাসেল

প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২০ | ১৫:১২

বাংলাদেশের কলেজগুলোকে তদারকি করতে গিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় সৃষ্ট বাড়তি চাপ, দীর্ঘ সেশনজট কমানো ও মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। যে লক্ষ্যের কথা বলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, সেটি আসলে বাস্তব চিত্র ছিল না। কলেজগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তি নয় বরং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের কারণে দীর্ঘ স্থবিরতার জন্য মূলত তখনকার সেশনজট সৃষ্টি হয়েছিল। তিন দশক পর দেখা যাচ্ছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা নয় বরং যেন অব্যবস্থাপনার জাতীয়করণ হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, সরকারি কর্মকমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জটিল এক সম্পর্ক ও সমন্বয়হীনতার সৃষ্টি হয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বিষয়ে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, 'জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাটাই ভ্রান্ত। এটা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, মূলত উচ্চতর শিক্ষা বোর্ড। কারণ এর ক্যাম্পাস নেই। আর যেটাকে ক্যাম্পাস বলে দাবি করা হয়, সেখানে কোনো শিক্ষার্থী নেই। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাও হয় না। মূলত সিলেবাস তৈরি, রেজিস্ট্রেশন, ফরম পূরণসহ বিভিন্ন কাজ করে তারা। প্রতিষ্ঠানটির আয় অনেক, ব্যয় তেমন নেই (কালের কণ্ঠ, ৯ জুন, ২০১৮)।'

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেকেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দাবি করে। গবেষণা ও শিক্ষার মান নয়, শুধু ছাত্রসংখ্যার দিক দিয়ে বেড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অবস্থাকে আমি বলি মেদবহুলতা বা মুটিয়ে যাওয়া। বিশেষত যেভাবে অনার্স ও ডিগ্রি (পাস কোর্স) খোলার অনুমতি দেওয়া হয়, তা প্রশ্নযোগ্য। বিষয়টি অনুধাবন করে ২০১৪ সালের ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের সময় স্নাতক (সম্মান) পড়ানো হয় এমন সরকারি কলেজগুলোকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সে নির্দেশনা ইউজিসি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় উভয়ই প্রতিপালনে ব্যর্থ হয়েছে। ঢাকার সাতটি সরকারি কলেজকে জাতীয় থেকে বের করে ২০১৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) অধিভুক্ত করে নির্দেশনা বাস্তবায়নের যে প্রক্রিয়া সূচিত হয়েছিল, তা নিয়ে এখনও চাপান-উতর চলছে। ঢাবির নিয়মিত ছাত্রদের ক্লাস-পরীক্ষা যদি ক্ষতিগ্রস্তই হবে, তা সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথা সান্ধ্যকালীন কোর্সের লাগামহীন বিস্তারে। শুধু সান্ধ্যকালীন কোর্স নয়, আরও অনেক প্রতিষ্ঠান ঢাবিতে অধিভুক্ত বা নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। সেখানে যদি কোনো সমস্যা না হয়, শুধু সরকারি কলেজের অধিভুক্তিতে কেন সংকট তৈরি হবে?

আর্থিক সচ্ছলতা থাকা সত্ত্বেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্র ছাপানোর জন্য নিজস্ব কোনো ছাপাখানা নেই। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের ভবন তৈরির জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এখন কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, ফরম ফিলআপ ও অন্য অনেক ফি হিসেবে হাজার হাজার কলেজ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নিয়ে আসছে। বিভিন্ন কলেজের শিক্ষকদের অভিযোগ, তাদের কলেজগুলো থেকে বিভিন্ন ফির নামে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রচুর অর্থ তুলে নিচ্ছে। অথচ সংশ্নিষ্ট খাতে যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ খরচ করছে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা চূড়ান্ত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করে যা পান, এর অর্ধেকও তারা পান না।

সেশনজট নিরসনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কর্তৃপক্ষ 'ক্রাশ প্রোগ্রাম' চালু করেছিল। তারা মাত্র দুই-তিন বছরে দুই যুগের সৃষ্ট সেশনজট নিরসন করার দাবি করছে। এটি আসলে সম্ভব হয়েছে ক্লাস না করিয়েও সিলেবাস শেষ না করে তড়িঘড়ি করে পরীক্ষা নেওয়ার ফলে। সেই অনৈতিক প্রক্রিয়া অধিকতর 'সহজ' করার জন্য আবার গত ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের ৯১তম সভায় বর্তমান উপাচার্য কলেজগুলোতে অনার্স ও মাস্টার্স পরীক্ষায় উপস্থিতি ও ইনকোর্সের জন্য নির্ধারিত ২০ নম্বর না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে খবর বেরিয়েছে। যেখানে ক্লাস হয় না, সেখানে উপস্থিতি ও ইনকোর্সের নম্বর দেবেই-বা কী করে!

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ প্রজ্ঞাপনে ক্যাম্পাসে (গাজীপুর) অবস্থানের শর্ত থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বা আশপাশে ভিসির বাসভবনের ব্যবস্থা না করে ৩০ কিলোমিটার দূরে ঢাকার ধানমন্ডিতে তার অফিস-কাম বাসভবন; মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন করাকে খোদ সরকারের নিরীক্ষা কমিটি নীতিগতভাবে আপত্তি জানিয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা গ্রেপ্তার ও দুদকে তলবের বিষয়টি জাতীয় গণমাধ্যমে উঠে এসেছে (১৬ জানুয়ারি ২০২০, সমকাল)।

ইউজিসি ও মন্ত্রণালয়কে নিশ্চিত করতে হবে সঠিক মূল্যায়ন ও যথেষ্ট অবকাঠামো নিশ্চিত না করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যেন যত্রতত্র বিষয় অনুমোদন না দেয়; ক্লাসের উপস্থিতি ও ইনকোর্সের নম্বর বাদ না দেয় এবং সরকারি কলেজগুলোকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দেওয়ার প্রধানমন্ত্রীর ২০১৪ সালের সিদ্ধান্তটি ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করে। আর দীর্ঘমেয়াদে এ রকম একটি অলাভজনক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অর্থ সঞ্চয় ও বিনিয়োগের অনাদর্শিক ফাঁদ সৃষ্টির ধারণা থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে।

শিক্ষক, পরিসংখ্যান বিভাগ, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় 

   [email protected]

আরও পড়ুন

×