ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

স্মরণ

ত্বকী: গানের সমাপ্তি নেই

ত্বকী: গানের সমাপ্তি নেই
×

তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী

আনু মুহাম্মদ

প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২০ | ১৩:১৬

ত্বকীর মতো কিশোর একটি সমাজে বেড়ে ওঠা তার জীবনের লক্ষণ; ত্বকীর মতো মানুষ, একজন সজাগ কিশোর, নিজের থেকে বের হয়ে সর্বজনের সঙ্গে যখন নিজেকে যুক্ত করে, তখন সমাজের প্রাণেও নতুন স্পন্দন যোগ হয়। মানব ইতিহাসের বিভিন্নকালে সর্বজনের এই প্রাণকে স্তব্ধ করে দেওয়ার অসংখ্য ঘটনা আছে। কিন্তু এসব বর্বরতার বিরুদ্ধে সমাজ কতটা রুখে দাঁড়াতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করে সমাজে আরও ত্বকীর জন্ম হবে কিনা, সমাজ নিজেকে জীবন্ত রাখতে সক্ষম কিনা।
বৈষম্য আর নিপীড়নের রাষ্ট্র ত্বকীদের সহ্য করতে পারে না। তার দরকার প্রাণহীন রোবট কিংবা অনুগত দুর্বৃত্ত, সহযোগী বাহিনী। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাই ত্বকীর খুনিদের রক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এই অভিযোগ বারবার উঠেছে। রাষ্ট্র কোথায় সক্রিয়, কোথায় নিষ্ফ্ক্রিয়, তা নির্ধারিত হয় তার অবস্থান দিয়েই। ত্বকীকে যারা হত্যা করেছে তারা দেশজুড়ে আছে। নদী দখল, নদীদূষণ, বন উজাড়, বায়ুদূষণ, ব্যাংক লুট, চাঁদাবাজি ইত্যাদির যারা হোতা, তাদের মধ্যেই ত্বকীর খুনিদের প্রতিকৃতি পাওয়া যাবে। রাষ্ট্র পরিকল্পিত নিষ্ফ্ক্রিয়তার মাধ্যমেই এদেরকে রক্ষা করে। ত্বকী হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে তদন্ত হয়েছে, প্রমাণাদি সংগৃহীত হয়েছে; আলামতসহ সবকিছু থেকে শনাক্ত হয়েছে- খুনি কারা। শনাক্ত হওয়ার পরই নির্দেশ এসেছে সবকিছু পাথরচাপা দেওয়ার এই অভিযোগও তো আছে। সেই পাথর আজও সরেনি।
প্রকৃতপক্ষে এক চরম বৈপরীত্য কিংবা কপটতার মধ্যে আমরা সময় পার করছি। একদিকে শাসক-ক্ষমতাবান-বিত্তবান গোষ্ঠীর সব শাখা অবিরাম দেশপ্রেমের ঢোল বাজাচ্ছে; অন্যদিকে কিছু গোষ্ঠীর মুনাফার রাস্তা তৈরি করতে দেশের প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ মানুষকে বিপন্ন, বিপর্যস্ত করে যাচ্ছে। তারা একদিকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত 'আমার সোনার বাংলা' গাইতে গিয়ে চোখ-নাক দিয়ে পানি ফেলতে থাকে; অন্যদিকে এই গানে বিবৃত আমের ছায়া, বটের ছায়া, নদীর কূল, মায়ের মুখের ওপর মুনাফার আগ্রাসন চালাতে কিছুমাত্র দ্বিধা করে না। নদী-বন-খোলা জায়গা অবাধে খেয়ে যেতে, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করতে মানুষের হাত-পা, চোখ-মুখ বেঁধে রাখতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। একদিকে শুনি 'সন্ত্রাস দমন' আর 'দুর্নীতি দমন'-এর গান অবিরাম; অন্যদিকে দেখি বৃহৎ দুর্নীতিবাজ আর সন্ত্রাসীদের অবাধ দাপট।
তাই সন্ত্রাস, ভয়, নিরাপত্তাহীনতা আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই আমাদের দিন কাটে। এর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অসহায়ত্বের বোধ যখন যোগ হয়, তখন তা আমাদের আরও ভয়াবহ জগতে ঠেলে দেয়। একটি সমাজে অন্যায়, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, বৈষম্য থাকতেই পারে। কিন্তু তা কতদিন, কতদূর যেতে পারে? এ রকম পরিস্থিতি চিরস্থায়ী নয়; তার পরিবর্তন সম্ভব- এই বোধ মানুষের মধ্যে যদি জীবন্ত থাকে, তাহলে মানুষও জীবন্ত থাকে। কিন্তু যদি সমাজে এ রকম ধারণা তৈরি হয় যে, যা কিছু চলছে তার কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়, তাহলে পুরো সমাজেই নেমে আসে অসারতা। তখন ভোগবিলাস শান-শওকত যতই দেখা যাক না কেন; সেই সমাজকে ও তার মানুষকে আর জীবন্ত বলা যায় না।
'উন্নয়ন' নামে প্রাণ-প্রকৃতি-বৈচিত্র্য-ভবিষ্যৎবিনাশী কর্মকাণ্ডের মধ্যে বাস করছি আমরা। বাংলাদেশের নদী-পানি-বন-পাহাড়, সর্বোপরি মানুষ- সবই তথাকথিত উন্নয়নের নখরাঘাতে বিপর্যস্ত। বায়ুদূষণে বিশ্বের শীর্ষস্থানে বাংলাদেশ; পরিবেশ বিপর্যয়ে বিপদগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষে। এর মধ্যে আরও বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, যেগুলো থেকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গোষ্ঠীর লাভ হলেও দেশের মানুষ তো বটেই; সর্বপ্রাণ এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও ভয়ংকর হুমকি হবে। প্রাণবৈচিত্র্য, জাতিবৈচিত্র্য, ধর্মবৈচিত্র্য, ভাষাবৈচিত্র্য, বিশ্বাসবৈচিত্র্য- সবকিছুই অন্ধ 'উন্নয়ন', মুনাফার দাপট আর স্বৈরতন্ত্রী রাষ্ট্রনীতির শিকার। এসব থেকে মুক্তির স্বপ্নই ত্বকীকে চালিত করেছে। ত্বকীকে তাই স্তব্ধ করতে চেয়েছে অপশক্তি।
ভয়, সন্ত্রাস, নিরাপত্তাহীনতা আর অনিশ্চয়তা সারাক্ষণ ঘিরে থাকলেও মানুষ তার নিজেকে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে নদী, বন, বাতাস, পাহাড়, মর্যাদা, দেশ রক্ষার পথ খোঁজে। এই পথ সন্ধান পথে, মিছিলে, গানে, প্রাণে, স্বপ্নে অবিরাম চলছে; বারবার মার খেয়েও যারা বারবার উঠে দাঁড়ায় নতুন জীবনীশক্তি নিয়ে। এই লড়াই তো শুধু বাংলাদেশের নয়। এখানে বিশ্বের আরেক প্রান্তের মানুষের লড়াইয়ের কথা বলে শেষ করি। ১৯৭৩ সালে চিলিতে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আলেন্দেকে সিআইএ-সেনাবাহিনী জোট সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাতের পর সে দেশে শুরু হয় বহু বছরের স্বৈরশাসন, নির্যাতন, গুম, খুনের ভয়ংকর অধ্যায়। ১১ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট আলেন্দেকে হত্যার পর সান্টিয়াগো স্টেডিয়ামে আটক হাজার হাজার তরুণের মধ্যে ছিলেন ভিক্টর জারা; চিলির খুবই জনপ্রিয় গীতিকার কবি।
মেরে তাঁর হাত ভেঙে না দেওয়া পর্যন্ত তাঁর গান থামেনি। এক পর্যায়ে তাঁকে হত্যা করে জেনারেল পিনোচেটের দানব বাহিনী।
খুনির বিরুদ্ধে মানুষের লড়াইয়ে জীবন্ত মানুষের সাহস দিয়ে যারা এই জনপদে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন, ত্বকী তাদের একজন। অমর।
অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×