কভিড-১৯
ভয় যেমন, আশাও তেমন আছে
ডা. মনিকা বেগ
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২০ | ১২:৫৭ | আপডেট: ০৫ মার্চ ২০২০ | ০১:৫৭
করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯ কী? এটি কোনো একটি ভাইরাসের নাম নয়। বরং এটি অনেক ভাইরাস মিলিয়ে একটি বৃহৎ পরিবারের নাম। এই পরিবারের ভাইরাসগুলো সাধারণ সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে অপেক্ষাকৃত গুরুতর অসুখ, যেমন মার্স বা সার্সের জন্য দায়ী। কভিড-১৯-এর জন্য যেই ভাইরাসটি দায়ী, তার নাম হচ্ছে 'সার্স-কোভ-২'। এটি এই করোনাভাইরাস পরিবারেরই এক নতুন সদস্য। করোনাভাইরাস পরিবারের সব কয়টি ভাইরাসই 'জুনোটিক' অর্থাৎ এগুলো জীবজন্তু থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। যেমন মার্স-কোভ ছড়ায় এক কুঁজওয়ালা উট থেকে মানুষে। সার্স-কোভ ছড়িয়েছিল সিভেট বিড়াল থেকে মানুষে। সার্স-কোভ-২-এর সম্ভাব্য আধার হচ্ছে বাদুড়। তবে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এই ভাইরাসটি অন্য একটি মধ্যবর্তী প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে।
চীনের প্রথম ৪২৫ জন আক্রান্ত ব্যক্তির বিস্তারিত ক্লিনিক্যাল বর্ণনা থেকে জানা যায়, আক্রান্তদের মধ্য বয়স ছিল ৫৯ বছর। রোগীদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ ছিলেন পুরুষ। আক্রান্তদের মধ্যে যাদের বয়স বেশি এবং যারা আগে থেকে অন্য দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় ভুগছিলেন (যেমন উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিস), তাদের মধ্যেই কভিড-১৯ সংক্রমণের তীব্রতা এবং মৃত্যুহার বেশি ছিল। এদের মধ্যে একজনও ছিল না যার বয়স ১৫ বছরের নিচে। এর দুটি কারণ হতে পারে- হয় কভিড-১৯ দ্বারা বাচ্চাদের সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা কম অথবা বাচ্চাদের মাঝে রোগের লক্ষণগুলো এতটাই হালকা ছিল যে, তাদের সংক্রমণ শনাক্ত করা যায়নি।
বর্তমানে কভিড-১৯তে মৃত্যুর হার প্রায় ২ শতাংশ। যদিও জার্নালে প্রকাশিত অন্য একটি নিবন্ধ অনুযায়ী, শনাক্তকৃত এক হাজার ৯৯ জন কভিড-১৯ রোগীর মধ্যে মৃত্যুর হার ছিল ১.৪ শতাংশ। যদি আমরা ধরে নিই যে, শনাক্তকৃত কভিড-১৯ রোগীর সংখ্যার তুলনায় লক্ষণহীন বা নূ্যনতম লক্ষণযুক্ত রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি; তবে কভিড-১৯ এ মৃত্যুর হার ১ শতাংশের চেয়েও কম হতে পারে।
এটি থেকে আমরা অনুমান করতে পারি, কভিড-১৯-এ মৃত্যুর হার মারাত্মক মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জা (যার মৃত্যুর হার ০.১ শতাংশ) বা ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির (১৯৫৭ ও ১৯৬৮-এর মতো) চেয়ে বেশি হবে। কিন্তু মার্স-কোভ (যার মৃত্যুর হার ৩৬ শতাংশ) এবং সার্স-কোভের (যার মৃত্যুর হার ৯-১০ শতাংশ) চেয়ে কম হবে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে, একজন কভিড-১৯-এ আক্রান্ত ব্যক্তি আনুমানিক দু'জনকে কভিড-১৯-এ সংক্রমিত করতে পারেন। যতক্ষণ পর্যন্ত এই সংখ্যাটিকে আমরা ১-এর নিচে নামিয়ে আনতে না পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভবত কভিড-১৯ সংক্রমণ বাড়তেই থাকবে।

উলেল্গখ্য, কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম কয়েক দিন লক্ষণ বা উপসর্গগুলো খুব কম থাকে। কিন্তু সেই সময় আক্রান্ত ব্যক্তির মুখের ভেতরে এবং গলার উপরিভাগে এই ভাইরাসের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি থাকে। যার ফলে ওই প্রথম কয়েক দিন কোনো কভিড-১৯-এ আক্রান্ত ব্যক্তি খুব সহজেই একজন অনাক্রান্ত ব্যক্তিকে সংক্রমিত করতে পারেন।
কভিড-১৯-এর প্রসার রোধে চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশ সাময়িক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। অস্থায়ী ভিত্তিতে এ ধরনের বিধিনিষেধ ভাইরাসের বিস্তারকে কমিয়ে দিতে সহায়তা করতে পারে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজনে আরও কিছু বিধিনিষেধ পালনের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। যেমন সামাজিক দূরত্ব, বাড়িতে স্বেচ্ছানির্বাসন, যে কোনো জনসমাগম স্থগিত করা, যখন সম্ভব বাসা থেকে অনলাইনে কাজ করা ইত্যাদি। ইতোমধ্যে কভিড-১৯ মোকাবিলায় একটি কার্যকরী ভ্যাকসিন তৈরির জন্য জোরেশোরে কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। আশা করা হচ্ছে, এই বছরের মে-জুন মাসেই এর প্রথম ট্রায়াল হবে।
এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কভিড-১৯ ভাইরাসটি আক্রান্ত ব্যক্তির নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস অথবা হাঁচি-কাশির সময় যে ছোট ছোট কণিকা (ড্রপলেট) বের হয়, তার মাধ্যমে সরাসরি ছড়ায়। সাবধান না হলে ওই ড্রপলেটগুলো আক্রান্ত ব্যক্তির আশপাশের জিনিসপত্রের ওপরও পড়ে। সেই জিনিসপত্র যদি একজন অনাক্রান্ত ব্যক্তি ধরেন এবং তার পরে হাত না ধুয়ে সেই হাত যদি তার নাকে, মুখে, চোখে দেন, তাহলেও সেই অনাক্রান্ত ব্যক্তি কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হতে পারেন।
কভিড-১৯ প্রতিরোধে কী করতে পারি? ঘন ঘন ও নিয়মিত হাত ধুতে হবে। মনে রাখতে হবে, ৯০ শতাংশ মানুষ সঠিক পদ্ধতিতে হাত ধোয় না। অনেক সময়ই হাতের বুড়ো আঙুল এবং আঙুলগুলোর মাথা বাদ পড়ে যায়। কাজের জায়গাতে অথবা সামাজিক অনুষ্ঠানে, সহকর্মী, বন্ধু, রোগী বা ক্লায়েন্টের সঙ্গে করমর্দন, কোলাকুলি থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকতে হবে। হাঁচি-কাশি দিচ্ছে এমন কারও কাছ থেকে কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। অকারণে নিজের চোখ, নাক ও মুখে হাত দেওয়া বন্ধ করতে হবে। হাঁচি-কাশির সময় একবার ব্যবহারযোগ্য টিস্যু দিয়ে নাক-মুখ ঢাকতে হবে এবং অন্যদেরও ঢাকতে বলতে হবে। ব্যবহারের পরে টিস্যু আবর্জনার বাক্সে ফেলে দিতে হবে, যাতে অন্য কারও সংস্পর্শে সেটি না আসে। করোনাভাইরাসগুলো সাধারণ রান্নার তাপমাত্রায় (৭০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড) বেঁচে থাকতে পারে না। সুতরাং একটি সাধারণ নিয়ম হিসেবে কাঁচা বা অল্প রান্না করা খাবার এড়ানো উচিত। কাঁচা মাংস, কাঁচা দুধ, কাঁচা ডিম বা কাঁচা মাছ রান্না করার সময়ও সাবধান হতে হবে। শরীর খারাপ লাগলে বাড়িতে থাকতে হবে। কিন্তু জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট থাকলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যেতে হবে বা হেল্পলাইন থাকলে সেখানে ফোন করতে হবে।
একটি ব্যাপার আমাদের মনে রাখা খুব জরুরি। তা হলো, কভিড-১৯-এ আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষেরই লক্ষণ এবং উপসর্গ খুব হালকা হয়। আবার কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী কোনো চিকিৎসা ছাড়াই পুরোপুরি সেরে ওঠেন। সবচেয়ে বেশি যে উপসর্গগুলো দেখা যায় তা হলো: জ্বর, ক্লান্তি, শুকনো কাশি। কারও কারও সর্দি, গলা ব্যথা, শরীরে ব্যথা এবং ডায়রিয়াও হতে পারে। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে, যেমন যাদের বয়স বেশি এবং যারা আগে থেকে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের মতো কোনো দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় ভুগছেন, এটি কঠিন রূপ নিতে পারে। তবে যদি জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট থাকে, তার বয়স যাই হোক না কেন বা অন্য দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা না থাকলেও তাকে অবশ্যই ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।
পরিশেষে আমাদের সবারই মাথায় রাখতে হবে যে, এই সংক্রামক ব্যাধিগুলো আগেও এসেছে আবারও আসবে। এর জন্য আমাদের তৈরি থাকা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। সেই তৈরিটা যেমন ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে হতে হবে, তেমনই জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও হতে হবে। এই বিশ্বায়নের যুগে ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়াদেরও বিশ্বায়ন হয়েছে। কারও একার পক্ষে বা কোনো একটি দেশের পক্ষে এই বিপদ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। আমরা যত তাড়াতাড়ি এটি বুঝব, তত তাড়াতাড়ি মানব জাতির জন্য মঙ্গল বয়ে আনব।
প্রধান ও বৈশ্বিক সমন্বয়ক, এইচআইভি এইডস শাখা জাতিসংঘ সদর দপ্তর, ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া
- বিষয় :
- কভিড-১৯
