অর্থনীতি
রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিদের বিচার
ড. মইনুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২০ | ১২:৫৭ | আপডেট: ০৫ মার্চ ২০২০ | ০১:৫৭
বর্তমান অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ২০১২ সাল থেকে প্রচলিত তিন ধরনের শ্রেণিকরণের নিয়ম পরিবর্তন করে ব্যাংকিং খাতের অনাদায়ী ঋণকে শ্রেণিকরণের নতুন নিয়ম চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক, পূর্বে নির্দিষ্ট মেয়াদের তিন মাস পর যেসব ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ হতো সেগুলোকে 'সাব-স্ট্যান্ডার্ড ঋণ' শ্রেণিকরণ করা হতো। নতুন নিয়মে তিন মাসের পরিবর্তে সময়টা ছয় মাস করা হয়েছে; দুই, পূর্বে নির্দিষ্ট মেয়াদের ছয় মাসের বেশি যেসব ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ হতো সেগুলোকে 'ডাউটফুল ঋণ' বলা হতো। নতুন নিয়মে নয় মাস মেয়াদোত্তীর্ণ হলে 'ডাউটফুল' শ্রেণিকরণ হবে; এবং তিন, আগের নিয়মে নয় মাসের বেশি কোনো ঋণখেলাপি হলে 'মন্দঋণ' শ্রেণিকরণ করা হতো। এখন এক বছর বা তার বেশি সময়ের জন্য ঋণ অনাদায়ী হলে 'মন্দঋণ' বা 'লস' শ্রেণিকরণ করা হবে। ২০১২ সালের নিয়মটা আন্তর্জাতিকভাবে স্ব্বীকৃত হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক এভাবে পুরোনো শ্রেণিকরণ পদ্ধতিতে ফিরে গেল।
পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ব্যাংক মন্দঋণ 'রাইট অফ' বা অবলোপনের নিয়মনীতি অনেকখানি শিথিল করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে। আগের নিয়মে যেখানে পাঁচ বছরের খেলাপি মন্দঋণ 'রাইট অফ' করার যোগ্য বিবেচিত হতো, সেক্ষেত্রে নতুন নিয়মে দুই বা তিন বছরের মন্দঋণও 'রাইট অফ' করায় কোনো বাধা থাকবে না। পাঠকদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি, মন্দঋণ 'রাইট অফ' বা অবলোপন করার মানে হলো, ওই অবলোপনকৃত মন্দঋণের হিসাবটা ব্যাংকের মূল ব্যালেন্সশিট থেকে অপসারণ করে আরেকটি লেজারে হিসাবটা সংরক্ষণ করা। 'রাইট অফ' করার দুটো শর্ত হলো :প্রথমত, ওই ঋণ সুদাসলে আদায়ের জন্য ব্যাংক মামলা করবে; দ্বিতীয়ত, যে পরিমাণ ঋণ 'রাইট অফ' করা হয় তার সমপরিমাণ অর্থ 'প্রভিশনিং' বা 'সঞ্চিতি' করতেই হবে। প্রভিশনিং মানে হলো, ওই পরিমাণ অর্থ অন্য কাউকে ঋণ দেওয়া যাবে না। রাইট অফ করার ফলে ব্যাংকের ক্লাসিফায়েড লোনের পরিমাণ ঠিক অতটুকু কম দেখানো যাবে। অতএব, নতুন নিয়ম চালু করে ক্লাসিফায়েড লোন কমানোর হাতিয়ার ব্যাংকগুলোর হাতে তুলে দেওয়া হলো। আর একটা সুবিধা ঘোষিত হলো, মামলা করার বাধ্যবাধকতার জন্য আগে যে সর্বনিম্ন সীমা (ফোর) ছিল ৫০ হাজার টাকা, ওটাকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা।
আরও পরে ২৫ মার্চ ২০১৯ অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেন, মাত্র দ২ শতাংশ খেলাপি ঋণ প্রথম কিস্তিতে শোধ করলে ঋণখেলাপিকে ১০ বছর সময় দেওয়া হবে, যার মধ্যে তিন মাসের কিস্তিতে মাত্র ৭ শতাংশ সুদে বাকি ঋণ শোধ করা যাবে। পরে তিনি বলেন, সুদের হার ৯ শতাংশ হবে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এ মর্মে বিজ্ঞপ্তি জারি করে। হাইকোর্ট বিজ্ঞপ্তি কার্যকর না করার আদেশ জারি করলেও সরকারের আবেদনে সাড়া দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই পদ্ধতিতে খেলাপি ঋণ রিশিডিউলিং সুবিধা বহাল ছিল।
সর্বশেষ যে ১৫ জন খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে ২০১৫ সালে মন্দঋণ রিস্ট্রাকচারিংয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল তাদের শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে, ওই সুবিধা গ্রহণ করলে আর কখনও নতুন করে ঋণ রিশিডিউলিংয়ের সুযোগ পাওয়া যাবে না। কিন্তু ১৫ জনের মধ্যে মাত্র চারজন ওই শর্ত মেনে সুযোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছেন। বাকি ১১ জনকে আর রিশিডিউলিং সুযোগ দেওয়া হবে না বলা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তাদেরকে আবারও ঋণ রিশিডিউল করার অনুমতি দিয়েছে।
এ ধরনের পরিবর্তন খেলাপি ঋণ সমস্যাটিকে আড়াল করার পন্থা হলেও মন্দঋণ আদায় করার কোনো নিষ্ঠাবান প্রয়াসের মাধ্যমে জোরদার করার লক্ষণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ২৬ আগস্ট ২০১৯ দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারির তুলনায় ছয় মাসে ১৮ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা বেড়ে ২০১৯ সালের ৩০ জুন ব্যাংকের ক্লাসিফায়েড লোন এক লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছিল। 
ওপরের পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করে খেলাপি ঋণ আড়াল করার প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে সম্প্রতি দেখা গেল ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরে ক্লাসিফায়েড লোন আবার ৯৫ হাজার কোটি টাকায় নেমে গেছে। কারণ ওই ছয় মাসে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি খেলাপি ঋণ এই নতুন নিয়মাবলি অনুসারে রিশিডিউলিং করতে পারায় এগুলোকে ক্লাসিফায়েড লোন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন, তিনি আর খেলাপি ঋণ এক টাকাও বাড়তে দেবেন না। ওপরের তথ্যগুলো দেখে মনে হতে পারে, অর্থমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জ 'সফল' হয়েছে। অপ্রিয় বাস্তবতা হলো, খেলাপি ঋণ সমস্যা এই এক বছরে আরও অনেক সংকটজনক পর্যায়ে চলে গেছে। আইএমএফ ২০১৯ সালের জুনের শেষে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ দুই লাখ ৪০ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছিল, যার মধ্যে উল্লিখিত এক লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা ক্লাসিফায়েড লোনের সঙ্গে আদালতের ইনজাংশানের কারণে ঝুলে থাকা ৭৯ হাজার ২৪২ কোটি টাকা, স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্টের ২৭ হাজার ১৯২ কোটি টাকা এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে রিশিডিউলিং করা ২১ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এই অঙ্কের সঙ্গে ২০১৯ সালের জুনের শেষে রাইট অফ করা পুঞ্জীভূত মন্দঋণের পরিমাণ ৫৪ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা যোগ করলে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ তিন লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। তার মানে, ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশ এখন খেলাপি ঋণ। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত ক্লাসিফায়েড লোন মোট ঋণের ১০ শতাংশেরও কম।
আরও দুঃখজনক হলো, খেলাপি ব্যাংক ঋণের সিংহভাগই প্রকৃতপক্ষে বিদেশে 'পলাতক পুঁজি' হিসেবে পাচার হয়ে যাওয়ায় এসব খেলাপি ঋণের অর্থ আর কখনোই ব্যাংকগুলো উদ্ধার করতে পারবে না। খেলাপি ঋণগ্রহীতার অধিকাংশই যেহেতু 'ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি', যত সুবিধাই দেওয়া হোক তাদেরকে ঋণ ফেরত দেওয়ার পথে ফিরিয়ে আনা যাবে না। অতএব, তারা সরকারের সহানুভূতি পাওয়ার যোগ্য নন।
গত ২ মার্চ দৈনিক সমকালে দেখলাম, সরকার খেলাপি ঋণ উদ্ধারের জন্য 'অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন' প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে। এর যে খসড়া প্রস্তাব দেখলাম তাতে মোটেও আশ্বস্ত হতে পারছি না। মনে হচ্ছে, আরেকটি দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে! আমি আবারও দৃঢ়ভাবে বলছি, ট্রাইব্যুনাল ছাড়া এ দেশের রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিদের বিচারের কোনো পথ নেই। সে জন্য আমার নিচের দুটো প্রস্তাব জরুরি বিবেচনার জন্য আবারও পেশ করছি।
প্রথমত, খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য বিদ্যমান বিচার প্রক্রিয়া বাংলাদেশে এতই দীর্ঘসূত্রতার শিকার রয়ে গেছে যে, ২০০২ সালে 'রাইট অফ' সিস্টেম চালু হওয়ার পর অনেক 'রাইট অফ' করা মন্দঋণ গত ১৭ বছরেও আদায় করা যায়নি। এটা এখন সুপ্রতিষ্ঠিত, এ দেশের রাজনীতি 'ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি কালচার'কে লালন করে চলেছে। অতএব, সংশোধনও শুরু করতে হবে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেই। এ জন্য জরুরি প্রয়োজন হলো তিন বছরের জন্য একটি খেলাপি ঋণ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করে প্রত্যেক ব্যাংকের শীর্ষ ১০ জন ঋণখেলাপিকে চূড়ান্ত বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার ব্যবস্থা হয় রদ করতে হবে, নয়তো আপিলের ক্ষেত্রে রায়ে উল্লিখিত ঋণের অর্থের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ ব্যাংককে ফেরত দিলে আপিলের সুযোগ দেওয়া যাবে মর্মে শর্ত আরোপ করতে হবে। অর্থঋণ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আপিল করে বিচার প্রক্রিয়াকে বছরের পর বছর ঘুম পাড়িয়ে রাখা যাচ্ছে বলেই খেলাপি ঋণ সমস্যার কোনো সুরাহা হচ্ছে না।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ১০টি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের নাম মন্দঋণের জন্য এক বছরের বেশি সময় ধরে তালিকাভুক্ত হলে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে হবে। গ্রেপ্তার করা হলে তাদের মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই আটককে জামিন-অযোগ্য করতে হবে। তাদের ভিআইপি-সিআইপি মর্যাদা বাতিল করতে হবে। তাদেরকে কোনো সরকারি দায়িত্বে নিয়োগ করা যাবে না; কোনো সরকারি ডেলিগেশনেও অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। এমনকি, কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও তাদের আমন্ত্রণ করা যাবে না।
অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- অর্থনীতি
